নুন না থাকলে

নুন না থাকলে তরকারী মুখ দিয়েই যেন ঢুকেনা। নুন বেশি হলেও তাই। মিষ্টি একদম না হলে চা খাওয়াও শক্ত, বেশি চিনিতে তৈরি হয় হাজারটা সমস্যা। ঘুম কম হলে, বিছানায় পিঠ না ঠেকালে ঠিক সুস্থ থাকা যায়না, কর্মক্ষমতা আসে না। বেশি শুয়ে থাকলে বেড সোর হয়।

মানুষের ভালোবাসা পেতে, দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যারা কাঙাল হয়ে থাকে; কেউ বেশি খোঁজ নিলে, সবসময় লেগে থাকলে নাভিশ্বাস ওঠে, পালিয়ে বাঁচতে চায় তখন।

অবিমিশ্র সুখে সুখের আনন্দ নেই। ঢেউয়ের মতন উথাল পাথাল হয়ে দুঃখ থাকে বলেই সুখের এত দাম। কাজের যন্ত্রণা আছে বলেই অবসরের আনন্দ। তিক্ততা আছে বলেই ভালোবাসাকে মনে হয় এত সুন্দর!

আঁকড়ে ধরা আর ছেড়ে দেবার ভারসাম্যই জীবন। উত্তর মেরু কিংবা দক্ষিন মেরুতে থেকে শান্তি নেই, সবাই পালিয়ে এসে তাই মাঝে বসবাস করে।

২২/০৭/১৭

Advertisements
Posted in ব্লগর ব্লগর, যাপিত জীবন | ১ টি মন্তব্য

ইন দি এন্ড

ক্লাস শেষে ফজলুল হক হলে ফিরে আসলে কেমন যেন লাগতো। মনে হতো অনেক দূর থেকে হেঁটে আসতেছি আমি, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। ক্লান্তির চেয়ে শ্রান্তিই বেশি। কিছুটা নির্বিকারতা, কিছুটা নিরাসক্তির নির্যাস। অথচ হয়ত তিন-চার ঘণ্টা ক্লাস করেছি, কম্পিউটেশন নিয়ে, রিকারশন আর রেফারেন্সের উদ্বায়ী আলাপগুলো শুনেছি। এত চাইতাম, এত ফ্রেশ হয়ে, মুখ ধুয়ে, ওযু করে ক্লাসে গিয়েও মাসুদ স্যারের বিশুদ্ধ ক্লাসগুলোকেও কেমন যেন সুমেরীয় বা ইনকা সভ্যতার আলাপ মনে হতো… নিজের কাছে নিজে অযোগ্য হতে থাকা প্রতিদিন, নিজের কাছে ছোট হতে হতে একসময় যেন মিশে যাওয়া হতো ধুলোয়, বাতাসে, দেয়ালের সাথে…

হলে ফিরে রুমের দরজায় পা দিতে দিতে রহমান-শোভনদের রুম থেকে ভেসে আসা ‘এভরি স্টেপ দ্যাট আই টেক ইজ অ্যানাদার মিস্টেক টু ইউ… অ্যান্ড এভ্রি সেকেন্ড আই ওয়েস্ট ইজ মোর দ্যান আই ক্যান টেক’ শুনে শিউরে উঠতাম। লিরিক এত নিপুণ কেমন করে হয়? হয়ত ওদের রুমে একটা কোণায় বসে বুঁদ হয়ে লিংকিন পার্কের ‘ইন দি এন্ড’, ‘নাম্ব’ কিংবা ‘সামহোয়্যার আই বিলং’ শুনতাম; শুনতেই থাকতাম, একটানা অনেকক্ষণ। শুনতে শুনতে একসময় মনে হত অন্য কোথাও হয়ত আছি, অন্য কোনো বাস্তবতায়… চেনা মানুষদের জগতের বাইরে, হিসেব-নিকেশের, জবাবদিহিতার অদ্ভুত জগত থেকে দূরে, কোনো পাহাড়ের পাদদেশে, কোনো নদীর ধারে, মেঘলা আকাশ, কাজহীন, তাগিদহীন অদ্ভুত দুপুরের মতন কোনো একটা সময়…

এই তীক্ষ্ণ, তীব্র, বিধ্বংসী ইন্সট্রুমেন্টালের মাঝে স্নিগ্ধ, শক্তিশালী সুরের হঠাৎ হঠাৎ চিৎকার যেন আমার, আমাদের বুকের হাহাকার উগরে দিতো। হাজার-হাজার ছেলেদের এরকম হাজার হাজার মূহুর্ত পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ার ‘সার্টিফিকেট’ নেওয়ার ক্ষণটি এসেছিলো। কী ভীষণ অদ্ভুত এই জীবন… কী ভীষণ বিচিত্র চেস্টার বেনিংটনদের পৃথিবী থেকেই বিদায় নেওয়া। কত মানুষের অসহায় অনুভূতিদের অনুরণন ওদের সৃষ্ট সুর-কথা-শব্দমালায়…

সময় বদলে যায়। এক সময়ের অনুভূতি আরেক সময়ে থাকেই না। এক সময়ের মানুষ আরেক সময়ে থাকে না। কেউ কোথাও স্থায়ী না। অনুভূতি-আবেগও না। ঘৃণা-ভালোবাসাও না। আমাদের কোনো অ্যাটাচমেন্টই চিরস্থায়ী না, দীর্ঘস্থায়ীও না…

২১/০৭/১৭

Posted in স্মৃতিকথা | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

ভ্যাঙ্কুভারের কলিংউড স্ট্রিট

ভ্যাঙ্কুভারের কলিংউড স্ট্রিট দিয়ে হাঁটছিলো আসিফ। হঠাৎ বামে তাকায়, ছাইরঙ্গা বাড়িগুলোর চারপাশটা কী ভীষণ পরিচ্ছন্ন! বাড়িগুলোর ছাদ গ্রামের বাড়ির টালিদেওয়া ছাদগুলোর মতন হলেও এত নিপুণ নির্মানশৈলী! পথগুলো ছিমছাম, টিপটপ। ছবির মতন সুন্দর উপমা বোধহয় এরকম কিছুকেই বলে! আচানক মন খারাপ লাগে আসিফের। একটা সুন্দর দেখে তার মন খারাপ হওয়ায় আরো বেশি খারাপ লাগে। ঢাকায় ওদের বাসাটার কথা মনে পড়ে গেলো। পুরোনো একটা টিনের বাসায় থাকতে হতো, বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করত। মা আশেপাশের বাসায় গিয়ে কাজ করতো। চারটা ভাই ওরা। একটা ঘরে থাকতো। টিনের পার্টিশনের পাশের ঘরটাতে আব্বা-আম্মা থাকতো। আব্বা-আম্মার জীবন ছিলো ওদের নিয়ে। অল্প কিছুতেই ক্ষেপে যেত আব্বা। আসিফের খুব খারাপ লাগতো। আম্মার জীবন, আব্বার জীবন দেখে ওর অসহায় লাগতো। তাদের জীবনের পুরোটাই ঠেকে বেঁচে থাকা। অথচ মানুষ তো কত কিছু করে! ওদের জীবনে কি সেগুলো আসবে কখনো? মেঝে স্যাঁতসেঁতে, দরজার সামনে কমন স্পেস, ওখানে কাদা থাকতো বারো মাস। সামনের ঘরের রহিমা বেগম রান্নার পানিটা ওইখানেই ফেলতো। শতবার অনুরোধ করেও তারে বদলানো যায় নাই। এই বাড়ির সব পুরুষ রিকসা চালায়, অথবা মিস্ত্রির কাজ করে। রহিমা খালার খুব জেদ, লোকে বলতো সে নোয়াখালির বলে নাকি ওরকম। অনুরোধে তার কোন বিকার নাই। ওদের ঘরটায় বৃষ্টি হলে ঘরের চালা দিয়ে পানি পড়তো, ঘরে পানি জমে যেতো। সেদিন সারাদিন সারারাত বৃষ্টির পর বাসার সামনের রাস্তায় ড্রেন উপচে পানি ঘরে ঢুকে গেলো।

আসিফ হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করলো। বাটার নর্থ স্টারের নেভি ব্লু কেডস পরে এই পথে দৌড়াতে গিয়ে গোড়ালিতে ঝনঝন টাইপ অনুভূতি হচ্ছে। একটা নাইকি জুতার অনেক স্বপ্ন ছিলো আসিফের। ঐটা পায়ে দিলে নাকি ভাঙ্গা রাস্তাও মাখনের মতন লাগে। ওয়েস্টিন বে-শোরে এসে সমুদ্রপাড়ে অজস্র স্পিডবোড দেখতে পেলো। বসার মতন কিছু নেই, পথে সমুদ্রতীরের এপারে রেলিং-এ হেলান দিয়ে বসে ঝিমাতে শুরু করে। ঘোর ভেঙ্গে দেখে একটা জাহাজ নেমেছে। একদল লোক বন্দুক হাতে গুলি করছে কিছু সাদামাটা পোশাকের লোকদের। সে জানে এরা হচ্ছে ‘স্ক্যামিশ’। কেমন করে জানে তা মনে করতে পারলো না। ১৫৭৯ সালের এরকম একটা ঘটনা সে শুনেছিলো মনে হচ্ছে। কিন্তু ক্যামনে কী! সে হেলান দিয়ে আছে গাছের গুড়িতে। ব্রিটিশ জাহাজ এসেছে এখানে লোক নিয়ে। এরা এখানে একদল লোক রেখে ওরা চলে যাবে। আসিফ কেমন করে যেন জানে যে স্ক্যামিশরা সব মরে যাবে, এই লোকেরা এখানে আধিপত্য করবে। বুক ধরফর করে উঠলে তার, বুঝলো এখন পালাতে হবে। সে লাফ দিয়ে পানিতে ডুব দেয়। উঠে দেখে চেনা-পরিচিত চেহারা কতগুলো। গলা পর্যন্ত পানি তার, নিচে কেমন ঢালাই করা সমতল। বুঝতে পারছে পানি জমে থাকা পথে সে উঠেছে। মাথার উপরে পলিথিন একটা, কাঁঠালের কোয়া আর আমের খোসা মিলে পলিথিনটা অসহ্য। সাইনবোর্ডে চোখ দিয়ে দেখা যাচ্ছে কালশী, ঢাকা। আসিফ হর্নের শব্দ পেয়ে তাকিয়ে দেখে একটা বাস হড়হড় করে এগিয়ে আসছে, বিকট হর্ন; চাকা ঘুরছে আর পানির ঢেউ উঠছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারালো সে।

১৪/০৭/১৭

Posted in পরাবাস্তব | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

আপনারে আমরা খুঁজিয়া বেড়াই অন্যের মাঝারে

বেশি কথা দিয়ে অনেক ‘জনমত’ গড়ার জন্য যেসব লেখা, সেসব পড়ে কেমন জানি লাগে। আসলে, যার বোঝার সে অল্পতেই বোঝে, যে বুঝেনা তাকে সমস্ত পৃথিবীর কথা বলেও বোঝানো যায় না।

কথায় পৃথিবী বদলায় না। মানুষগুলো কেবল তার ফ্রেমে অন্যকে দেখে। দৃষ্টিভঙ্গি বদলায় না খুব বেশি মানুষ, তাই জীবনগুলোও অমনই থাকে। সবাই জানে মিথ্যে বলা খারাপ, মিথ্যা সকল পাপের জননী। তবু লোকে মিথ্যা বলা কমায় না। সবাই জানে খাবারে নানাবিধ বিষ দেওয়া ক্ষতিকর। বন্ধ করেনা এ কাজ কেউ; এদিকে ক্যান্সারে, হার্টের-কিডনির অসুখে ভরপুর বাংলাদেশ।

অনেক কথার মাঝে সবাই নিজেরটা খোঁজে। নিজের চোখ দিয়ে নিজের মতন বোঝে। বাক্সের বাইরে কেউ যেতে চায়না, সত্যিকারের পরিবর্তন চায়না কেউ।

আপনারে আমরা খুঁজিয়া বেড়াই অন্যের মাঝারে…

০৪/০৭/১৭

Posted in ব্লগর ব্লগর | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

কীসের ক্ষমা? কোন ক্ষমা?

হাত ভরে ঘুষের টাকা, লোককে বাটে ফেলে অর্জিত ‘উপরি লাভের’ টাকা নিয়ে ভাগ-বাটোয়ারা মোটামুটি সেরে পাঞ্জাবি গায়ে চাপিয়ে আতর মেখে মসজিদে গিয়ে কদরের রাত খোঁজার এক সামাজিক ‘স্টেইটাস’ ছাড়বেন না আজকে সোলেমান সাহেব। মসজিদ কমিটির সদস্য সচিব, পৌনে নয়টার নামাজে আটটা চল্লিশে গেলেও সবাইকে ডিঙ্গিয়ে, অ্যাকাব্যাকা হয়ে প্রথম কাতারে চলে এলেন। এদিকে ঈদ চলে এলেও বেতনটা না পাওয়া মোখলেস মন খারাপ করে মসজিদের বারান্দায় বসে থাকে যে কিনা সিকিউরিটি গার্ডের চাকুরি করে। সে খুঁজবে আজ কদরের রাত। কোনো অ্যাডমিশন পরীক্ষায় চান্স না পেয়ে সবখানে খোঁটা খেয়ে তারেকের মন খুব খারাপ। আব্বু মারা যাওয়ার আগেও যেখানে বসতো, মসজিদের সেখানে এসে বসে আছে আজ। তারেক তার স্কুলজীবনের ক্লাসমেট সৌরভের সাথে আজকের আলাপের কথা ভাবছিলো। সৌরভ ভর্তি হয়েছে ইস্টওয়েস্টের বিবিএতে। ওর কয়েকটা গার্লফ্রেন্ড যাদের নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যায়, সেলফি তুলে। বন্ধুরা বলে ওদের সম্পর্ক বেশি ওপেন, আরো যা বলে সেসব কানে নিতে চায়না তারেক। সৌরভের আব্বু মসজিদে অনেক টাকা দেয়। তাই সবাই খুব সম্মান করে ওদের। সৌরভ জায়নামাজ হাতে করে মসজিদে ঢুকতেই খাদেম ওকে দরজা খুলে নিচতলার এসির অংশে ঢুকিয়ে দিলো। তারেক তাকালো মসজিদের গেইটের সামনের আজন্ম খোঁড়া ভিক্ষুকটার দিকে, তার নাম লাবু। লাবু আজকে নামাজ পড়বে না? লাবু কি কদরের রাত চায় না? লাবু কি ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে যাবে না? তারেক লাবুকে প্রতিদিন দেখে, সে খেতে বসলে অন্যদেরকেও সাধে। তারেকের মনে হয়, আল্লাহ কাকে কাকে ক্ষমা করবেন? তার জীবনে কী হবে? কী করবে সে ভবিষ্যতে? তারেক চিন্তার কূলকিনারা করতে পারে না, অসহায় অনুভব করে অশ্রুসজল চোখ বুঁজে বিড়বিড় করে, ‘আল্লাহুম্মাগফিরলি’…

২২/৬/১৭

Posted in ব্লগর ব্লগর | এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান