ভ্যাঙ্কুভারের কলিংউড স্ট্রিট

ভ্যাঙ্কুভারের কলিংউড স্ট্রিট দিয়ে হাঁটছিলো আসিফ। হঠাৎ বামে তাকায়, ছাইরঙ্গা বাড়িগুলোর চারপাশটা কী ভীষণ পরিচ্ছন্ন! বাড়িগুলোর ছাদ গ্রামের বাড়ির টালিদেওয়া ছাদগুলোর মতন হলেও এত নিপুণ নির্মানশৈলী! পথগুলো ছিমছাম, টিপটপ। ছবির মতন সুন্দর উপমা বোধহয় এরকম কিছুকেই বলে! আচানক মন খারাপ লাগে আসিফের। একটা সুন্দর দেখে তার মন খারাপ হওয়ায় আরো বেশি খারাপ লাগে। ঢাকায় ওদের বাসাটার কথা মনে পড়ে গেলো। পুরোনো একটা টিনের বাসায় থাকতে হতো, বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করত। মা আশেপাশের বাসায় গিয়ে কাজ করতো। চারটা ভাই ওরা। একটা ঘরে থাকতো। টিনের পার্টিশনের পাশের ঘরটাতে আব্বা-আম্মা থাকতো। আব্বা-আম্মার জীবন ছিলো ওদের নিয়ে। অল্প কিছুতেই ক্ষেপে যেত আব্বা। আসিফের খুব খারাপ লাগতো। আম্মার জীবন, আব্বার জীবন দেখে ওর অসহায় লাগতো। তাদের জীবনের পুরোটাই ঠেকে বেঁচে থাকা। অথচ মানুষ তো কত কিছু করে! ওদের জীবনে কি সেগুলো আসবে কখনো? মেঝে স্যাঁতসেঁতে, দরজার সামনে কমন স্পেস, ওখানে কাদা থাকতো বারো মাস। সামনের ঘরের রহিমা বেগম রান্নার পানিটা ওইখানেই ফেলতো। শতবার অনুরোধ করেও তারে বদলানো যায় নাই। এই বাড়ির সব পুরুষ রিকসা চালায়, অথবা মিস্ত্রির কাজ করে। রহিমা খালার খুব জেদ, লোকে বলতো সে নোয়াখালির বলে নাকি ওরকম। অনুরোধে তার কোন বিকার নাই। ওদের ঘরটায় বৃষ্টি হলে ঘরের চালা দিয়ে পানি পড়তো, ঘরে পানি জমে যেতো। সেদিন সারাদিন সারারাত বৃষ্টির পর বাসার সামনের রাস্তায় ড্রেন উপচে পানি ঘরে ঢুকে গেলো।

আসিফ হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করলো। বাটার নর্থ স্টারের নেভি ব্লু কেডস পরে এই পথে দৌড়াতে গিয়ে গোড়ালিতে ঝনঝন টাইপ অনুভূতি হচ্ছে। একটা নাইকি জুতার অনেক স্বপ্ন ছিলো আসিফের। ঐটা পায়ে দিলে নাকি ভাঙ্গা রাস্তাও মাখনের মতন লাগে। ওয়েস্টিন বে-শোরে এসে সমুদ্রপাড়ে অজস্র স্পিডবোড দেখতে পেলো। বসার মতন কিছু নেই, পথে সমুদ্রতীরের এপারে রেলিং-এ হেলান দিয়ে বসে ঝিমাতে শুরু করে। ঘোর ভেঙ্গে দেখে একটা জাহাজ নেমেছে। একদল লোক বন্দুক হাতে গুলি করছে কিছু সাদামাটা পোশাকের লোকদের। সে জানে এরা হচ্ছে ‘স্ক্যামিশ’। কেমন করে জানে তা মনে করতে পারলো না। ১৫৭৯ সালের এরকম একটা ঘটনা সে শুনেছিলো মনে হচ্ছে। কিন্তু ক্যামনে কী! সে হেলান দিয়ে আছে গাছের গুড়িতে। ব্রিটিশ জাহাজ এসেছে এখানে লোক নিয়ে। এরা এখানে একদল লোক রেখে ওরা চলে যাবে। আসিফ কেমন করে যেন জানে যে স্ক্যামিশরা সব মরে যাবে, এই লোকেরা এখানে আধিপত্য করবে। বুক ধরফর করে উঠলে তার, বুঝলো এখন পালাতে হবে। সে লাফ দিয়ে পানিতে ডুব দেয়। উঠে দেখে চেনা-পরিচিত চেহারা কতগুলো। গলা পর্যন্ত পানি তার, নিচে কেমন ঢালাই করা সমতল। বুঝতে পারছে পানি জমে থাকা পথে সে উঠেছে। মাথার উপরে পলিথিন একটা, কাঁঠালের কোয়া আর আমের খোসা মিলে পলিথিনটা অসহ্য। সাইনবোর্ডে চোখ দিয়ে দেখা যাচ্ছে কালশী, ঢাকা। আসিফ হর্নের শব্দ পেয়ে তাকিয়ে দেখে একটা বাস হড়হড় করে এগিয়ে আসছে, বিকট হর্ন; চাকা ঘুরছে আর পানির ঢেউ উঠছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারালো সে।

১৪/০৭/১৭

Advertisements

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in পরাবাস্তব. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s