শিক্ষায় টইটম্বুর


নব্বইয়ের দশকেও শুনতাম ‘ভালো পাত্র/পাত্রী’ খুঁজতে মানুষ ‘মাস্টারের ছেলেমেয়ে’ দেখতো। মাস্টাররা সম্পদের জগতে নাকাল হলেও নৈতিক শিক্ষায় বিশাল ছিলেন। নৈতিক শিক্ষাকে মূল্যায়িত করার সেই ব্যাপারটার একটা সামাজিক স্বীকৃতি হয়ত সেটা ছিলো। অর্থাৎ, শিক্ষার প্রতি আকাঙ্ক্ষা সমাজে ছিলো। তাহলে কি এখন নেই? আছে। এখন আছে ডিগ্রির প্রতি আকাঙ্ক্ষা। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানিয়ে জাতে ওঠার উদগ্র বাসনা। ঘরে ঘরে এখন মাস্টার্স সন্তান।

তাহলে অনেক শিক্ষা হচ্ছে দেশে। বিগত কয়েক দশকে হয়ত শিক্ষায় টইটম্বুর হয়েছে সমাজ-দেশ-জাতি। দুঃখ লাগে, দেশের অজস্র পথশিশুদের আমি বড় হয়ে উঠতে দেখলাম। ওরা বিভিন্ন বাসের, লেগুনার হেল্পারি করে। কিছু হলে মুখ খারাপ করে গালি দেয়, দু’চার ঘা বসিয়ে দেয়া, ভাংচুর করাও ওদের জন্য ব্যাপার না। এরা ছোট থেকে ‘শিক্ষা’ পায়নি। অনেকে বাবা-মায়ের কোনো আদর-শাসন ছাড়াই দিব্যি বড় হয়েছে, দয়া-ভালোবাসা বুঝেনা তাই এদেরকে দিয়েই খুন-খারাবি করিয়ে ফেলে কয়েক হাজার টাকা দিয়েই! যদিও সম্ভবত এই দেশে এই সামাজিক শ্রেণি কারো কোনো চিন্তার উদ্রেকও করেনা। তবু মনে হয়, এই শ্রেণি এরকম আচরণ করাই স্বাভাবিক। যারা ভালোবাসা পায়নি, যারা বড় হওয়ার মাঝে সামগ্রিকভাবে ব্যবহারে-আচরণে, কৃষ্টি-কালচারে নম্রতা-ভদ্রতার গড়ে ওঠার বালাই নাই, তারা যা দেয়, সেটাই তো বেশি!

কিন্তু আশ্চর্য লাগে প্রায় ১৪-১৬-১৮ বছরের স্কুলিং করা সন্তানগুলোর চোখের-মুখের ভাষা, আক্রোশ-ক্রোধোন্মত্ততা ঐ চালচুলোহীন সন্তানদের সমতুল্য হওয়ার সাধারণ সংস্কৃতি হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাতে। আমি জিপিএ-ফাইভের দৌরাত্ম্য নিয়ে বলতে চাচ্ছিনা, সেইটা আরেক বিষয়। আমি বলতে চাইছি, আমরা যেই মাস্টার্স (এমনকি পিএইচডি) করে ভাবলাম আমাদের সন্তানেরা ফুলে-ফলে ভরে উঠছে/উঠছি, সেই ডিগ্রি আসলে কিছুই শেখায়নি। সত্যিকারের দক্ষতা আমাদের কোনো সেক্টরেই নাই। টিকিট কাউন্টার হোক, কোনো রিসেপশনে হোক, সার্ভিস লেভেলে আমরা কোনো দক্ষতা দেখিনা। দক্ষতা দূরে থাক, একটা ন্যুনতম রুচির জন্মও হয়না ১৬ বছর ধরে পড়ে গ্র্যাজুয়েট হয়ে! অদ্ভুত!

শিক্ষিত মানুষ এবং অশিক্ষিত চান্ডালের পার্থক্য তো সার্টিফিকেট বাঁধাই করে ঘোরার মাঝে নয়। আমাদের কথায়, চেহারার প্রকাশ, শব্দচয়ন, কথাবলার ঢং শাণিত হওয়া যদি ১৬ বছরের পড়াশোনার সত্যিকারের প্রাপ্তি না হয়, তাহলে আসলে আমাদের জাতির লজ্জিত হয়ে মরমে মরে যাওয়া উচিত। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছেলেমেয়েগুলোর হাতে মার খেয়ে হাত পা ভাঙ্গা মানুষ হয়ত কম নেই। সেদিন ফুচকাওয়ালা ‘রেগুলার মাগনা খাওয়া’ এক ‘ইউ-নো-হু’ ভাইয়ের কথা বলে আক্ষেপ করলো সাবধানে। শিক্ষার বাই-প্রোডাক্ট এইসব উগ্র ত্রাসত্ব করা। পথে ঘাটে “ঐ ***র বাচ্চা, আমারে চিনোস হালা?” বলে চড়-থাপ্পড় মারা ছেলে/পুরুষগুলোর বেশিরভাগই ‘শিক্ষিত’।

বছরের পর বছর চলে যায়। আমরা পরমভাবে শিক্ষিত জাতি হতে থাকি। ভাষার মাস আসে। ভাষার ব্যবচ্ছেদ হয়। ভাষার প্রয়োগ আর অপপ্রয়োগের দুরত্ব কমে আসতে থাকে। প্রগতি হয়ত একেই বলে!

১৯/০২/১৭

Advertisements

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in দেশ. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s