তার বিদায়ের পরে


প্রতিটি বুধবার রাতে এসেই খেয়াল হতে থাকে এমন একটা রাতেই বড় ভাইয়াকে আল্লাহ নিয়ে চলে গেলেন। দেখতে দেখতে চারটা সপ্তাহ চলে গেলো সেই ঘোরময় রাতটার পর। হাসপাতালে গিয়ে মৃতদেহটা দেখার পরে থম মেরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নিজেকে শেখালাম ভাইয়া আর কোনোদিন ফিরবে না, সেই সৌম্য গলায় আদর করে নামটা ডাকবে না। আল্লাহ মানুষটার বর্ণাঢ্য জীবনটাতে যতি এনে দিয়েছেন। আর ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরা লাগবে না, অসভ্য জঞ্জালময় মানুষগুলোর সাথে লেনদেনের যন্ত্রণাও সইতে হবেনা। ভাইয়াকে আল্লাহ মুক্তি দিয়েছেন, ছুটি দিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছেন। অনন্যসাধারণ ইতিবাচক মানুষটাকে জগত সংসারের সবার হৃদয়ের সমস্ত জালগুলো ছিঁড়ে আল্লাহ নিজের কাছে নিয়ে চলে গেলেন। পেছনে তার প্রতি সন্তুষ্ট ও সদা প্রার্থনারত বাবা-মা, স্ত্রী-কন্যাদ্বয়, ভাইবোনদের বিশাল মানবগোষ্ঠী রেখে দিলেন।

তার বিদায়ের পরে যা কখনো ভাবিনি, তা ভাবতে-দেখতে-করতে হয়েছে। আমার পৃথিবীতে আগমনে যে চারপাশের সবাইকে আনন্দে আলোড়ন জাগিয়েছিলো, তার নিস্প্রাণ দেহটা কাঁধে বেয়ে মাটির নিচে রেখে তাকে বিদায় দিতে হলো আমাকে! যে ভাইয়া আমার অস্ত্বিত্বের সাথে জড়িয়ে ছিলেন, যার কাছে আমার জীবনটা আকুন্ঠভাবে ঋণী, সে তো দিব্যি চলে গেলো। আর অনুভূতি আর উপলব্ধির চলমান জ্বালা– সে তো বেঁচে থাকা মানুষদের জন্য! ছোট হয়ে বড়দের কাছ থেকে নিয়েই গিয়েছি, ফেরতটুকু দেবার আর্তি ছিলো বুকে, সুযোগটুকু আল্লাহ দিলেন না। ভাইয়া চলে যাবার পরে বুঝতে পেরেছি, জগত সংসারে ‘ছোট’ হবার একটা আনন্দ আছে। ‘প্রিয়জনেরা শাসন করুক আমাকে’ এমন তৃষ্ণা নিয়ে নিশ্চয়ই আরো অনেক মানুষ ছুটে চলে এই মাটির উপরে…

প্রতিদিনই তো অনেক মানুষ চলে যায় পৃথিবী ছেড়ে। এই মৃত্যুর মিছিলের সবাইই পেছনে ফেলে যায় অদ্ভুত অতীত। সবটুকুই তো রেখে যাওয়া। কেবল শরীরটা মাটির নিচে। কী অদ্ভুত আমাদের বেঁচে থাকার মোহগ্রস্ততা! তবে, কেবল নিজের ভাই বলে নয়, আমি জানি আমদের পরিবারের সবার বড় ভাইটি অনন্যসাধারণ ছিলেন, অযুত-নিযুত মানুষের মাঝে এত মহান হৃদয় খুঁজে পাওয়া যায় না সহজে। দৃপ্ত আত্নবিশ্বাসে ভাইয়া তার মালিকের সাথে মিলিত হবার আশাবাদী গল্প অবলীলায় বলতেন বেঁচে থাকা জীবনেই। নানাবিধ উত্থান-পতন, অসুস্থতা ও ঘাত-প্রতিঘাতের জীবনটাতে আল্লাহ যাকে জনমভর পরীক্ষা নিয়েছেন, প্রার্থনা করি মাটির নিচের ছোট্ট ঘরখানিকে আল্লাহ যেন জান্নাতের টুকরা বানিয়ে দেন। আল্লাহ যেন তার প্রতি জীবনের কঠিন সময়গুলোতেও বিশ্বস্ত থাকা, পরোপকারী, ভালোবাসাময় রহমদীল মানুষটার ভুলত্রুটিগুলো ক্ষমা করে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দেন।

২৩/০২/২০১৭

Advertisements

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s