সৃষ্টির এই অতল গভীরতায়

ক্রমশ গভীর হয়ে আসা রাতের একটা সময়ে দূর থেকে ভেসে আসছিলো “আধো রাতে যদি ঘুম ভেঙ্গে যায়…” গানটার সুরের ঢেউ, কন্ঠের আর্তি, অদ্ভুত এক হাহাকার মিলে কথাগুলো ভাসছিলো। সেই ১৯৪৮ সালে যে গানটা রচনা হয়েছিলো, নতুন শতাব্দীতে এসে গানটি শুনে অনুভূতির ঢেউয়ে ভেসে যেতে যেতে আমার চাপা একটা কষ্ট হয় কেন? হয়ত আমি অনুভব করতে পারি গান লিখতে কতটা জ্বালা হতে হয় বুকে, বুকের ভেতর কতটা হাহাকার হলে গানে সুর ওঠে, মন-শরীর মিলে কতটা অনুরণন হলে গানের সৃষ্টি হয়ে ওঠে…

ওইতো, ‘বাঁধন-হারা’ উপন্যাসটা পড়ার সময় নজরুলের প্রতি আমার যে সম্মান আর মোহমুগ্ধতা জেগেছিলো সেটাও সেই সৃষ্টির পেছনের কষ্ট উপলব্ধি করেই। এখনো খুব সুন্দর কোনো একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বুকে হাহাকার জেগে ওঠে। ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়’ গানটা শোনার সময়েও বুকে অস্থিরতা জেগে উঠেছে জীবনে অনেক। রবিঠাকুর কাকে এত খুঁজেছেন সবখানে? সঞ্চয়িতা নিয়ে কাটানো শত-শত রাত্রিদিনেও কি এই হাহাকারকেই খুঁজে পাইনি আমি কবিতার ছন্দে-ছন্দে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে? সাবরীর হাতের আঁচড়ে জেগে ওঠা একেকটা ছবির সাক্ষী আমি থেকেছি, দেখেছি কতটা শ্রমের ফসল একেকটা সৃষ্টি। মানুষগুলো তাদের সময়গুলো শেষ করে চলে গেছেন অনন্তের জগতে, আমরা অসহায় দ্রষ্টা হয়ে তাদের সৃষ্টিগুলোকে উপভোগ করে যাই।

চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় ‘যতদূর দৃষ্টি যায়’ ততদূর বিস্তৃত কলেজ, টিটিসি দেখে এক বিশালতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলার অনুভূতি হয়েছিলো, সম্মান জেগেছিলো ইদরিস সাহেবের প্রতি যিনি নিজের এই বিশাল জমি লিখে দিয়েছিলেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য। আচ্ছা, কতটা বড় হৃদয় হলে মানুষ অমন করতে পারে? সেই মানুষগুলোর কথা মনে হয় যারা ইংরেজদের হাত থেকে এই দেশের মানুষের আজাদীর জন্য চেষ্টা করে চলেছিলেন বছরের পর বছর। একটা সময় স্বাধীন হয়েছিলো উপনিবেশ থেকে, সেই মানুষেরা হয়ত জানেননি।

বড় কাজগুলো যারা করেন, তারা কি আদৌ কোনোদিন উপভোগ করতে পারেন? আমার কাছে মনে হয়, যিনি যত বেশি উপভোগ করতে পারেন, তিনি তত বেশি ক্ষুদ্র মানুষ। যারা বড় মানুষ, তারা পারেননি কিছু ভোগ করতে। ভোগ আর সৃষ্টি কি পরস্পর ব্যাস্তানুপাতিক নয়? “আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন” গানটা শুনতে শুনতে আবার যেন ডুবে যাই সুরের ঢেউতে, শিউরে উঠি অনুভূতির কম্পনে… আচ্ছা, এত অল্পের মাঝে এত গভীরতা আল্লাহ কেমন করে দিলেন? সৃষ্টির এই অতল গভীরতায় ডুবে থেকে মানুষ কেমন করে সহ্য করেছে নিজের অসহায়ত্ব আর ক্ষুদ্রতাকে? কেমন করে মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী দেখে গেছে সভ্যতার পালাবদলে ভীষণ পরিবর্তনগুলো। সবাই কি পারে নির্বিকার চেয়ে থাকতে? পারে গ্লানিগুলো সয়ে যেতে?

০১/০৯/১৬

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in যাপিত জীবন, স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s