মানুষগুলো কী অদ্ভুতভাবেই না বেঁচে থাকে

কেমন অদ্ভুত করে যেন সবাই বেঁচে থাকে। দুর্বল দেহের বৃদ্ধ মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে কেমন চোখ ভিজে আসে যেন প্রায়ই। আজীবন সংসারের সবাইকে আগলে রেখেছিলেন যিনি, তিনি লাঠির উপরে ভর করে জীবনটাকে স্মৃতিকোঠায় তুলে রাখেন। ঠিক এমনি করে বার্ধক্যে রোগে ভুগে কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলী হয়েছিলো পারকিনসন্স রোগী, প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে দেয়া মানুষটার ম্যাচের কাঠি জ্বালানোর সম্ভাবনা ছিলোনা। অথবা মাশরাফি মোর্তাজার দশ-পনেরো বছর আগের দুর্দান্ত তারুণ্য এখন প্রৌঢ়ত্বে আর অস্ত্রোপচারের অসহায়ত্বমাখা চেহারা হয়ে গেছে। তুমুল যৌবনে আলোচিত মুখরিত রেখা, মাধুরী, ববিতা, শাবানারা এখন দাদীমা। জীবনের পেছনটা হয়ত কিছু দীর্ঘশ্বাস। প্রতিদিন গুণে গুণে ঔষধ গেলার সময়ে সুবর্ণার হয়ত মনে পড়ে হুমায়ূন ফরীদীর কথা। তীব্র যৌবনের মোহময় কবিতার চূড়ায় বসে শহীদ কাদরী, শামসুর রাহমানদের সাথে অন্তরঙ্গ আল মাহমুদও এখন মৃত্যুর কথা ভাবেন। শব্দে যারা ছড়িয়েছেন বিষ্ময়, জীবনকে তাদের হয়ত অন্যরকম মনে হয়।

আমাদের শিশুদের কোলে তুলে বুকে চেপে ধরে চোখ ভিজিয়ে তোলা আবেগটার কোনো ব্যাখ্যা হয়না। হয়ত একে বলে, ‘বাবারে/মারে, তোকে আমি আগলে রাখতে চাই পৃথিবীর সমস্ত জঞ্জাল থেকে’ কিন্তু আদতে কেউ কি পারেন? মায়ের কোলে গুলিবিদ্ধ সন্তানটির কথা ভেবে সহস্র মায়ের বুক কেঁপে ওঠেনা? ছিনতাইকারীর পিস্তলের মুখে সমস্ত দিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে ফেরা বাবাটির কলিজায় মোচড় দিয়ে ওঠে তার সন্তানের অনিশ্চয়তাময় ভবিষ্যত পৃথিবীর কথা ভেবে… তবু নতুন প্রজন্মের আগমনের গতি মন্থর হয় না। পৃথিবীর নিদারুণ নিয়মে নির্বিকার মানুষ চলতে থাকে।

কিশোর সুকান্ত এমন কিইবা নষ্ট পৃথিবী দেখেছিলেন সেই বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে? তবু তো লিখেছিলেন এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে যাওয়া নবজাতকের কাছে তার দৃঢ় অঙ্গিকার। প্রচুর ফ্লাইওভার, পারমানবিক বিদ্যুতকেন্দ্র, কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্র, টাম্পাকো-তাজরিন-হামীম-রানাপ্লাজার এই দেশ কল্পনাও করতে পারেননি তারা। আমরাও জানিনা আমাদের কয়েক দশক পর কতটুকু মৃত্যুপুরী হবে এই দেশ। হুমায়ূন আজাদ কতটুকু নষ্টদের হাতে চলে যাবে বলে আত্মশ্লাঘা প্রকাশ করেছিলেন? পরের প্রজন্ম তো আগের প্রজন্মকে সবদিক থেকেই পরাজিত করে।

মানুষগুলো তবু অদ্ভুত ভাবে বেঁচে থাকে। বেঁচে না থেকে উপায় নেই, আশাবাদী না হয়ে উপায় নেই, চুপ থাকার উপায় নেই বলে কাজ করে, কথা বলে। একান্ত নির্জনে কয়জন নিজেকেই ভালোবাসে? ক’জনা সত্যি করে নিজেকে বিশ্বাস করে? ক’জন নিজের চিরবিদায়ের ভাবনাকে আতংকহীনভাবে কল্পনা করতে পারে? তবু, মানুষগুলো কী অদ্ভুতভাবেই না বেঁচে থাকে!

১৮/০৯/১৬

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in যাপিত জীবন. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s