কতটা জ্বালা ধরা বুকে বের হয় একটা কবিতা?

লাইব্রেরিতে গেলে বুকে খা খা অনুভূতি হতো আমার, এখনো হয়! এই অনুভূতিটা প্রথম ফিল করেছিলাম ক্যাডেট কলেজের লাইব্রেরিতে। মাত্র ৪০ মিনিটের জন্য বই বেছে নিয়ে বসতে হবে লাইব্রেরি ক্লাসে। যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, বই বাছতে প্রথমে বাংলা সেকশনে ঘুরতাম। একগাদা সূর্যদীঘল বাড়ি, লা নুই বেঙ্গলি, ন হন্যতে, লারা। রবীন্দ্র-শরত-নজরুলে ভরপুর তাকগুলোর প্রায় সবই পড়া/চেনা/অপছন্দের বই। সেলিনা হোসেনকে চিনতাম না তখনো, চিনতাম না আবু ইসহাককেও। অনেকে হুমায়ূন পড়তো। আমার হুমায়ূন সব পড়া শেষ। পেছনের কর্নারে নির্মোহ জ্ঞানমার্কা সেকশন ছিল। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, এজুকেশনের উপরে। ঘুরে টুরে গিয়ে ইংরেজি লিটারেচার সেকশনে ধাতস্থ হলাম। বিশাল সাইজের ইংলিশ লিটারেচার নামের বইতে চোখ আটকালো। এরপর প্রায় অর্ধবছর প্রতিটি লাইব্রেরি ক্লাসে সেটাই নিয়ে বসতাম। ক্যাডেট কলেজ লাইব্রেরিকে গিফট দিয়েছিলো কোনো একটা দেশ, স্পষ্ট মনে পড়ছে না। মনে পড়ে পাতা ওল্টানোর কথা। এই দেশে জন্ম নেয়া সাধারণ পাবলিকদের মতন কলোনিয়াল মানসিকতায় প্রভাবিত আমি হয়ত তখন ইংরেজি লিটারেচারকে একটু বেশিই শ্রদ্ধা করি…

টেনিসন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, মার্লো, লংফেলো, ফ্রস্ট… মিষ্টি বইয়ের পাতাগুলো। আমি একেকটা লাইন পড়ে ডুব দিয়ে বসে থাকি। কী একটা লাইন ছিলো যেন, লংফেলোর মনে হয়, “Pity would be no more if we did not make somebody poor”…. ‘And mutual fear cuts a snare’ অথবা উইলিয়াম ব্লেইকের ‘I am black but O my soul is white!’ … অথবা ইয়েটসের “I saw, before I had well finished, All suddenly mount/ And scatter wheeling in great broken rings/ Upon their clamorous wings.” অনেকগুলো কবিতা ঘাঁটতাম, প্রবন্ধও। মনে পড়ে, ঔড টু নাইটিঙ্গেল, ঔড অন আ গ্রিশিয়ান আর্ন। বুঝতাম না, গুগলে সার্চ দিয়ে সামারি জানার কায়দা ছিলো না। মাঝে মাঝে ক্লাসে সুযোগ পেলে রফিকুল ইসলাম স্যারকে জিজ্ঞাসা করা যেত। ইলেভেনে কায়সার আলম স্যারকেও বলেছিলাম।

কতটা জ্বালা ধরা বুকে বের হয় একটা কবিতা? কিংবা, একটা গল্প? আমি হয়ত বেশি বেশি মুগ্ধ হতাম। বড় ভাইদের কবিতাগুলো পড়তাম ওয়াল ম্যাগাজিনে, দি আউটলুক নামের হাফইয়ার্লি পাবলিকেশনে। কেমন করে ঐসব লেখা যায়? একটা শব্দের ঠিক পাশে ওই শব্দটাই কীভাবে বসানো যায়? হঠাৎ হুমায়ূনের কথা মনে হলো, তার কাছেই ফ্রস্ট, ইয়েটসদের নাম পড়েছিলাম। হুমায়ূন অসাধারণ একটা লোক ছিলেন, অনন্যসাধারণ এক ট্যালেন্ট। পৃথিবী কখনো রিটার্ন দিতে জানেনা। পৃথিবীর জীবনের পরের জীবনেও আসলে রিটার্ন হয় না সবকিছুর। কিছু মানুষ জন্মই নেয় কন্ট্রিবিউট করতে, কিছু মানুষ জন্ম নেয় কনজিউম করতে। এই অদ্ভুত খেলার মালিক স্রষ্টা নিজেই। এই সমীকরণের উভয়পক্ষকে তিনিই জানেন, তিনিই বুঝেন। মানব জীবনের সীমাবদ্ধতা ও ধর্মই সমীকরণের এক প্রান্তে থাকার মাঝে। যা করার করে যাওয়া। রবিদা নিজের কবিতা পড়ে মুগ্ধ হননি, তিনি এক শূণ্যতা থেকেই লিখেছিলেন, “আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি তোমায়”… এই শূণ্যতার উপস্থিতিই তাদের লিখিয়েছে। নিজেকে পুড়িয়ে তারা এনেছেন লেখনী। আমরা কনজিউমার, কবিতা পড়ে, গান শুনে সময় কাটাই, চায়ের কাপে চুমুকের আয়েশ করি। যে হৃদয়ের যে জ্বালা সেই শব্দগুলোর জন্ম দেয়, তা অনুভব ও আবিষ্কার করারও এখতিয়ার নেই আমাদের।

যে যত বড়, সে তত যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। যারা বড়, তারা কখনো নিজ বড়ত্বকে উপভোগ করতে পারে না। যারা সেই উপভোগ করতে পারে, তারা কখনো সত্যিকারের বড়ো না, তারা বিভ্রান্ত। অদ্ভুত এই পৃথিবীর সমীকরণ। কিন্তু তবু খুব স্পষ্ট। হিয়ার মাঝে লুকিয়ে থাকলেও আমরা দেখতে পাইনা এই ইন্দ্রজাল।

30 June ·

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in যাপিত জীবন, স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s