চক্র

ভয়ংকর গল্প-উপন্যাস যেখানে শেষ হয়, সকল জীবনের অভিজ্ঞতা আর ধাক্কাগুলো সেইখান থেকে যেন শুরু! কবি-সাহিত্যিক-লেখকের দল শব্দগুলোকে যতটা বাধ্যগতভাবে প্রকাশ করে বিশাল কিছু অনুভব হওয়ান,তার চাইতে লক্ষ-কোটিগুণ বেশি কথা লেখার কেউ থাকেনা। সত্যি কথা হলো, প্রকৃত কষ্ট-সাহস-তীব্র অভিজ্ঞতার বিষয়গুলোর মধ্য দিয়ে যারা যায়, তারা সেগুলোকে ‘নাট্যমঞ্চে’ আনার সুযোগ পান না। যিনি মৃত্যুর আগে ভয়ংকর বিভীষিকা আর নির্মমতার মুখোমুখি হচ্ছেন, তার এই অভিজ্ঞতা কেউ কোনোদিন লেখা/দৃশ্যায়ন/উপস্থাপনের সুযোগ পায় না; কারো উপলব্ধি হয়ও না। আসলে, কেউ হয়ত অন্য কারো, অন্য কিছুর উপলব্ধি করতে পারেও না যতদিন না পর্যন্ত সেগুলো তার নিজের জীবনে হয়। তাই যারা নিজ জীবনে সত্যিকারের চরম ভাঙ্গন-লাঞ্ছনা-গঞ্জনার মধ্য দিয়ে পার হন, তারা সমব্যাথী হতে জানেন।

সৃষ্টিশীল মানুষ এবং তাদের হাতে গড়া সৃষ্টির প্রতি অন্য অনেকের চেয়ে আমার হয়ত তীব্র ভালোলাগা কাজ করে। হোক সেটা কৈশোরে বৃষ্টির দিনে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় বুঁদ হয়ে থেকে শব্দ দিয়ে গাঁথা মালায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাওয়া, কিংবা শত-সহস্র বছর ধরে জ্ঞানের জগতে বেঁচে থাকা কল্পনাতীত বড় হৃদয় ধারণ করে নির্লোভ ত্যাগে জীবন পার করে দেয়া আলেম-উলামাদের জীবনই হোক; অথবা, এক জীবনে সান্নিধ্য পাওয়া কিছু বিশাল হৃদয়ের মানুষগুলোই হোক– এদের নিজ নিজ জীবনকে ধারণ করার বেলায় যে তরঙ্গ হৃদয়ে খেলতো– সেকথা কল্পনা করতে গেলেও বুক ধরফর করে, অস্থির লাগে। পৃথিবীতে কখনই বড় কিছু হয়না, যতক্ষণ না পর্যন্ত স্রষ্টা নিজে তার চেয়ে কল্পনাতীত বেশি ভুক্তভোগী হন।

মানব জীবন খুবই ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যের তা আমাদের ফেলে অনন্ত জগতে চলে যাওয়া একের পর এক সহপাঠী, সহপাঠিনীদের দিকে তাকিয়ে টের পাই। রেজা, ইকবাল, রুমা, অপূর্ব, মেহেদী– জীবনকে নিয়ে ভাবতে পেরেছিলো কি? তার আগেই ওরা চলে গেছে, স্থায়ী যতিচিহ্ন তাদের জীবনে। আমরাও কী কিছু ভাবতে পারি? কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া, সকালে উঠেই দুদ্দাড় প্রতিদিনের প্রস্তুতি আর সারাদিন তাতে কাটিয়ে দেয়া–সবটুকুই বেঁচে থাকার জন্য– বাঁচাকে সুন্দর করতে না। বর্তমানগুলোতে কারোই কিছু রয় না। তবু এতকিছুর পরেও কিছু মানুষ মোমবাতির মতন নিজেকে জ্বালিয়ে অন্যদের আলো দেয়। এমন নয় যে তারা খুব শান্তি পায়, খুব সফলতা পায়। আসলে তারা অমনই, ওভাবেই তারা বাঁচার কথা; ওই মানুষগুলোকে দিয়েই লক্ষ-কোটি-বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন মানুষ উপকৃত হবার জন্য সৃষ্টি করেন মহান স্রষ্টা। নইলে, এই নিদারুণ অন্তহীন সৃষ্টিকর্মের জ্বালা কেমন করে মানুষগুলো করতে পারেন?

জীবিকার্জনের জীবনের চক্রে ঢুকে পড়া মানুষগুলো বৃদ্ধ হওয়া অবধি ছাড় পায় না। যখন ছাড় পায়, তখন চলাফেরার অযোগ্য; জীবনের ‘শেষ সময়’ হিসেবে তখন বিদায়ের ঘন্টাধ্বনি তাদের হৃদয়ে বাজতে থাকে। গোটা জীবনের দিকে তাকিয়ে হিসেব নিকেশের জ্বালাও কি ধরে বুকে? কে জানে? এই চিন্তাগুলো ভুলে থেকে, মন অন্যদিকে সরিয়ে, অসার অগভীর কিছু বলে নিজেকে ‘বুঝ’ দিয়ে সবাই বেঁচে থাকতে চায়। চোখ বুঁজলেই কি আর সামনের সবকিছু হারিয়ে যায়?

১২/০৬/২০১৬

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s