বদ্ধতা কিংবা আবর্তন


এডিটরটা খুলে শিরোনাম দিলাম। আমার কাছে ব্যাপারটা একটু হাস্যকর, কারণ লেখাটা দাঁড় হয়নি। কি লেখা হবে কিনা তাও জানিনা। অনেকদিন লিখিনা যেই সংকোচ বা উন্নাসিকতা থেকে, আজ সেখান থেকে একটু বের হবার চেষ্টা আরকি। সেটা নিয়েই শিরোনাম দিয়ে বসলাম — বদ্ধতা কিংবা আবর্তন। প্রায় ৫ বছর হতে চললো এই ব্লগের বয়স। ক্লাস এইট থেকে ডায়েরি লেখার শুরু ছিলো আমার, ঐটাই ইন্টারনেটে কানেকটেড হবার পর থেকে ব্লগে রূপ নিলো। প্রথম দিকে তো কবিতা আর কিছু সাহিত্যমার্কা চিঠি লেখার বালখিল্য চেষ্টা ছিলো। একসময় দেখলাম ঘুরে ফিরে একই রকম অনুভূতি আমার, কথাগুলাও তাই প্রায় একই রকম। দু’হাজার সালের ডায়েরির পাতাও আজ থেকে চৌদ্দ বছর আগেও এমনটাই মনে হতো। প্রতিটা পাতা প্রায় কাছাকাছি। আমার জীবনে কি বৈচিত্র্য কম? নাকি আসলে মানব জীবনটাই এমন?

ঘুরে ফিরে মানুষের জীবনগুলোও মনে হয় একই রকম। একসময় ছিলাম কিশোর, চারপাশে উচ্ছ্বাসভরা বন্ধুদের বসবাস, নিয়মনীতির এক জালে বেঁচে থাকার প্রাণান্ত। একসময় এলো প্রকৌশলবিদ্যার বন্ধুদের মাঝে যৌবনের বেলা। আমি তখন দ্রষ্টা, চারপাশের যান্ত্রিকতা পেরিয়ে একটু অনুভূতির স্পর্শ পেতে মরিয়া। এরপর থেকে দশটা-ছয়টা এক অদ্ভুত চক্রে ঘুরছি তো ঘুরছিই। চারপাশ অনেক বদলে গেছে, আমি ভাবতাম হয়ত সময় অতিক্রমনে আমার এই বদ্ধতা বদলে যাবে। যায়না আসলে। এই অনতিক্রম্যতার গূঢ় রহস্য পেরিয়ে যেতে আমি থৈ পাইনি কখনো। ম্লান লাগে আমার নিজেকেই, নিজের বোধ, চারপাশ, এই দু’চোখ আর আমার অস্পৃশ্য ভোঁতা অনুভূতিগুলোকে…

নাকি হয়ত চিন্তাগুলো বদ্ধ না, এগুলোর আবর্তন হয়। এটা ঠিক, আমি সচরাচর মন ভালো থাকলে লিখিনা কখনো। লেখার সাথে আমার বেদনার সম্পর্ক খুব গভীর। বেদনাহত সবাই, আমি একটু বেশি। নিখুঁত হতে চাওয়ার যে মানসিকতা জীবনে আমার অজানায় আমাকে আচ্ছন্ন করেছিলো, তার ক্রমাগত দংশনে আমি বিহবল থাকি, বেদনার্ত আর আহত হই বেলায় আর অবেলায়। এই তো জীবন। অল্প ক’দিন বেঁচে থাকা এই বাতাসে, এই আলোতে। চিন্তার আবর্তন আমাকে তাই চক্রে বেঁধে ফেলে।

মাঝে মাঝেই মনে হয় আমি এমন কেন? একবার বন্ধু একবার কার উপরে যেন খেপে গিয়েছিলো। আরেকজন যতই ওকে জিজ্ঞাসা করে তুই ওর উপরে খেপা কেন, ও তো তোর ক্ষতি করেনি। তার উত্তর ছিলো, “ও এমন ক্যান?”… ঘটনাটা মনে পড়লো। নিজেকেই মনে হয় আমি এমন কেন? নিজেকে নিয়ে নিজের অসন্তুষ্টি বোধকরি কখনো শান্তি দিতে পারে না। আমি এমন হতে চাইনি। সর্বশক্তিমানের ইচ্ছা আমাকে জীবনে স্রোতে হতবিহবল করে এখানে এনেছে অনেক ঘটনা পেরিয়ে।

চক্র শব্দটি লিখে মনে পড়ে গিয়েছিলো ছেলেবেলার কথা। চক্রে যাদুকর আর ডাইনিদের শাপ দেয়া। আমিও তাই কিছু চিন্তার আবর্তনে পড়েছি চক্র থেকেই। চিন্তার শাপ আমাকে যেমন ক্ষতবিক্ষত করে, আমিও প্রচন্ড অসহায়ত্বে পালাবার চেষ্টা করেও বঞ্চিত হই। আমি হয়ত একই লেখা লিখছি বছর বছর ধরে। পুরনো লেখাগুলো পড়িনি অনেকদিন।

আমার মনে হয় আগেও এমনই লিখতাম। উপন্যাস পড়া হয়না অনেকদিন। একটু প্রশান্তিতে পাতায় পাতায় কোন এক ঔপন্যাসিকের অনুভূতিকে পুড়িয়ে জ্বালানি করে বের হওয়া শব্দ-রক্তগুলো থেকে অনুভূতির গন্ধ নেয়া হয়না অনেকদিন। আমার ইচ্ছে ছিলো, লিখিয়ে হবো। সম্ভব না। জীবনে অনুপ্রেরণা লাগে এগিয়ে যেতে। আমি নিজের কাছে এক প্রচন্ড ভার। লিখিয়েরা নিজেদের ভারে ভারাক্রান্ত থাকতেন না। এক উদগ্র কষ্ট তাদের লেখাতো। আমি নিশ্চিত, কোন শান্তির জীবন কোন গভীর জীবনবোধকে সৃষ্টি করে না। জীবনবোধ তৈরি হয় প্রচন্ড যন্ত্রণা থেকে… আকন্ঠ নিমজ্জন যে যন্ত্রণায়।

আমি হয়ত থাকবো না। এই লেখাগুলো রবে। এই লেখায় নেই বড় কিছু। এখানে আছে কিছু মৃত স্বপ্ন, কিছু হয়েও-হলো-না জীবনের অনুভূতি, আছে এক দাসের লেখনী যে জানে একদিন সে ফিরে যাবে সেখানে যার কাছ থেকে এই বিশাল পৃথিবীতে তার আগমন। আমার এই শব্দের গভীরেও যে শক্তি, সে কেবল তাঁরই দান। জানি, প্রবল ভারাক্রান্ত যে তার ভার অনুভব করতে পারে, সেটাও একান্তই মহান দয়াময়ের করুণা। এই বিষয়গুলো অনুধাবনে কম বক্তা এবং অধিক শ্রোতা হতে হয়। শুধু ভাষার অন্তর্ভুক্ত শব্দ শুনলেই হয় না, শুনতে হয় ভাষাহীন শব্দগুলোও। এই আকাশে, এই বাতাসে, এই শহরে-মফস্বলের মাঝে নিশ্চুপ চলার পথে অনেক কথা শোনা যায়। আমি কান পেতে শুনতে চেষ্টা করি… বিহবলতার সূচনা সেখানেই হয়ত!

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.