অসুপ্ত

এই ভরদুপুরে তপ্ত পিচঢালা পথ মাড়িয়ে ফিরে এসে কেন আমি লিখছি? আমার ভেতরে শব্দগুলো উথলে ওঠে যেন চুল্লীর ভেতরের তপ্ত তরলের উন্মত্ততা আচ্ছন্ন করেছে। আমি নিঃশব্দ বয়ে চলি। আমাকে ওরা কেউ বোঝে না, জানে না। আমাকে কেউ জানেনা, একটুও না। আমার শব্দ আর অনুভূতি ওরা বুঝতেও পারে না। সবার মাঝে থেকেও আমি নেই। একসময় হৃদয়ের চেপে রাখা আর্তনাদগুলোকে শব্দ দিতাম, লোকে তাও বিরক্ত হতো বলে শেষে লেখাই থামিয়ে দিয়েছি। আমি হতাশ হই প্রায়ই, তখন পাথরের মত বসে থাকি। অথবা দু’হাতের আঙ্গুলগুলো একে অপরের মাঝে প্রবেশ করিয়ে সময় ক্ষেপন করি। আঙ্গুলগুলো প্রবলভাবে অবাধ্য হতে চায় তবু আমি নির্বিকার হতে চাই।

কী হবে লিখে? অথবা, কীইবা হবে না লিখে? কিছুই হবে না। আমি তো জানি, এই শহরের অন্য সবার মতই আমিও একদিন টুপ করে চলে যাব। অনন্তের জগতে, অজানা জগতে। এই পৃথিবীর কোন বেঁচে থাকা প্রাণী বলতে পারে না সে জগতের কথা। আমি প্রায়ই নিঃশ্বাস নিই বড় করে, রেজার কথা মনে হয়, এসএসসির পরে চলে গেলো। অথবা ফাওজুলের কথা, চাচা-চাচীর সাথে যেদিন দেখা করলাম তখনো মনে হচ্ছিলো যে এখানে এই রুমে ও থাকতে পারত। আমি, রওশন, নোমান বসে আলাপ করছিলাম ওদের ঘরে। সেই-ই তো পথের শেষ। চলে যাব বলে যখন ভাবি, খারাপ লাগে, আমার ঔদ্ধত্য কাউকে কষ্ট দিলো কিনা। মনে হয়, কারো নামে ভুল কথা বলে ফেলেছি কিনা। আমি থাকব না, তখন তাদের হৃদয়ের ক্ষতগুলো আমি মুছে দিতে পারব না।

নইলে আমার এই বেঁচে থাকা, এই প্রতিদিনের নিঃশ্বাস আমার অনেকগুলো দীর্ঘশ্বাসের সমষ্টি। কেউ আমাকে তাচ্ছিল্য করে, কেউ আমাকে খোঁটা দেয়, শারীরিক যন্ত্রণাগুলো আমাকে কাবু করে ফেলে। আমি নির্বিকার বেঁচে থাকি। মাঝে মাঝে আমার জড়তা বড্ড বেশি হয়ে যায়। কেউ আমাকে ‘বাস্তববাদী’ হতে বলে, কেউ বলে কল্পনার ‘রোমান্টিকতা’ ফেলে বাস্তবে পা দিতে। অথচ, আমি একজন মানুষ যে শুধু অনুভব করি দৃষ্টি ছাড়িয়ে একটু বেশি। বাস্তববাদীদের বাস্তব চোখের চাইতে বড় বাস্তব দেখতে পাই। স্বাভাবিকতাকে রোমান্টিক হিসেবে যারা ভাবে তার চাইতে বেশি স্বাভাবিক আমি। আমিও বোধকরি ওপর থেকেই দেখি। আমি আমার এই চোখ নিয়ে বড্ড বিব্রত। কেনই বা এই অনুভূতি আর দৃষ্টি, কেনই এই অসহায় নিস্পৃহা। অথচ, অভাবগুলো কখনই কমে যায় না। আমি নিয়ত তাদের সাথেই যুদ্ধ করি। অনেকটা অন্যদিকে তাকিয়ে কাজ করার মতন। আমি আছি, আমি নেই। আমি না থাকার মতই।

কী হবে আমি যদি অন্য সবার মত না হই? কী হবে যেমন করেই হোক পেরিয়ে যাই এই একটি জীবন। কে সফল হয় বলো? স্টিভ জবস বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডের প্রবক্তা হয়েও কি ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে চলে গেলো না? চলে যাওয়াই সবচাইতে বড় বাস্তব। আমি তাকে ভুলতে পারিনা। আমি কখনই ভুলতে পারিনা এগুলো কিছুই আমার নয়। আমার এই শব্দগুলো হয়ত রয়ে যাবে যেদিন আমি থাকব না। কেউ হয়ত পড়বে আমার কথা, তখন আমি থাকব না। তারা জানবে, আমার হৃদয়ে অনুভূতি ছিলো, যেমনি তাদের আছে। আমি নেই, আমি বাস্তব পৃথিবীতে চলে গেছি। এই পথে যাবে সবাই। যেভাবেই থাকুক বেঁচে থাকার দিনগুলো, যাওয়া সুনিশ্চিত। যোগ্যতা বেশি ছিলনা আমার, তবু আমি বেঁচে ছিলাম। আমার ক্ষুদ্রতার ভারে আমি নুয়ে ছিলাম জীবনভর, তবু ছেড়ে দিইনি কিছু। স্রেফ একটু কম খেয়েছি, কম ভোগ করেছি, কম বলেছি। তবে অবাক লাগে, আমার ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে যতটা না আঘাত পেয়েছি, তার চাইতে বেশি পেয়েছি আমার ভিন্নতার কারণে।

লিখতে ইচ্ছা হয় না আর, ক্লান্ত লাগে। 
ক্লান্ত লাগে নগর জীবন।
ক্লান্ত লাগে এই তপ্ত দুপুর।

এটুকু লিখতেই কতগুলো কাজের ব্যস্ততা পার হতে হলো, তবু বুকের অবিন্যস্ত অনুভূতির বিন্যাস রয়েই গেলো বলেই হয়ত লেখাও হয়ে এলো। জানি, আমি লিখলেও কিছু হবেনা, না লিখলেও হবে না। ঝরে যাওয়া বৃষ্টির জলধারা, কলাপাতার উপরে পানির ফোঁটা, ভেজা কাক, ভেজা রাস্তায় ছুটে যাওয়া বৃষ্টিস্নাত শিশুর দৌড়ে চলা — এই দৃশ্যগুলো আমাকে আগের মত মুগ্ধ করে না। আমি কি মরে যাচ্ছি? আমি কি মরেই গেছি ইতোমধ্যে? মৃত আত্মাকে নিয়ে আমি আর ভাবিনা। আমি আর অপেক্ষার প্রহর গুণিনা। বেঁচে থাকাই আমার কাছে অদ্ভুত এক উত্তেজনা। এই নিঃশ্বাস, এই বাতাস, এই আলো, এই তপ্ত রোদ সবই আমার বেঁচে থাকার প্রাপ্তি। প্রাপ্তির আর কোন মাত্রা জানিনা, ইচ্ছেও হয়না। এতটুকুই বা পায় ক’জনা?

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s