নীল


তখন সন্ধ্যা নাকি বিকেল মনে নেই। আবছা আলো, স্মৃতির চাইতে বেশি ঘোর সঙ্গী। কোথাও কোন শব্দ হচ্ছিলো একটানা, যান্ত্রিক শব্দ। হুলুস্থূল চিৎকার, বেদনাহত মানুষের আহাজারি, রিকসার ক্রিং-ক্রিং বেলের শব্দ, একটা বাচ্চা ছেলের কন্ঠে মা-সংক্রান্ত খিস্তি, মোবাইলে বেজে যাওয়া অনবরত হিন্দি গান। বৃষ্টির শব্দও আছে, একটানা ঝরে যাওয়া। ঝরে যায় ক্রমাগত। এই পথের কোন ভবনের জানালায় কিশোরি পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে আছে আনমনে এমনই পথে। দোকানে জ্বলে উঠেছে এনার্জি সেভিং ল্যাম্প।

এমন অনেক মূহুর্ত থাকে প্রতিদিনই। মানুষের মনের দৃশ্যগুলো অন্যরকম হয়ত। ঝরে যায় বৃষ্টি, ঝরে যায় অনুভূতি, ঝরে যায় স্মৃতি। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় অনেক তীব্র অনুভূতিরাও জাঁকিয়ে ওঠে, মাটির সোঁদা গন্ধে হয়ত মস্তিষ্কের ভিতরে অনাহূত যন্ত্রণা জেগে ওঠে। চোখের সামনের দৃশ্য ঝাপসা হয়ে ওঠে, ম্লান হয় বোধ, নিঃশ্বাস গাঢ়…

onioto

হেঁটে যাওয়া এই পথ, ঝরে যাওয়া বৃষ্টি। হয়ত পথের শেষ আছে, হয়ত নেই। এই পথ ধরে হেঁটে গেলে ক্লান্তি থাকে হয়ত, হয়ত থাকে না। এই দৃশ্যগুলো হয়ত বিভ্রম, হয়ত না। মানুষে মানুষে আর জনে জনে বোধের জগতে নানান রঙের বিক্ষেপ। অনুভূতিদের হয়ত আলাদা তরঙ্গ আছে, তারা কেবল তাতেই সঞ্চারিত হয়। পাপাচারী আত্মার তরঙ্গ হয়ত প্রশান্ত হৃদয়ের তরঙ্গের চাইতে ভিন্ন। তাদের পথ আলাদা, তারা কেউ কাউকে স্পর্শও করে না। ভিন্ন দ্যোতনায়, ভিন্ন মাত্রায় সঞ্চারণ। বেঁচে থাকার অমোঘ বাস্তব কিছু নিঃসরণ।

বৃষ্টি ঝরে চলেছে গ্রামের মেঠোপথেও। লাল ইট বিছানো, খোয়ার স্তূপের পাশ দিয়ে ট্রাক চলা পথের ভেঙ্গে যাওয়া এই রাস্তা এঁকেবেঁকে যায় বিশাল ভিটে পার করে। রাস্তার পাশেই বড় বটগাছ, আজকাল দেখা যায় না। আগামীতে হয়ত থাকবে না। অনুভূতিরাও কি এভাবে হারায়? আবার, শতবর্ষী এইরকম বটের ছায়ায় হয়ত অনেক মানুষ নিয়েছে ছায়া, অনেক কিশোরের হাতের লাঠি আঘাত করেছে বৃদ্ধ বটের গায়ে। সে তবু আগের মতন আছে, অপরিবর্তিত। বয়স হয়েছে, ঠায় দাঁড়িয়ে সে দেখে গেছে মানুষের কাজ। কত মানুষও এমন বটের মত, দীর্ঘকাল দেখে চলে। চারপাশ বদলায়, তার মাঝেও পরিবর্তন আসে। শাখা-প্রশাখা মেলে ধরে বড় হয়। আয়ুষ্কাল কমতে থাকে বলে একসময় শক্তিও কমে যায়। বার্ধক্য গ্রাস করে ধরে।

কত কিছুই বদলে যায়। একই রকম সন্ধ্যা-রাতের আগমন ঘটেছে সৃষ্টির শুরু থেকেই। আলাদা কীসে প্রতিটি দিন, কোন মানুষের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়? কেমন করে সুখী হয় কেউ, দুখী হয়। বটের ধরে থাকা, আঁকড়ে রাখা মাটিতেই মিশে যায় গোটা গ্রামের একের পর এক মানুষ। জন্মে যাওয়া, দৌড়ে চলা, উদ্ধত যৌবন, ম্রীয়মান বার্ধ্যকের পরে মিশে যায় মাটিতে। এক অবিন্যস্ত আত্মার উড়ে চলা ইতস্তত তীব্র ধাক্কায় বয়ে চলা অশ্রুধারা, নীলাভ বেদনা, নীল নীল যন্ত্রণার নখর, প্রচেষ্টা আর ঘটনার অনির্বন্ধ পরিণতি। কিছু হয়, কিছু করে কেউ, কিছু অনড়, কিছু হয়ত অভিশপ্ত, কিছু হয়ত সুযোগ, কিছু বিরতিহীন যন্ত্রনার তুচ্ছার্থক ফল। সবই সময়ের, ফলাফল ভিন্ন। কোন মাপনযন্ত্রে মাপে কে? অসহায়ের চিতকারে কার কী আসে যায়?

নীলাভ্র পাহাড়ের চূড়া, শীতল সুউচ্চ পর্বতারোহণ, সুতীব্র ঝড়ো বাতাস, ছাইচাপা আর্তনাদ, পুড়ে যাওয়া তাঁবুর ধোঁয়া, অদৃশ্য অশরীরি আত্মার মরীচীকার মতন বয়ে চলা, নীল অনুভূতি, নীল আসক্তি, নীল অবগাহন, নীল পারমিতা, নীল অভিশাপ, নীলের বন্ধন, নীল চিৎকার, অবনীল, সুনীল, নীলিমার নীতিহীন অনুভূতির নখরাভিজান। অন্য কোন নীলের প্রবাহ জাগায় কি কোথাও অন্য কোন অন্তরে, নতুন কোন নীলাম্বরীর প্রাণে নীল বিষাক্ততা? কে জানে এই বেদনানীল কাব্যের কোন শেষ পংক্তি আছে কিনা, নাকি হঠাৎ এই শত-সহস্র শব্দ নিরর্থক আঁচড় হয়ে রবে, হয়ত কবির স্থান হবে অবাঞ্ছিত কাতারে, অচ্ছুৎ যন্ত্রণা!!

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

নীল-এ একটি মন্তব্য হয়েছে

  1. সুকুমার বলেছেন:

    বহুদিন পর আপনার পিকিউলিয়ার টাইপের লেখা পড়লাম। ভালো লাগলো পড়ে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s