অনির্বন্ধ

ocean
[photo courtesy : google image]

শেষ কবে অমন করে লিখেছি খেয়াল নেই। ভেবেছিলাম আর লিখব না। যখন দু’চার লাইন করে লিখতে ধরেছিলাম তখন অবশ্য ভেবে শুরু করিনি। একলা একা জীবন ছিলো, সেই জীবনের অব্যক্ত কথামালাকে জমিয়ে রাখতে আটপৌরে গোপন আয়োজন ছিলো ডায়েরিতে পাতা ভরে লেখা। এখনও সেইরকমই এক পুরোনো অনুভূতিই হচ্ছে। সময় পেরিয়েছে এক যুগেরও বেশি, জীবনটাও বদলেছে অনেক বেশি।

মাঝে মাঝে বড্ড চমকে যাই, প্রচন্ড থরথর করে কেঁপে ওঠার মতন অনুভূতি নিয়ে চমকে উঠি। আজ প্রায় দশ বছর হলো এসএসসি পরীক্ষার বৈতরনী পার হয়েছি। এতগুলো বছর!! সময়ের সাথে আরো কিছু ‘সার্টিফিকেট’ হয়ত এসেছে, চাকুরি করে ‘ইনকাম’ করি। তবু ভিতরটা কেমন যেন প্রচন্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। এক অদ্ভুত শূণ্যতা চারপাশে। দিনশেষে মা-বাবার কাছে ফিরে এসে কাছাকাছি বসে পার করি রাতের প্রথমভাগ। অনর্থক এলোমেলো কথা বলে তাদের কাছাকাছি থেকে অনুভব করতে চাই জীবনের আগমনের মাঝে অদৃশ্য যেসব অদ্ভুত স্বর্গীয় অনুরণন রয়েছে সেইগুলোকে।

শেষ কবে প্রচন্ড মুগ্ধ হয়েছিলাম তা ভুলে গেছি। আমার বড় ক্লান্ত লাগে। প্রচন্ড ক্লান্ত আমি এই শহরে, প্রচন্ড নিস্পৃহ। যেই মানুষগুলোকে খুব ভালো লাগত আমার কিশোর বয়সে, তারাও কেমন যেন ‘ছ্যাবলা’ হয়ে গেছে। সেই বিশেষত্ব, সেই মানসিক আত্মিক সৌন্দর্যে জ্বলজ্বলে করা মানুষ কেন আর খুঁজে পাইনা? আমার কি তবে চোখের অসুখ? এই দু’চোখই এক যুগ আগে মুগ্ধতায় চকচক করত, চোখে জল ঝরত নিজেকে অমন করে তৈরি করার প্রত্যয়ে। অথচ আমার চোখের অসাধারণ যেই ছেলেগুলোও টাকা-পয়সা-বাড়ি-গাড়ি-নতুন দামী ফোন-সুন্দরী গার্লফ্রেন্ড-ট্রিপ-নতুন অ্যালবাম আপলোড,পত্রিকায় নাম ছাপা….. এই চক্রে আটকে গেছে বলে মনে হয়। এইই সব? এইই? কিছু মানুষের জীবন আজ উইন্ডোজ/স্যামসাং/আইফোনে ছবি তুলে ফেসবুকে সেঁটে দেয়া আর কারো কারো নারীবিলাস দেখেও অবাক লাগে বড়। এই-ই কি তবে শেষ বিন্দু? এই মানবজন্ম কি তবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হয়ে শরীরের খায়েশে মিলিয়ে যাওয়া?

আমি অন্য কিছু খুঁজতে চেয়েছিলাম জীবনে। অন্য কোন অর্থ। হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে যেখানে আনন্দের স্রোত চারিদিকে উপচে পড়বে — এমন কোন কাজ। নিজের কদর্যতাকে ছাপিয়ে যেখানে সুন্দরকে লালন করার প্রয়াস আমাকে আচ্ছন্ন রাখবে। এই একটা মোহগ্রস্ততা আমাকে হারিয়ে নিলেও যেখানে হাসিমুখে মেনে নিব। এই মানবজন্ম আমার বড় অদ্ভুত লাগে। আমার সামনে বসত অপূর্ব, ধুম করে ছেলেটা সব ছেড়ে চলে গেলো। ঐ যে রেজা, সেও দশ বছর আগেই গিয়েছিলো। ওর মৃত্যুতে ওর কাছের মানুষগুলো কতখানি ফিল করেছিল জানিনা, আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। রেজা সেইবার ১২৪৭ জন জিপিএ-৫ পাওয়াদের একজন ছিলো। রেজাও একজন বাড়ি-গাড়ি-আইফোনওয়ালা সফল ছেলে হতে পারত। এখন রেজা ফেসবুকে নেই, সবাই তাকে ভুলে গেছে বলে সে অসফল? রেজা আলাহর কাছে গিয়ে হারিয়ে গেছে। আমি বেঁচে থেকেই হারিয়ে গেছি, আমার সর্বস্ব খুইয়েছি সীমাহীন নিস্পৃহতায়। আমিও বোধকরি সমস্ত সত্ত্বা নিয়ে ইতিহাসই হয়ে গেছি।

এমন জীবন আমি চাইনি কোনদিন যার শুরু এবং শেষটুকু কেন এবং কী উদ্দেশ্যে না বুঝেই পার করে দিব। আমি এই বৃষ্টিভেজা আকাশের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস টেনে ‘ভালোলাগা’ ভোগ করেই কাজে ডুব দিয়ে টাকা উপার্জনকেই জীবন করে মেনে নিতে পারিনা। এই পৃথিবী, এই বিশাল বিশ্বজগতের একটা অর্থ থাকতেই হবে। আমি সেই সুরময় ঝংকারের ঐকতানের একটা লয় হতে চেয়েছিলাম। মহান নিপুণ শিল্পী অপরূপ নিপুণতায় সাজিয়েছেন জগত, অথচ আমি কিছু দেখিনি। কেন? কেন আমি আজো নায়াগ্রা, অ্যাঞ্জেল দেখতে পাইনি। আমি অকল্যান্ডে যাইনি, বসফরাসের তীরেও কাটাইনি একবেলা, আমি আন্দালুসিয়ায়, সিডনি বা ক্যানবেরায়, ব্রাসিলিয়ায়, আন্দিজের চূড়ায়, হিমালয়ের পাদদেশেও যাইন, দেখিনি কাশ্মীর। এই বাংলার তীরে নদীর পারে বসেও সেই সৌন্দর্য আমাকেই ভাসিয়েছে, আমি পারিনি সুন্দরকে বুকে ধারণ করতে।

কেমন অদ্ভুত লাগে আমার! অনুভূতির জগতে নিজের হৃদয়কে পুকুর বানিয়ে তাতে হাত দিয়ে স্রোত বইয়ে দিতে ইচ্ছে করেনা। আমার বড় ইচ্ছে করে অনুভূতির সাগরের সাথে মিলে যাওয়া নদীর অংশ হতে — আমার অনুভূতি আর হৃদয়ের উত্তাল স্রোত গিয়ে মিলে যাবে সেই সুনীল সাগরে, সেই স্পর্শ আমার খেদ, ক্লেদ, ক্লান্তিকে মিটিয়ে দিবে। আমি জানি আমার অস্তিত্ব নশ্বর, আমি আর কতদিনই বা বাঁচব? সাতাশ পেরিয়ে গেলো। আশেপাশের সবাই অপমৃত্যুতে হারাচ্ছে। আমি যদি বাংলার এই মৃত্যুপুরীতে বেঁচেও থাকি তবু আর ক’দিনই থাকব? এই হাত-পা-চোখ এই আমার বুদ্ধি-চিন্তা-অনুভূতির মতন শক্তিগুলো নিয়ে ক’দিন দুনিয়া দাপিয়ে হারিয়ে যাওয়া আমার ইচ্ছা হয়না। এই ভাবনা আমায় পরাজিত করছে, করবেও হয়ত। তবে এই পরাজয়ও নশ্বর, অল্প ক’দিনের। আমি তো মিলিয়েই যাব।

এই শূণ্যমাঝে হঠাৎ একদিন এসেছিলাম, বড় হয়েছি, আমার শক্তি হয়েছে অনেক কিছু করার। আবার শীর্ণ জীর্ণ ক্লান্ত হয়ে মিলিয়েও যাব। এই আত্মা তো হারাবে না। এই আমার আত্মাকে আমি মিলিয়ে দিতে পারব না, তার উপরে আমার কোন অধিকার বা শক্তি নেই, শুধু ব্যবহার করা ছাড়া। আমার ফিরে যাওয়া নিঃসন্দেহ, কী নিয়ে যাব আমি? পৃথিবী আমায় টেনে-হেঁচড়ে ডাকে, আমি কোন শক্তি খাটিয়ে পারিনা। পৃথিবীর কাম-ক্রোধ-হিংসার ঝড়ে আমি কোথা থেকে কোথায় যাই বুঝে উঠতে পারিনা। যেখানেই যাক, এই ঝাপটাও ক্ষণস্থায়ী। আমার প্রাণ এখানে নেই, আমি দুই সত্ত্বার অবস্থান আলাদা।

আমার এই অনির্বন্ধ অপলাপ হয়ত কারো কাছে হাস্যকর বা বোকামি হিসেবে ঠেকতে পারে, তাদের প্রতি আমার করুণা। তাদের সেই অবস্থান আমি অনেক আগেই চিনেছি, নিজেকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে পেরিয়েছি আরো অনেক ক্রোশ পথ। অদৃশ্য কারাগারগুলো ঘিরে আছে আমাদের একের পর এক পরত দিয়ে, তার একেকটি ধাপ পেরিয়ে যেতে অনেক অন্তঃক্ষরণ, অনেক যন্ত্রণা, ত্যাগ, ধৈর্য প্রয়োজন হয়। দুর্বল আমি তবু সাহস করেছি পিঞ্জর ভাঙ্গার আর্তি বুকে নিয়ে পথ পরিক্রমায়…

আল মাহমুদের ‘আমি আর আসবো না বলে‘ কবিতাটির কয়েকটা চরণ হঠাৎ মনে পড়ে গেলো –

কেন এতো বুক দোলে? আমি আর আসবো না বলে?
যদিও কাঁপছে হাত তবু ঠিক অভ্যেসের বশে
লিখছি অসংখ্য নাম চেনাজানা
সমস্ত কিছুর।


আজ অতৃপ্তির পাশে বিদায়ের বিষণ্ণ রুমালে
কে তুলে অক্ষর কালো, ‘আসবো না’
সুখ, আমি আসবো না।
দুঃখ, আমি আসবো না।
প্রেম, হে কাম, হে কবিতা আমার
তোমরা কি মাইল পোস্ট না ফেরার পথের ওপর?

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in যাপিত জীবন. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s