একজন হুমায়ূন

কলেজ লাইফে পার্সোনাল ডায়েরিতে আমার পড়া বই তালিকা করতাম। হুমায়ূনের বই দেড়শ ছাড়িয়েছিলো সেই ক্লাস সেভেনেই, স্মৃতি হাতড়ে লেখা থেকেই। বইপোকা হয়ে বাল্য কৈশোরের অসাধারণ অনুভূতিমাখা সময় ছিলো, বেশিরভাগই কল্পনার জগতের, অনেক বেশি শক্তিশালী সেই জগত। জুলভার্ন পড়ে মাতাল হয়ে থাকা সময় ছিলো ক্লাস ফাইভ-সিক্সে।

ক্রমাগত বইতে ডুবে থাকা আসলে মনকে কীভাবে প্রসারিত করে তা ইদানিং অনুভব করি, তখন অনেক রকম পরিবেশে ঘুরে আসা হত কল্পনাতেই। সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, খুলনা, আটলান্টিক, নিউ মেক্সিকো, ব্রাজিল, দক্ষিন মেরু, উত্তর মেরু, আর্কটিক এভাবেই ভ্রমণ করেছিলাম একেক লেখকের চোখে। একটা দৃশ্য মনে হলো — কলেজের হাসপাতালের ওয়ার্ডের বেডে শুয়ে ‘হোয়াইট ফ্যাং’ আর ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ পড়েছিলাম মুগ্ধ চোখে। এসএসসি’র পর মূলত সুনীল-শীর্ষেন্দু-সমরেশদের বইতে ডুবে ছিলাম। এরপর তলস্তয়, ভিক্টর হুগোদের বই পড়া হয়েছে, হুমায়ূন আর পড়া হয়নি।

মাঝে ‘লিলুয়া বাতাস’ পড়ে লেখকের মানসিকতার অবনতিতে হতভম্ব আমি পরবর্তীতে কখনো কোন বই ছুঁয়েও দেখিনি। প্রশংসা শুনে গতকাল সজ্ঞানে খেয়াল করে প্রায় মনে হয় ১০ বছরের বেশি সময় পর সেই পুরোনো আনন্দে ‘বলপয়েন্ট’ পড়লাম। এই দীর্ঘ পাঠক জীবনে এই লেখককে আমি আমার সম্মানের উঁচু আসনে নিয়ে এলাম আরেকবার, স্বতঃস্ফূর্তভাবে, হয়ত পাকাপাকিভাবেও। প্রয়াত লেখক হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একদমই অন্যরকম। এই মাটিতে এরকম অকপট, সরল, অদ্ভুত সাবলীল ভাষাশৈলীর লেখক আবার কবে আসবে আল্লাহই ভালো জানেন। আমি ব্যক্তিজীবনে তার কাছে কতটা ঋণী তা পড়তে পড়তে টের পাচ্ছিলাম, খেয়াল হচ্ছিলো মে ফ্লাওয়ার, আমাদের শাদা বাড়ি, তোমাদের এই নগরে, বহুব্রীহি, অপেক্ষা বইগুলোর কথা। কী অদ্ভুত সুন্দর ছিলো তার লেখা বইগুলোর পাতা উলটে সময় কাটানো হাইস্কুল বেলা!!

হুমায়ূন আহমেদ কৃতজ্ঞতা প্রকাশে অকপট মানুষ ছিলেন। তিনি চলে গেছেন অনন্তের জীবনে। এই মানুষটা আমার মতন আরো অজস্র কিশোর-তরুণকে যেই সময়গুলো দিয়েছেন, ইট-কাঠ-ধুলোবালি-রক্তাক্ত ছবিমাখা প্রচ্ছদের পত্রিকার শহরে ও সময়ে কিছু নির্মল আনন্দ দিয়েছিলেন লেখকটি। তার লেখায় অনেক কবি আর কবিতার নাম শিখেছিলাম, চিন্তা করার অনেক উপকরণ পেয়েছিলাম। তিনি ছোট ছোট অনুভূতিগুলোকে শৈল্পিকভাবে তুলে ধরে আটপৌরে বিষয়কেও নান্দনিক করে তুলে ধরেছেন। সত্যিই জানিনা এতটা অসাধারণ লেখক আর আসবে কিনা এই সময়ে এই দেশে।

মনে আছে, বিমল মিত্রের কড়ি দিয়ে কিনলাম পড়তে গিয়ে সেখানকার অনুভূতিগুলোর গভীরতা আমার কাছে হুমায়ূন আহমেদের লেখার মতন লেগেছিলো। দুই সময়ের লেখক দু’জনকে অনেক হিসেবেই অনেক আলাদা করা যাবে, কিন্তু পাঠক আমার অনুভূতি আর ভালোলাগার জগতটাতে দু’জনে ছিলেন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অসাধারণ।

রসায়নে ডক্টরেট করা এই মেধাবী মানুষটা আর এই পৃথিবীর মাটিতে নিঃশ্বাস নিবেন না, জানি আমিও তার মতন করেই চলে যাব অনিঃশেষ সময়ের জগতে। কিন্তু আমার এই কথাগুলো সেই মানুষটার প্রতি উৎসর্গ করছি যিনি আমার পাঠকসত্ত্বাকে জাগিয়েছিলেন মুগ্ধতায়, সেই সাত বছর বয়স থেকে এই সাতাশ অবধি। দয়াময়ের দয়া বর্ষিত হোক এই মানুষটির প্রতি…

# আমার পড়া হুমায়ূন তালিকা

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

একজন হুমায়ূন-এ একটি মন্তব্য হয়েছে

  1. Nure Alam Masud (@nure_alam) বলেছেন:

    আমি হুমায়ুন আহমেদের খুব কম লেখা পড়েছি। তরুণ ছেলেপেলেকে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট কাজ করেছিলো সে। শুরুরদিকের ভালো কিছু লেখা ছাড়া বাকিটা সে বাজারি কাজ-ই করেছে।
    তবে তার লেখা বেশ সাবলীল : গোটা একটা বই পড়ে ফেললেও মনে হয়না যে কিছু পড়েছি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s