গাংচিল


ছবি কৃতজ্ঞতাঃ গুগল।

আমার গাংচিল নিয়ে কোন তথ্য লেখার সম্ভাবনা নেই, নেই কোন সাহিত্য লেখারও সম্ভাবনা। তবে, এই শিরোনামটা আগেই ভেবে রেখেছিলাম। যখন গতকাল সেই একশ ফুট উঁচু থেকে জানালার পাশে ডানা মেলে নিরন্তর উড়ে যাওয়া চিলটাকে দেখছিলাম। বহুমুখী চাপের মাঝে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বিশাল মাঠের ওপর আপন কক্ষপথে ঘুরতে থাকা চিলটার দিকে তাকিয়ে হালকা হচ্ছিলাম নিজের অজান্তেই। কখন যেন নিজেকে চিলের মাঝে স্থানান্তর করে দিলাম, টেরই পাইনি। ওর চোখ দিয়ে আকাশে উড়ে দেখছিলাম মানুষগুলোকে — ছটফটে, কুৎসিত, উদাস, বিষাদক্লিষ্ট, আনন্দিত, স্বপ্নবাজ, বেদনাহত। এরকম আরো নানা রকম মানুষ।

সেই চিল ফেলে গাংচিল কেন মনে এলো তার কারণটাও বোধকরি বলতে পারবো। কারণ, আমি যেদিন কয়েক বছর আগে দারুচিনি দ্বীপে যাচ্ছিলাম দলবলসহ — সেদিন সমুদ্রে আমাদের জাহাজখানির পেছনে অমন গাংচিলেরা উড়ছিলো। ডানা মেলে যেন একটা প্রতিযোগিতা। আমি সবকিছু ভুলে অন্তহীন সমুদ্র আর গাংচিলের ওড়াওড়িতে হারিয়ে গিয়েছিলাম।

আমি মাঝে মাঝেই হারিয়ে যাই। সেই ছেলেবেলা থেকেই। হারিয়ে মিশে যাই একদম। আমার অনুভূতিরা আগে থেকেই হয়ত জানত, আমি অমন হবো। তাইতো, ঘোর অন্ধকার আর যন্ত্রণাতেও হারিয়ে যাবার একটা অদ্ভূতুড়ে ক্ষমতা আমাকে হালকা হতে সাহায্য করে। বেঁচে রব যতদিন — ততদিন এমনি করে অনেক সৌভাগ্যের স্পর্শ আমায় সাহায্য করবে হয়ত। এই চিল হয়ে ভেসে গিয়ে বুকে জমে থাকা ক্লেদমুক্তি হয় যদি ক্ষণিকের জন্য — ক্ষতি কী তাতে?

গাংচিলের কথা আমার অনেক মনে হত ছোটবেলা থেকেই। সে-ই দূর আকাশ দিয়ে উড়ে বেড়ায় অনবরত পাখা দু’টো মেলে। ওইটাতেই আমার হিংসে হয় — ঐ পাখা দু’টোতে। ইচ্ছে হলেই চলে গেলো দূরে, আরো দূরে… হয়ত পাশের সঙ্গীটির সাথে অভিমান করে মিলিয়েই গেলো সীমানা পেরিয়ে।

আকাশের নীলে, হৃদয়ের তুলিতে, তোমায় এঁকে যাই, নীল বেদনায়…

গানের লাইনটা কেন যেন মনে পড়লো হঠাৎ। হৃদয়ের তুলির কথা আছে, যেই তুলির এলোমেলো আঁচড়ে কাউকে এঁকে নেয়া যায়। আর সেই নীল বেদনা দিয়ে এঁকে নেয়াটা হয়ত গানেই হয়। আমিতো দেখেছি বাস্তবের বেদনারা নীল না, কালো। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ। বাস্তবের পৃথিবীতে হৃদয়ের তুলি থাকে, রঙ থাকে থাকে বাস্তবতার গরল মেশানো কালি — তাতে থাকে অবিশ্বাস, ঘৃণা, অস্থিরতা, অশান্তি মেশানো। যেমনি আঁচড় পড়বে, কেবলই কালো রঙের পরত পড়তে থাকে মনের ক্যানভাসে… সে কি কোন ছবি হলো? হলো কোন এঁকে যাওয়া ছবি?

আমি এই অন্ধকারের পৃথিবীর গভীরে ডুব দিয়ে উঠে আর ভিতরে যেতে চাইনা। তাই উপরের গাংচিলের কথা মনে হয়। ওদের মন নেই। যতক্ষণ উড়ে যায়, পরম সুনিপুণ শিল্পীর রঙ্গে গড়া পৃথিবীর সৌন্দর্যে আকুতিভরা অনুভবে ওরা স্রষ্টার গুণগান করতে থাকে। সে কতনা সুন্দর জীবন। আমার এই ক্লেদ, এই অপরাধ, এই পাপাসক্ত পাপী আত্মার হিসেব যদি না হত! যদি আমি অমন গাংচিল হয়ে উড়ে যেতে পারতাম আসমুদ্রহিমাচল!

মাঝে মাঝে যেন মনে হয় আর কিছুই চাইনা আমি, শুধু একটু ক্ষমা। এই প্রবল কুরুচিভরা সমাজের কীট হয়ে বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়না। গাংচিল হয়ে নীলের মাঝে ভেসে যাওয়ার আর্তিকে বুকে লালন করি বলেই হয়ত আমার সেদিন সেই চিলকে উড়তে দেখে ক’মিনিটেই হারিয়ে গিয়েছিলাম তার মাঝে। জানিনা আমি, কিছুই জানিনা। শুধু ইচ্ছে হয় যদি পেতাম একটুকু মুক্তি! হারিয়ে যেতে পারলেই যেন সেই মুক্তি হতো আমার, এই জগতে থেকে মিলিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া, অনন্তে হারাবার আগেই…

Advertisements

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s