সময়ের ভাবনা – ২


২২ জুন, ২০১২
মৃত্যু সংবাদকে আমি সহজভাবে নিতে পারিনা। বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিন প্রচুর মৃত্যু সংবাদ পত্রিকায় দেখে নির্বিকার অনুভূতিশুণ্য হয়ে গেলেও আমি দিনে অন্তত একবার হলেও স্তব্ধ হই। নিজেকে ওই মৃত মানুষটার জায়গায় কল্পনা করে নিলে খুব অসহায় লাগে। সফল, বিফল, গরীব, ধনী — মরে গেলে একরকম করেই নিউজ হয়, কারো জন্য হয়ত আহাজারি বেশি করা হয়, কারো কম। এই অদ্ভূত শূণ্য অনুভূতিটাকে নিয়ে আগাতে পারিনা।

আজকে আমার শতাধিক ফৌজি বন্ধুর কোর্সমেট ক্যাপ্টেন কামরুলের মৃত্যু সংবাদ পেলাম। উত্তরা জসীমউদদীন সরণীতে বাইকে চড়ে যাবার সময় সামনে বাস এবং পিছনে কারের যুগপৎ ধাক্কায় পিষ্ট হবার পর বাসের নিচ থেকে জ্যাক স্ক্রু দিয়ে বের করার পর তাকে সিএমএইচে নেয়ার আগেই সে চলে গিয়েছে এই পৃথিবী ছেড়ে।

জীবনের শেষটা অনির্দিষ্ট, কিন্তু নির্ধারিত। হয়ত কখনো অযৌক্তিকও। কিন্তু যেভাবেই জীবনটা আসলেই অনেক ছোট। এই জীবনের রুদ্ধশ্বাস ইঁদুর দৌড়ের ক্লান্তিও আচ্ছন্ন করে মাঝে মাঝে। আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, জীবনটা অর্থহীন না হোক তাঁর কাছে… 😦

ইদানিং জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে, মানুষ আসলে তার লাইফস্টাইল নিজেই নিজেরটা তৈরি করে। জীবনের প্রশান্তি-অশান্তি, পেরেশানি-স্বস্তি, জটিলতা-সরলতা আসলে ইচ্ছা ধরেই অর্জিত হয়। সবাই গাড়ি চাই, বাড়ি চাই, অন্তরের শান্তি চাইনা। অর্থ চাই, কিন্তু কম অর্থে অধিক কল্যাণ চাইনা। বাহিরের ফুটানি স্মার্টনেসের দাম চরিত্রের চাইতেও বেশি। দু’জনের চকচকে ছবিওয়ালা সম্পর্ক যতটা চাই, কিন্তু সম্পর্কের ভিতরের সৌহার্দ্য ও গভীরতায় অতটা মন নেই…

আজকাল পথে-ঘাটে অচেনা মানুষকে বিশ্বাস করার জন্য যথেষ্ট বিশ্বাসের সংকট সৃষ্টিটা কারো একলা তৈরি করা না, বরং সেটা এই পুরো জাতিগোষ্ঠির সামগ্রিক চাওয়ার প্রতিফলন। যাদের সাথেই গল্প হয় ব্যক্তিগত মহল ও কর্মক্ষেত্রে — সবারই গল্পে নিজের সন্তান, ভাই-বোন, গাড়ি, ফ্ল্যাট, নিজের ভার্সিটি-কলেজ-জেলা নিয়ে এত বেশি অহংকারযুক্ত কথা আর ভড়ং অনুভব করা যায় যে সেই ব্যাপারটা ওই লোক/মহিলারা ছাড়া উপস্থিত সবাই টের পায়। তখন ভাবের কথার প্রতিযোগিতাও চলতে থাকে, আরো অনেকে যোগ দেন এটা প্রমাণ করতে যে তাদেরও অনেক আছে!!

মানুষ মুখের ফুলঝুরির সমান শান্তি অন্তরে যদি অনুভব করতো, আমার বিশ্বাস বিশাল বহরের অন্তঃসারশূণ্য এই কথার পরিমাণ সবার নিদেনপক্ষে অর্ধেক কমে যেত। অন্যকে দেখিয়ে অন্যের কাছে বড় হওয়ার চাইতে পারিবারিক/ব্যক্তিগত শান্তিটা যদি বড় হতো, হৃদয়ের চাওয়া হতো — তাহলেও হয়ত মানবীয় গুণাবলী কমে যাওয়া থেকে উদ্ভুত এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিগুলো থেকে বাঁচার আশা খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন যেন সামষ্টিক সামাজিক বোধগুলো সবই তীব্র গতিতে নিম্নমুখী… স্রষ্টাকে সরিয়ে দিয়ে তৈরি করা আমাদের জীবন সমীকরণে সব মিললেও জীবনে নিস্তরঙ্গ সুখ আর অন্তরের প্রশান্তি আর মিলেনা!

জীবনের একটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা আমার কিছু “কমজানা” শিক্ষককে দিয়ে শুরু হয়েছিলো। তারা নিজ বিষয়াদির গভীরের ব্যাপার স্যাপার কম জানতেন, তাই উরাধুরা চোটপাট করে দৌড়ের উপরে রাখার চেষ্টা করতেন। তাদের সবচাইতে চোখের বিষ ছিলো সেইসব ছেলে — যারা উক্ত বিষয়ে সাধারণের চাইতে বেশি জ্ঞান রাখতো।

এরপর আরো দেখেছি, যেইসব ছেলে ছোট খাটো অপরাধ করে, অপরাধী থাকতো নিজের বিবেকের কাছে, আবার অনেক মজার কারণে সেসব ছাড়তেও পারতো না — অন্তত সেইসব বিষয়ের আলোচনায় তাদের কন্ঠস্বর থাকতো সবচাইতে উপরে। আতংকে হোক, বিরক্তির কারণে হোক — অন্য কেউ তেমন একটা বিরোধিতাতে যেতো না সেইসব বিষয়ে…

অনুধাবনঃ যাদের অপরাধবোধ রাতের আঁধারে হলেও বিবেককে দংশন করে, সমাজের বেশিরভাগ রাগী লোক হয় তাদের মধ্য থেকেই। তারা কথা বলার সময় “ডোমিনেটিং” হয়/হবার চেষ্টা করে, বেশি কথা বলার ফলে তারা অসংলগ্ন কথাও বেশি বলে।

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in যাপিত জীবন. Bookmark the permalink.

সময়ের ভাবনা – ২-এ একটি মন্তব্য হয়েছে

  1. tusin বলেছেন:

    সড়ক দুঘটনার কথা শুনলে আচমক কেমন যেন লাগে😦 জীবনের মূল্যটা যেন একটা বাসে ধাক্কায় শেষ হয়ে যায়। :(:(
    আপনার বন্ধুটি কথা শুনে খারাপ লাগল। আল্লাহ যেন উনাকে বেহেস্ত নসীব করে এই কামনা করি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s