ঘোরলাগা পলকে


ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের বিন হায়দার নাভিল, বন্ধুবরেষু


গতকাল অফিসে যাবার সময় বাসে উঠে একটা সিট পেলাম — জানালার পাশে। বিশাল জানালায় কোন কাঁচ নেই, হয়ত তা লাগানোর কোন সম্ভাবনাও নেই। কনুইটা জানালার নিচটায় ঠেস দিয়ে গালে হাত দিয়ে বাইরের প্রবল ব্যস্ত মানুষদের চলাফেরা দেখছিলাম। এই কাজটা আমি প্রায়ই করি। বাসের জানালায় না হলেও মাঝে মাঝে চুপ করে মানুষদের দেখি। একদিন ব্যস্ত ঢাকার মতিঝিলে আমি ফুটপাথে অনেকক্ষণ যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে। মানুষের এই গতির মাঝে আমার স্থিতিটাকে আমার অদ্ভুতরকম কষ্টকর লাগে।

আমার স্মৃতিতে কিছু জিনিস এত বেশি গভীরে দাগ কেটে গেছে যে তা বোধহয় কখনই মুছে যাবে না। আন্ডারগ্র্যাডের ফার্স্ট ইয়ারে কিছু ক্লাস, ল্যাব শুধুমাত্র শিক্ষক হবার অযোগ্য ক’জন অমানুষের খপ্পরে পড়ে বিভীষিকাতে রূপ নিতো — তাদের বিশ্রি আচরণগুলোতে শ্রান্ত-ক্লান্ত হতে হতে আত্মার শক্তি ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিলো। তখন আমার পাশের রুমে শোভন লিংকিন পার্ক এর কিছু গান শুনতো মাঝে মাঝেই একটানা। নাম হলো NUMB. গানের ভিডিও দেখতাম, সেখানে গানের মূল চরিত্র মেয়েটার চোখে পৃথিবীটাকে যেভাবে দেখাতো — সেই দেখার মাঝে আমি যেন বছর শেষে আমার অনুভূতিটাকে পৃথিবীর প্রথম কোথাও প্রতিবিম্বিত হতে দেখলাম। জীবনে আর যতবারই এই গানটা শুনতে ক্লিক করেছিলাম, তা কেবল নিজের উপচে পড়া অসহায়ত্বটাকে অন্য কোন চোখে দেখে হালকা হবার একটা অভিপ্রায় থেকেই। অবশ্য বোকা আমি তখনো আমার অন্তরতম জনের সেই কথাটি জানতাম না “Surely in remembrance of Allah do hearts find rest” [Al Quran-13:28]

Numb হয়ে চারপাশ দেখার সেই অনুভূতিটাকে সেই থেকে আর আমার পিছু ছাড়েনি। প্রবল ব্যস্ত নগরীতেও আমি মাঝে মাঝেই কেমন যেন ঘোরাক্রান্ত হয়ে যাই। কাল যখন সকালে বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম, বাইরে বাসের অপেক্ষায় থাকা মানুষদের দেখছিলাম — কেউ বিরক্ত, কেউ নির্বিকার, কেউ কথা বলছে, কেউ ক্ষেপে আছে, কেউ অস্থির… আর আমি বিমূঢ়। এই বিমূঢ় অনুভূতিকে নিয়ে সেই মানুষদের দিকে দেখতে দেখতে মনে হলো আমি সাদাকালো নগরীতে চলে এলাম — তাতে সবকিছু সাদাকালো। অন্যসবকিছুই হয়ত এখানে আছে, আমি কেবল সশরীরে নেই এখানে। তবু আমি দেখতে পাচ্ছি ভ্রমের মাঝে।

তখনি চোখের সামনে ‘৯৯ সালের জুন মাসের দৃশ্য ভেসে এলো — কনক স্টাফ প্রচন্ড চিৎকার করে টাচ এন্ড ব্যাক করতে বললেন, সবাই ছুটছে দেখে আমিও ছুটলাম ওদের পেছন পেছন। আমি অনেক চেষ্টা করি তবু যেন পা নড়েনা। সবাই টাচ করে ফিরে চলে এলো — আমি ডানে-বামে চেয়ে দেখি আমি একা। অল্প ক’হাত সামনে মিজান আর মুশফিক। কখনো কখনো কেউই থাকতো না। প্রতিবারে ৫/১০ জনকে রেখে বাকিদের আবার টাচ করে ফিরতে হতো দূরের ১-২ কিলোমিটার দুরত্বের দেয়াল অথবা কোন গোলবার। আমি দৌড়াতাম প্রাণপণে তবু একদম শেষেই থাকতাম। অনেকবার মনে হয়েছিলো আমি যদি নিজেকে কোনভাবে এই মাঠ থেকে ইনভিজিবল করে ফেলতে পারতাম! এসব মনে আসতে আসতেই মুসলেহর সাথে ১২ নাম্বার রুমে কথোপকথনের একটা দৃশ্য ভেসে এলো চোখে। তারপর ক্যাম্পাসে মোমিন ভাইয়ের চায়ের দোকানের বেঞ্চে ইরতেজা, সিয়াম, শাওন আর মেসবাহর সাথে একটা দৃশ্য, হলের বারান্দার দেয়ালে হেলান দিয়ে সৃজন, রিজেল, নাফী আর আমার আড্ডার একটা দৃশ্য। সবশেষে ক’দিন আগে খুব কাছের বন্ধু আলী আর তার নবপরিণীতা স্ত্রীর পাশাপাশি হাসিমুখে বসে থাকা দৃশ্যটা ভেসে এলো চোখে… অনেকটা স্লাইড-শোর মতন একটানা দৃশ্যগুলো শেষ হয়ে গেলো। তিক্ত-মিষ্ট সব মূহুর্ত মিলে এই বিমূঢ়তার শেষটায় এসে মনে হলো জীবনে একটা বিশাল সময় পেরিয়ে এসেছি। বন্ধুরা কেউ কেউ ৫ বছরের বিবাহিত জীবন পেরিয়ে গেলো। জীবনের অনেকটা পথই তো পেরিয়ে এলাম!

আব্বু-আম্মুর কথা মনে হলো। তারা দু’জন মিলে একসাথে এমনই একটা যাত্রা শুরু করেছিলেন। পৃথিবীর বুকে আমাদের ভাইবোনদের জীবনে যারা শুধুই একপেশে পরিশ্রমে বিলিয়ে দিয়েছেন — আমাদের জীবনের সর্বোচ্চ আয়েশটুকু নিশ্চিত করতে। আমি উনাদের মুখপানে চেয়ে টের পাই — এত অক্লান্ত ভালোবাসা কি আদৌ আমার দেয়ার যোগ্যতা আছে পরের প্রজন্মকে? তাদের আত্মীয়দের প্রতি কী অপার শ্রদ্ধা আর অনুভূতি, আমার নিজের এখনই কি ভাইবোনদের প্রতি আছে অমন শ্রদ্ধা-বিনয়-স্নেহময় ভালোবাসা? হঠাৎ নিজেকে অযোগ্য-ব্যর্থ মনে হতে থাকায় দীর্ঘ ঘোরলাগা চিন্তায় ছেদ পড়ে।

আজ শেষরাতে ঘুম ভেঙ্গে যাবে জানতাম না। এমনটা আমার হয়না সাধারণত। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অপার রাহমাতে আমি সুন্দর একটা নিশ্ছেদ ঘুমে রাত পার করে দিতে পারি। এমন করে অনেক সুযোগ আর দয়াই পাচ্ছি জীবনে। রাতে ভয় নিয়ে, দুশ্চিন্তা নিয়ে পার হওয়া রাতগুলোর কথা চিন্তা করলেই হাত-পা জমে যায়। আল্লাহর কাছে তো শুধু এই সুন্দর ঘুমের রাতটুকুর নিআমাতের কথা ভেবে আর এমনটি অন্তত চেয়েই তো আমার আজীবন কৃতজ্ঞ আর প্রার্থনারত থাকা উচিত। আমি মাঝে মাঝেই টের পাই আমি কত ভীষণ অকৃতজ্ঞের মতন করে চিন্তা করি। আল্লাহর কাছে আমার ক্ষুদ্রতা আর অকৃতজ্ঞতার জন্য ক্ষমা চাই, পথের দিশা চাই যেন আমি আরো অনেক কৃতজ্ঞ বান্দা হতে পারি।

ক’দিন ধরে ভাবছিলাম আমার একটা অদ্ভূত অস্বস্তি কাজ করছে নিজেকে নিয়ে। কেন অনেক আনন্দে আমি সহজেই ডুবে যেতে পারিনা অন্য অনেকের মতন করে। আসলে আমি নিজেকে ছোটবেলা থেকেই এই জীবনের পরপরই আরেকটা যে জগত, সেটার কথা মনে রাখতে চেষ্টা করতাম। প্রিয় বলে যাদের বুঝেছি, তারা সবাই ছিলেন এই জগতে খুব সাধারণ আর আগামীর পৃথিবীতে নিশ্চিত সফল। তাদের কাজগুলো সব দুই জগতের জন্য হতো। এই প্র্যাকটিস করতে করতে আমার মাঝে বোধহয় গেঁথে গেছে ব্যাপারটা। কিন্তু যখন আমি একদৃষ্টিতে এই জীবনের শেষ আর অনন্তের শুরু কথা ভাবি — তখন অনেক ক্ষুদ্র লাফ-ধাপ-ঝাঁপ আমার কাছে অনাকর্ষণীয় অর্থহীন লাগে। ব্যাপারটার মাঝে ইচ্হাপ্রসূত কোন জটিল চিন্তা/অভিপ্রায় নেই, স্রেফ এই লম্বা ভ্রমণে বের হওয়া আমার ঝোলায় যে একদম কিছুই নেই, এই কষ্টটা প্রচন্ড পীড়া দেয়। আবার আমি সহসাই নিজেকে কিছু সংগ্রহে ডুবিয়ে দিতে পারছি/পারবো এমন সম্ভাবনাও দেখছি না।

আমি শুধু একটা ভাবনাতেই ঘুরে ফিরে আসি। এই জীবনটা অনেক বেশি ক্ষুদ্র। আমার জীবনে সময়-অসময়ে আসা কোন মানুষের প্রতিই আমার ক্ষোভ নেই, বরং অপরাধবোধ আছে। ইচ্ছে করলেই অনেককে অনেক বেশি করে স্বস্তি-আনন্দ-ভালোবাসা দিতে পারতাম — বয়স আর বোধের স্বল্পতায় হয়নি সেটা। তবু অনেক আগে থেকেই জীবনে চেয়েছিলাম, আমি পারলে মানুষের উপকার করবো তবু অপকার করবো না। এই হাসিমাখা মুখটাও হলো সাদাকাহ। পরোপকারের এই সাদাকাহ যতটা করা সম্ভব, এই পৃথিবীকে আমি একটা মানুষ হয়ত আগের চাইতে ভালো কিছু দিতে পারলাম।

মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, ধারণারা সতত বদলায়। আমার এই বিশ্বাস-জীবনদর্শন বদলে আজ যেখানে এসেছে, ক্রমশঃ বদলে যেতে থাকবে হয়ত আগামীতেও। শেষটা যেন কোন ধ্বংসের দিকে, কোন অভিশপ্ততার পথে না যায় — সেই প্রার্থনা তো প্রতিদিন অজস্রবার করিঃ “গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম… “। আমি কেবল ওই পরম আরাধ্য মুক্তিটাই চাই, অনন্তের মুক্তি…

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

ঘোরলাগা পলকে-এ 3টি মন্তব্য হয়েছে

  1. nusratrahman বলেছেন:

    tarporeo to Allahr deya shob blessing babohar kore amader egote hobe. amra khudro hote pari, kintu creation er moddhe amra shera. manush na hoye jodi nijeke gachh pathor er porjaye namiye ani, tahole ononter poth tao ki khub shundor hobe?

  2. যাযাবর বলেছেন:

    আমার একটা কথা শুনতে শুনতে তুমি মনে হয় বিরক্তই হয়ে গেছো, তাও আবারো বলছি- তোমার মধ্যে একধরনের বিষন্নতা আছে, যেটা পারমানেন্টলি তোমার সাবকনশান্স মাইন্ডে গেড়ে বসে থাকে সবসময়। তোমার লেখা পড়লেই সেটা টের পাওয়া যায়। খুব আনন্দের মধ্যেও তুমি তাই ঘুরে ফিরে বিষন্নতাটাকে খুঁজে বের করো।
    অনেক ছোটবেলায়, যখন ক্লাস সিক্স কী সেভেনে পড়ি, তখন আমার একটা গল্প পড়ে কবি আল মাহমুদ একটা কথা বলেছিলেন “এখন থেকে চারপাশকে এমন দুঃখ নিয়ে দেখলে তোমার নিজের জীবনটাই সারাজীবন দুঃখী হয়ে থাকবে”; কথাটা আমার মনে এমনভাবে গেঁথে গেছে, এখনো ভুলিনি। কবি আল মাহমুদ খুব সম্ভব তোমার এই ব্লগ পড়লে সেইম কথাই বলতেন! হিহিহি🙂
    (জানালার ছবিটা অসাধারণ! এইরকম জানালার পাশে বসে মনে হয় যেনো সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায়…)

  3. আসলেই! জীবনটা খুব ক্ষুদ্র!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s