বর্ষণ

দু’দিন ধরে বর্ষণে সিক্ত এই নগরী। সারামাসের কাঠফাঁটা রৌদ্রের পর চৈত্রের শেষ সপ্তাহের ঝরঝর বর্ষায় সবাই বুঝি খুব আপ্লুত। ফেসবুকে দিনশেষ লগইন করে অর্ধশত বৃষ্টিময় আবেগের সঞ্চারণ আমাকে স্পর্শ করলো। সারাদিন কাঁচেঘেরা কৃত্রিম আলোতে বন্দী থেকে আমার বৃষ্টিকে চেনা হয়না। দিনশেষে হালকা ভিজেই বাড়ি ফিরলাম, তবু বৃষ্টিকে একটু উৎপাত বলেই মনে হলো যেন। রিকসা পাওয়া যায়না, হাঁটার রাস্তাটুকুতে এখানে-সেখানে নোংরা পানি জমে আছে, বাসায় ফিরে ভেজা কাপড় ধুতে হবে, সেই কাপড় ইস্ত্রি করতে হবে আবার অফিসে যাবার জন্য — এত চিন্তা এলে আবেগাপ্লুত হওয়া যায়না।

আমিও হইনি। শুধু খানিকক্ষণ আগে অনেক জোরে যখন মেঘের গর্জন শুনলাম, তখন আরেকবার মনে হলো আমার — একসময় এই মেঘ আমাকে নাড়া দিয়ে যেত প্রচন্ড। আমি অস্থির হয়ে যেতাম চঞ্চলতায়। সময় বয়ে চলেছে ক্রমশ… ইট-কাঠ-পাথরের এই শহুরে জীবনে আমার হৃদয়টাও বদলে চলেছে ক্রমাগত। পদ্মার পাড়ে আর ভৈরবের পাড়ে কেটেছে জীবনের দশটি বছর — মনটা তখনো নদীর পাড়ের কাদামাটির মতই পিচ্ছিল ছিলো। একদিন দুপুরে একটা ঘন্টা কুয়েটের বড় মাঠে শুয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে বৃষ্টিতে ভেজা আজ কেবলই গল্পের আনাগোনা। আমি অমন করে কেন বলছি? আমি জানি কেন বলছি। আমি ঘরে বসে যখন বাইরের বৃষ্টির শব্দ শুনছি — আমার মনে ইচ্ছেও হচ্ছেনা বাইরে গিয়ে ভিজতে। আগে হতো, অনেক হতো। আর হতো বলেই সুযোগ পেলেই ভিজে নিতাম। তিন বছর হলো, ডাক্তার ঠান্ডা থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। সতর্কতার সর্বোচ্চটা দিয়েও গত সপ্তাহজুড়ে গলাব্যথায় কাতর হয়েছিলাম। যদিও বরাবরের তুলনায় অল্পতেই কেটে গিয়েছিলো এবার এই কষ্ট আলহামদুলিল্লাহ… শারীরিক সুস্থতা হারিয়ে যাওয়ার পর থেকেই রোমাঞ্চ আতঙ্কে বদলে গেছে আমার…

তবুও এমন আকাঙ্খিত বর্ষাধারাতে আমার মন হয়ত চঞ্চল হওয়া দরকার ছিলো। আমি কোনদিন ভাবিনি আমার মন এখনকার মতন হবে। বর্ষার সাথে আমার মিল হলো আকাশ যখন কেঁদে যায়, সেই ক্রন্দনে আমার চোখেরাও মিলেমিশে একাকার হয়। জীবনে জীবনে মানুষের অনুভূতি, উপলব্ধি আর অভিজ্ঞতার কতই না ব্যবধান, তাইনা? শুধু একটা অনুভূতির জগতেই কত অযুত-নিযুত ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়েছি আমি — তা কেউই বুঝবেনা কোনদিন। এই বর্ষণ আমার মনের শংকাগুলো নিশ্চিত হবার বর্ষণ। দীর্ঘ দুইযুগের বেশি জীবনের অভিজ্ঞতায় খুঁজে ফিরেছি জীবনের মানে — আমাদের ভালোবাসা আর বন্ধনের একটা স্বরূপ খুঁজতে চেয়েছি…

এই শূণ্যতাকে আলিঙ্গন করার পর আর কিছুকেই খুব বড় মনে হচ্ছেনা। শুধু আজকের বর্ষণটাই বাকি ছিলো। প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে চাইছি আর্তির মাঝে। জীবনটা আমার কাছে ভ্রমের মতন লাগে। জীবনে অনেক বড় মানুষদের মতন হবার ইচ্ছে ছিলো, বড় হতে না, বড় গুণগুলো অর্জন করতে। কিছুদিন আগে অবধি আমি হাল ছাড়িনি। এখন আমি জানি, আমার সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকুই অনেক রিক্ততাময়। একটা জীবনকে অনেককিছু পার হতে হয়। আমার জীবনের পেছনে এত বেশি ক্ষয়, সেই ক্ষয় পেরিয়ে সামনের সিঁড়ি বেয়ে আর আগানো হয়না, হবেনা নিশ্চিত।

অশান্ত আর হতাশাময় সমাজ, তীব্র যন্ত্রণাময় আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমন্ডল — সবকিছুকে মাথায় রেখে নিজেকে অনেক পূর্ণ লাগে। কিন্তু, পরক্ষণেই জীবনের জন্য খুঁজে পাইনে প্রেরণা। জীবনে যাদের খামচে ধরে আঁকড়ে থাকতে চেয়েছি বারংবার তীব্রতম ধাক্কাটা সেখানেই খেয়েছি। আর কত ঠেকে শিখবো আমি হে আমার স্রষ্টা? চাইতে চাইতে চাইতে…ক্লান্ত হয়ে… অস্থির হতাশ হয়ে যখন আর কোন ন্যুনতম উদ্বেলতা থাকেনা আমার হৃদয়ে — মাঝে মাঝে তখন এসে হাজির হয় আমার জীবনের কিছু প্রাপ্তি। চোখ তুলে ফিরেও চাইনা। নিস্তরঙ্গ ক্লান্তিময় একটা জীবনকে ধারণ করতেও অনেক কষ্ট। চারপাশে দেখে শুনে অনেক গভীর থেকে বুঝি সবকিছু — শুধু পা দুটো আর আগাতে চায়না দু’ধাপ।

আমি জানি এই বর্ষাধারা আমার মাঝে কতটা চঞ্চলতা নিয়ে আসতো। অথচ আমি হতবাক হয়ে গেলাম আমার নির্বিকারতা দেখে আজ। আকুলতা পাইনা খুঁজে কিছুতেই। অদ্ভূত এক ভ্রমময় আমার এই জগত। মাঝে মাঝে সবকিছু অবাস্তব লাগে। কীসের টানে সবাই দেশ-বিদেশ পাড়ি দিতে পারে? কেমন করে এই ন্যূনতম আপনজনদের রেখে দূরে থাকা যায়? এই আপনরাই কত পর! এই পৃথিবীতে কেউ তো কারো নয়।

বর্ষার সময় মাটির সোঁদা গন্ধটা নাকে গেলে অদ্ভূত ভালো লাগতো। অথচ আমার আর কিছুই ভালো লাগেনা। বহুদিন পর মনে হয় কিছু লিখতে বসেছি। এতটা জীবন পেরিয়ে এসে একটা কথাই ইদানিং মনে হয় — আমি হয়ত বেশিদিন বাঁচবো না। আমার জীবনের অনুভূতির জগতের সবকিছুই অতীত, আমার জীবনের ভালোলাগার অনুভূতি সবাই অতীত। অনেককিছুকে এড়িয়ে, অনেকদিন যাবত অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজলাম জীবন থেকে — আপনমনেই। বেশ ক’টা বছর অনেকটাই অন্যরকম গভীরতার মাঝে খুঁজতে চেয়েছিলাম আমার অস্তিত্বের অর্থ, সংকটের উত্তরণের উপায়।

এক অদ্ভূত ভ্রম এই জীবন, এই যেন আছে, এই যেন নেই! এক অদ্ভূত শূণ্যতা জীবনজুড়ে। আমি শুধু সেইদিনটির অপেক্ষায় আছি, যেদিন আমার স্রষ্টার সাথে আমার দেখা হবে, তার পরম সান্নিধ্যে আমি পূর্ণ হবো। সেই সাক্ষাতটার ব্যাপারে আশাবাদী হবার কোন পুঁজি আমার ভান্ডারে জমা হয়নি বলেই আমার শূণ্যতা প্রকট হতে থাকে ইদানিং। এ এক অদ্ভূত শূণ্যতা… এ এক অদ্ভূত কষ্ট। আমি জানি আমার এই অনুভূতিরা কত বেশি গভীরের যা সাধারণ চিন্তার মানুষদের কল্পনার অতীত। যদি এই শূণ্যতা থেকে মুক্তি পেতাম, যদি আশার আলো দেখতে পেতাম অনন্ত জগতের! সম্ভবত এই মাটির পৃথিবীর কিছুতেই আর আমার আকর্ষণ হবেনা। একসময় যা আমার আরাধ্য ছিলো, তা পেয়েছি — নির্বিকার শূণ্য হৃদয়। কিন্তু, এখন যেন এটাই আর চাইনা!

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

বর্ষণ-এ 5টি মন্তব্য হয়েছে

  1. Nure Alam Masud (@nure_alam) বলেছেন:

    আমার আর বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। ডাক্তারের নিষেধের চেয়েও নিজেকে বেশি নিষেধ করি। তবে আম্মু জানতে পারবে না, এমন নিশ্চয়তা পেলে হয়তো….।
    এই কয়দিন বৃষ্টি হয়েছে, সত্যি কথা — আমি এক বিন্দু প্রোগ্রামিং নিয়ে বসি নি। কোনো কিচ্ছুতে মন বসে নি, এবং কেনো যেনো মন খারাপ খারাপ লেগেছে, আর কী যেনো এক চিন্তা মনের মাঝে উঁকি দিয়ে গিয়েছে, কিন্তু প্রকাশ করে নি নিজেকে। বেশ কিছু মানুষের সাথে বৃষ্টির চমৎকার সব স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠেছে।
    রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলেও লিরিক্সগুলো মাথার উপর দিয়ে গিয়েছে, কারণ মন বহদূরের পথ পেরিয়ে কই যেনো চলে গিয়েছিলো। তবুও জোর করে গতদিন, আজ পড়লাম, যেটুকু ক্লাস নেবার জন্য না পড়লেই নয়।
    এই অসময়ের বৃষ্টির মত করে অভাবনীয়, কিন্তু বহু প্রত্যাশিত কিছু কিছু ব্যাপার যদি ঘটতো !
    তবে কাটখোট্টা প্রোগ্রামের দুনিয়া থেকে এক লাফে বেরিয়ে এসে আপনার মত করে ব্লগ লিখতে পারতাম !

  2. অজানা আমি বলেছেন:

    অসাধারণ অসাধারণ! অনুভূতির চমৎকার প্রকাশ।

    এই বৃষ্টিটা খুব দরকার ছিলো। গরমে প্রায় অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম।
    সে কী আশ্চর্য বৃষ্টি! কি সুন্দর ঠান্ডা বাতাস প্রাণ জুরিয়ে দিয়েছে।

    জীবন নিয়ে আমি নিজেও শঙ্কিত! কিছুই ভালো লাগছে না।
    ইচ্ছে করে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে।😦

    আপনার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা।
    শুভেচ্ছা-🙂❤

  3. তাসনীম বলেছেন:

    মন খারাপের লেখা😦
    ঘন বর্ষণে আমার শুধু সেইসময়টা ফিরে পেতে ইচ্ছে হয়…

    বাইরে অবিশ্রাম বৃষ্টিতে শহর ভেসে যাচ্ছে…
    পুরোনো ক্লাস রুমে গোলাম মোস্তফা স্যার ধীর কন্ঠে আমাদের ‘পল্লীবর্ষা’ পড়াচ্ছেন….

    অপার্থিব অনুভব…

    সূর্য ঢেকে আছে।
    বাতি জ্বালানো আছে ক্লাসরুমে।
    স্যার বলছেন,শোনো আমরা আজকে বাতি নিভিয়ে পড়বো।

    ক্লাস নাইনের একদিন বাংলা পদ্য ক্লাস।পুরোনো একটা ক্লাসরুম।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s