ক্ষণজন্মা আকাঙ্ক্ষা

মাঝে মাঝে এত বেশি বিধ্বস্ত লাগে, এতটাই exhausted লাগে যে মনে হয় যদি সেইন্ট মার্টিনের জনমানবহীন পাড়ে একটা তাবু নিয়ে অন্তত ক’টা দিন থাকতে পারতাম! এই নাগরিক জীবনের চাপে পিষ্ট হয়ে শরীর-মন খিটখিটে হয়ে শক্ত হয়ে বসে আছি। আমাকে একটু অবসর দাও! অন্তত একটিবার!! মরে যেতে চাইনা, শুধু একটু অবসর। আমি বুকভরে শ্বাস নিয়ে যদি একটু নিঃশঙ্কোচে হাসতে পারতাম। একটিবার, আর তো চাপ সইতে পারেনা এই শরীর-মন-অন্তর!! কিছু জীবনে কখনো অ্যাডভেঞ্চার হয়না…

সময় বয়ে চলে, অনুভূতিরা ম্লান হয়, আতঙ্করা থেকে যায়। আতঙ্ক শক্তিশালী হতে থাকে ক্রমশঃ। তারা ডালপালা মেলে গভীর থেকে গভীরে শেকড় স্থাপন করে। আমি হঠাত অনিয়ত কান্না শুনি, কিছু সুন্দরের স্মৃতিচারণ করি, ফিরে ফিরে খুঁজি এই সমাজের, দেশের সহস্র মৃত্যু-খুন-জখমের মাঝে একচিলতে সুন্দর শব্দ, কোলাহলের মাঝে ক্ষণকালের বিমূর্ত সংগীতের মতন। হে আমার স্রষ্টা! এই ভয়ংকর বিবেকময় সমাজের মাঝে আমাদের দয়া করো। আমাদের মানুষগুলোকে পথের সন্ধান দাও, পশুত্বকে দেখে আর পারিনা ধৈর্য্যধারণ করতে!

জানিনা কেন, মাঝে মাঝেই আমার ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে লেখা অমিত আর লাবন্যের চিঠির কবিতাগুলোর দু’একটা লাইন মাথায় ঘুরতে থাকে। খানিকক্ষণ আগে কিছু শূণ্য মূহুর্ত কাটাচ্ছিলাম — দীর্ঘশ্বাস, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের স্মৃতি আর চিন্তার সমন্বয়ে কাটানো দুর্ধর্ষ কষ্টময় কিছু মূহুর্ত। এই অবনীল সময়কে আমার ভয় করে, আমি বুকের ঠিক মাঝ থেকে গলা পর্যন্ত উঠে আসা দুই রেখার শীতল স্রোতের অনুভূতিকে ভয় করি, সন্ত্রস্ত হয়ে যাই।

এসবের মাঝেই লাবন্যের লেখা চিঠির কথাটা মনে পড়ছিলো — “তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান”। স্মৃতি হঠাত কী করে এত শক্তিশালী হলো আমার জানিনা! আমি গুগলে খুঁজে পেতে বের করলাম শেষাংশটুকু। জানি, এ কেবলই স্মৃতিবিভ্রাট। জানি, এই কবিতার ছত্রেছত্রে যে অনুভূতির ছবি আঁকা — তা সম্পূর্ণ অবাস্তব। তবু, কিছু কল্পনা সবাইকে তাড়িত করে। প্রেমানুভূতি হয়ত তাদেরই একটা। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাওয়া সমাজে বাস করে সুন্দরের বিলাস একদমই অদ্ভূত। নোঙরা জলের কচুরিপানাদের মাঝে সাদা গোলাপ দেখতে চাওয়ার মতন অবাস্তব খায়েশ যেমন অদ্ভূত — তেমনি অদ্ভূত এই সুন্দরের বিলাস।

কুরআনুল কারীমের কোথায় যেন পড়েছিলাম, এই জল-স্থল-অন্তরীক্ষের যত অস্থিরতা অশান্তি তা মানুষের দু’হাতের অর্জন। জানি, আমরা যা পাই, তা আমাদেরই অর্জন। আমরা যেমন করছি, আমাদেরই মানুষেরা তা দিচ্ছে। সমাজের এই ভয়ঙ্কর শ্বাপদদের হাতকে আমরাই সুদৃঢ় করি। আমরাই ক্রমাগত ভুলে যাই আমাদের রবের কথা। একদিন সবাই একত্রিত হবো সেই সে দিনের কথা…

এলোমেলো এই শব্দগুলোই আমার বুকের ভিতরের চেপে থাকা নিরন্তর অস্থিরতার অভিক্ষেপ। এই শব্দজঞ্জালের মাঝে লুকিয়ে থাকে কালের প্রবাহমানতায় অস্বস্তিতে থাকা এক শুভ্র জীবনের খোঁজে অপেক্ষমান আত্মা। আমি নির্নিমেষ কল্পনা করি, সুন্দরের গান যখন বাজবে এই সৃষ্টিচরাচরে অমন দিনগুলোর কথা। দু’হাত তুলে প্রার্থনা করি প্রতিদিন সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে — আমাদের ক্ষমা করো, আমাদের দয়া করো।

সবশেষে কবিগুরুর লেখা সেই লাইনগুলো তুলে দিই। স্মৃতিপ্রকোষ্ঠে যারা গেঁথে গেছে অদ্ভূতভাবে!

ওগো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান–
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।


ছবিঃ আমার তোলা || সেন্ট মার্টিন প্রবালদ্বীপ [সূর্যোদয়কাল]
কবিতাংশঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [শেষের কবিতা]

Advertisements

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

2 Responses to ক্ষণজন্মা আকাঙ্ক্ষা

  1. tusin বলেছেন:

    মন খারাপ করা লেখা। সত্যি প্রতি লাইন প্রচন্ড আবেগের সাথে পড়েছি।
    আপনার এই টাইপের লেখাগুলো বেশ ভাল লাগে। কেমন যেন একটা মায়া এবং আবেগের কথা মিশে থাকে আপনার এই ধরনের লেখাগুলো মাঝে।

  2. তাশফিকা বলেছেন:

    ঠিকি,বাস্তবতা আর আবেগের মিশেল।আসলেই বর্তমান থেকে দূরে যেতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।
    সেন্ট মার্টিন্স কবে গেসিলেন?
    কেমন চলছে পড়াশোনা, চাকরি ইত্যাদি?
    ক্যাডেট কলেজ নিয়ে লিখেন না কেন?

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s