ভ্রমকথা

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শ্রদ্ধেয় Rushdi Shams স্যার [ফ্লিকার লিঙ্ক],
ছবির নামঃ A Momentary Lapse of Reason

—–
লিখতে বোধহয় ভুলেই যাচ্ছি। কত-শত দিন পর যেন লিখতে বসেছি! কেমন যেন আড়ষ্ট লাগছে। শীতে জমে গিয়ে আড়ষ্টতা না, বরং অনুভূতিদের জমে যাওয়ার অস্বাভাবিকতা। অথচ দু’চারটা কথা বুকের ভেতর খচখচ করে অনেকদিন ধরেই। তারা লেখার মতন শব্দস্রোত হয়ে আর ঝরে না বুকের ভেতর জমে ওঠা পাথরের শরীর বেয়ে ঝরে পড়া এই অনুভূতির ঝর্ণা বেয়ে… হ্যাঁ, পাথরই বৈকি! সময়ের সাথে সাথে, কালাতিক্রান্ত হয়ে, প্রকৃতিতে বেঁচে থাকায় স্রষ্টার দেয়া যোগ্যতার ফলশ্রুতিতেই একসময় নরম কাদামাটি জমে পাথর হয়। মাটির পৃথিবীতে হয়ত লাগে সহস্রাব্দ। কিন্তু মানব হৃদয়ের অনুভূতিতে তারা হয়ত কয়েক অব্দেই তা সহস্রাব্দের কাজ করে যায়। গত বছরের শেষটা, আর এই বছরের শেষটা — দু’য়ের মাঝে কতনা ব্যবধান। তার কয়েক বছর পেছনে ফিরে তাকালে তো এই আমার সাথে মেলাতেই পারিনা! যোজন-যোজন পার্থক্য এই দুই মানুষে!

এই জীবনকে নিয়ে আমার কত আয়োজন ছিলো! এই হৃদয় একসময় উর্বর মাটির মতন ছিলো। যা ভালোবেসেছি, যা নিয়ে মেতেছি — তাতেই এসেছিলো প্রাপ্তি। প্রচেষ্টা আর ভালোবাসার ফলন ছিলো। ভালোবাসতে, কারো জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে, অনুভূতিপ্রবণ হতে অস্বস্তি হয়নি ক্ষণকালের জন্যও। অথচ, কী নিদারুণ এই সময়। এই আমার আল্লাহর নিদর্শন। আজকাল হৃদয় যেন ক্রমে কঠিন হয়ে চলেছে। কোন স্বপ্নই আজ আমায় আর স্পর্শ করেনা যেন! চোখ বন্ধ করে কিছু পেতে ইচ্ছে করেনা! আমি বরাবরই এরকম ছিলাম কমবেশী। কিন্তু এ এক অন্যরকম ঔদাসীন্য। এই মৃত্তিকাসম হৃদয়কে আজকাল বিবশ নিরুদ্বিগ্ন পাথরের মতন লাগে। ক্রমাগত আঘাতে, খোঁচায়, ভীতির শীতলতা, সময়ের দুশ্চিন্তা, জীবিকার চাপে পিষ্ট হবার মতন নানাবিধ প্রাকৃতিক চাপ-তাপ-আঘাতে এই নরম মৃত্তিকার হৃদয়ও যেন আজ বিবশ পাথরের মতন হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

মাঝে মাঝে খুব ভ্রমের মতন লাগে। এই জীবন, এই আমার হাত-পা, এই আমার প্রিয় মানুষগুলো, আমার ছড়িয়ে রাখা ভালোবাসারা, আমার বিলিয়ে দেয়া হাসি, আমার মমতামাখা শব্দের আঁচড়ে সৃষ্টি করা লেখার দল — এদের সবাইকে বিদায় দিয়ে চলে যেতে হবে। গত পরশু হঠাতই আমার মনে ভেসে উঠছিলো কলেজের দিনগুলোর ক্ষণকয়েক মূহুর্ত। এই আমার হৃদয়ে অমন দরদ ছিলো, সেই মনোযোগে আমার আল্লাহকে স্মরণ করা ছিলো — তা যেন আর আমি ভাবতেই পারিনা! কোথায় হারিয়ে গেলো এই দিনগুলো।

আমি কোনদিন নিজেকে বিশ্বাস করাইনি, বিশ্বাস করিনি — এই জগতে কালো মানুষ থাকে। আমি সবসময়েই ভেবেছি জগত হলো আয়নার মতন। যেমন করবো, তেমনি করে পাবো। এই জগতে রাজনীতি নেই, এই জগতে চোর-বাটপার নেই। এটা কেবলই অন্য মানুষের সাথে আমার সন্তরণ। অথচ, আমি দিব্যি জানি কালো মানুষ আছে। দুঃস্বপ্নের মতন লাগে মাঝে মাঝে জীবনের অনেক মূহুর্ত। ক্ষণকালের বেঁচে থাকা, অনন্ত শক্তির অনুধাবনের ম্রীয়মান আত্মা — কোথায় এর শেষ নিয়তি? জানি, এক অজানা সমর্পণ অত্যন্ত সন্নিকটে। এই চিন্তাই আমার ভ্রমানুভূতিকে জাগ্রত করে।

ভ্রম কেন? এই হৃদয়, এই চারপাশ, আমার আত্মা, আমার কান্না, আমার জীবনানুভূতি আর হাস্যোজ্বল অনব অধর — এ ক্রমশঃ বদলে যেতে থাকে। এই আমি, ক্রমাগত গুটিয়ে আসছি। মানুষের সাথে যোগাযোগ কমে আসছে। একটা আশঙ্কার খোলসে ঢুকে গেছি। জানি আমি, এই বেঁচে থাকার সাথে কল্পনার সুইস ফ্যামিলি রবিনসনের ফ্রান্সিসের সাথে দ্বীপে ঘুরে বেড়ানোর কোন মিল নেই। কেন যেন মনে হয়, আমার এই সোয়া শতাব্দীর জীবনটার সবচাইতে বড় উপলব্ধি হলো — কল্পনা/স্বপ্ন/আকাঙ্খার জগত আর বাস্তবের জগত সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। কোন জিনিস আশা করার পর পেলেও তা কখনই কল্পনার মতন সুন্দর হয়না, নির্ঝঞ্ঝাট হয়না। তার চাইতে বড় কথা — পাওয়া হয় খুব কালেভদ্রে। তাই চাওয়া পাওয়ার ঝুড়ি নিয়ে বিব্রত না হয়ে শুধুই মহান শক্তির পদতলে সঁপে দিয়ে চলার মাঝে হারানো নেই, অসমীকরণ নেই, নেই প্রবঞ্চনা। নির্বোধ আমি! নির্বোধ আমাদের দুর্বল আত্মারা — ছুটে চলে অজানার পথে। অথচ এই বাস্তবতার প্রতিটি আঘাতকেই ধরে নিতে হবে নিদারুণ সত্য — পার্থিব কল্পনারা অলীক। অনন্ত জীবনই কেবল প্রকৃত বাস্তব, এই ভ্রম থেকে সে-ই এক চিরন্তন সত্য।

এই নক্ষত্রালোকের কাছে অশ্রুজলকে ছলকে দিয়েছি বহুবার। কোন না পাওয়া, কোন এক অতৃপ্তিতে হয়ত। সেই ধারা বদলে পেয়েছি আপনতম, অন্তরতম জনকে অনুভব করার সুন্দরতম আশীর্বাদ। তবু, সেই না পাওয়াকে পাওয়ার স্বপ্ন আমার সম্পূর্ণ হারিয়েছে। আমি জানি, দুঃস্বপ্নের ঘোরে আমি স্বপ্নকে আমার পায়ের আঘাতে পার করেছি দৃষ্টির সীমানার ওপাশে। খারাপ কী, হয়ত কোন এক অজানিতেই চলে যেতে হবে এই মনোহর পৃথিবীর বাতায়ন ছেড়ে, ক্ষুদ্র অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। জানি, এই না পাওয়া, এই দুঃস্বপ্ন — হোক সে আমার এক অপ্রাপ্তির মহাকাব্য — সে ক্ষণস্থায়ী। এই মাটির ওপর কপালস্পর্শ করে যখন পবিত্রতা ঘোষণা করি অন্তরতম জনের, তখন অনুভব করতে পারি তার বিশালত্ব। এই ভ্রমময় জগতের প্রকৃত সমাপ্তি, আর নিরন্তর চাওয়া পাওয়ার হিসেবের শেষটা ভাবতে শিউরে উঠি। অশ্রুভরা হৃদয়ে শুধু চেয়ে উঠি, “আমাকে ক্ষমা করো খোদা, আমায় দয়া করো”। সে-ই আমার এই ভ্রমকাব্যের একমাত্র সফল প্রয়াণ।

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

ভ্রমকথা-এ 2টি মন্তব্য হয়েছে

  1. Mirza বলেছেন:

    “আমাকে ক্ষমা করো খোদা, আমায় দয়া করো”

  2. Nure Alam Masud (@nure_alam) বলেছেন:

    কঠিন ভাষায় লিখেছেন। কমেন্ট দেবার আগে আরেকবার পড়লাম ! এর আগে সময় না হওয়ায় শুধু পড়েছিলাম।🙂

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s