অপেক্ষা… অতঃপর


সুপ্রভা,
শুরুতেই একটা কথা বলে নিই। আমি কলেজ লাইফে রাজশাহী যাবার পথে কল্যানপুর ছেড়ে বাস আরিচার দিকে এগিয়ে গেলে পথিমধ্যে যখন ঢাকা-ধামরাই ঝটিকা পরিবহন দেখতাম, এই ‘ঝটিকা’ শব্দটার অর্থ জানতে মন চাইতো। পরে সংসদ বাংলা অভিধান ঘেঁটে শব্দার্থ জেনেছিলাম। এই পত্রখানি তেমনি একটা ঝটিকা পত্র লিখন। যদিও আকাশে-বাতাসে পত্র লিখার মাঝে তেমন কোন তাৎপর্য নাই, তাও লিখছি। অবশ্য যেই ভাবনা মাথায় করে লেখার তাগিদ পেলাম, তাকে পত্র বলা চলে না কিছুতেই, বড়জোর চিরকুট বলা যায়।

সে কথা থাকুক। আমি একটু আগে কী ভাবছিলাম জানো? অপেক্ষার বিপরীত শব্দ কী? আমার কাছে অপেক্ষার সমার্থক শব্দ হলো যন্ত্রণা বা পেইন। এই পেইন জিনিসটার ঘনত্ব জীবনে বেশি হয়ে যাচ্ছে। বিবিধ পেইনে ত্যক্ত-বিরক্ত আমি। রিসেশনের সময়ে যেমন কর্মী ছাটাই করে অর্গানাইজেশনগুলো, আমার পেইন ছাটাই করার সময় হলো। তাই অপেক্ষার বিপরীত হিসেবে কিছু কিছু জিনিস আমাকে অর্জন করে নিতে হচ্ছে। যেহেতু নিঃশ্বাস পড়ামাত্রই অপেক্ষা একমাত্র উপায়, তাই আপাতত মানসিকভাবে আমি কোমায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনুভূতি নাই, চিন্তাভাবনা নাই, অপেক্ষার হ্যাপা নাই — স্রেফ বেঁচে থাকা। এই কোমাকালীন সময়ে যাবতীয় রকমের উপস্থিতি, যোগাযোগ নিরর্থক — তা তো বুঝ, তাইনা? সুতরাং সেইটা মাথায় রেখো।

এই প্রসেস অবশ্য আজই শুরু হয়ে গেছে। আজকে ছুটি ছিলো আমার অফিসের। অসুস্থতা আমাকে আজকেও বেঁধে রেখেছিলো। আজকে বৃষ্টিও ছিলো, তদবধি তার কোন প্রভাব আমার মাঝে পড়েনি। ব্যাপারটা কোমায় থাকা হিসেবে আনন্দদায়ক। নজরুলের “বাঁধন-হারা” পড়েছিলাম মনে আছে তোমার? “অধর করুণামাখা/মিনতি বেদনা-আঁকা/নীরবে চাহিয়া থাকা/বিদায়খনে”। বিদায়খনে নীরবে করুণা মাখা অধরে বেদনা-আঁকা মিনতিতে চেয়ে থাকার কোনকিছুই আমার মনে পড়েনা। “ঝরঝর ঝরে জল বিজুলী হানে/পবন মাতিছে কোন পাগল গানে” কবিতাটা আমার খুব ভালো লাগত। আজকেও মন দিয়ে ‘মনে করলে’ বোধহয় হাত-পা ঠান্ডা পুরো হয়ে যেতো ভালোলাগায়!

এখন আর নজরুল পড়িনা, রবিদার সাথেও আড়ি নিয়েছি। আত্মার পড়াশোনায় পিছিয়ে গেছি অনেক। আমার এই আত্মা সৃষ্টির শুরু থেকে যার কাছে ছিলো, অল্প কিছুদিনের ভ্রমণে এসে তার কথা একদমই ভুলে গেছি। তাই তার পাঠানো বার্তার বইটা মন দিয়ে পড়তে শুরু করেছি। আমার আত্মা এখন আগের চাইতে শান্ত, স্থির, প্রশান্ত আর শান্তির পথে। তুমিও সময় করে পড়িও, শান্তি পাবে দেখো! এই শান্তিটা না খুঁজলে কেউ পায়না সে তুমি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলে একদিন।

আজ আর কলেবর বাড়াব না। কিছু কিছু সময় শব্দের সঞ্চারণের চাইতে ভাবের সঞ্চারণ বেশি দরকার। আমার কথাগুলো নিজ দ্বায়িত্বে বুঝে নিয়ো। আজ সূরা বুরুজ পড়তে গিয়ে পড়ছিলাম, “ওয়াহুয়াল গাফুরুল ওয়াদুদ/ যুল আরশিল মাজিদ”… সেই গাফুর [ক্ষমাশীল], ওয়াদুদ [প্রেমময়] এবং ‘আরশের মহাপবিত্র আল্লাহ’ তার অপার ক্ষমা আর প্রেমময়তার বর্ষাধারা তোমার উপর ঝরিয়ে দিন এই প্রার্থনা করি তোমার জন্য।

শুভেচ্ছান্তে,
অনন্তের পথের পথিক।

পুনশ্চঃ একটা ছবি দিলাম। এটা আমাদের সিএসই-২কে৫ ব্যাচের সমুদ্রযাত্রার সময় নাফ নদীর মোহনা পেরোবার সময় তোলা হয়েছিলো। আহামরি কিছু না। তবু তোমায় উৎসর্গ করলাম। সমুদ্রের বিশালতাকে একবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাইলাম আরকি!

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in চিঠি. Bookmark the permalink.

অপেক্ষা… অতঃপর-এ 4টি মন্তব্য হয়েছে

  1. Nure Alam Masud (@nure_alam) বলেছেন:

    লেখাটা পড়ে ভালো লাগলো- যদিও জানি না আমার এইখানে কমেন্ট করা ঠিক হলো কিনা !
    ছবিটা দেখে একবার কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম- ঐরকম জায়গায় থাকলে আমি ভয়ে শেষ হয়ে যেতাম😦

    • mahmud faisal বলেছেন:

      ছবিটা তোলা হয়েছিলো কেয়ারি সিনবাদ জাহাজ থেকে, আমাদের ব্যাচের ট্যূরের সময়। পুরা ব্যাপারটাই অনেক এক্সাইটিং ছিলো এবং ভয় লাগে নাই একটুও🙂

  2. রহস্য বালিকা বলেছেন:

    একদম নদীর মােঝ। must be exciting! ছবিটা সুন্দর। লেখাটাও ভালো লাগল। তবে যার উদ্দেশ্যে লিখলেন তার প্রতিক্রিয়া জানতে পারলে আরো ভালো লাগত।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s