এইসব দিনরাত্রি


সবকিছুর কি অর্থ থাকতে হয়? হয়ত হয়না। সমুদ্রের তীরে গিয়ে জল ডুব ডুব খেলায় কিছু নোনা জল গিলে ফেলাটা কী অর্থপূর্ণ? অথবা চাকুরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে এক দুই ঘন্টা অযথা ওয়েইটিং রুমে বসে থাকা সময়টার কোন অর্থ থাকে? আমার হয়ত এই সকালে অফিসে এসে লিখতে বসাও এমন অর্থহীন। সময়টা এমন কাজে ব্যয় করা — যার হয়ত আলটিমেইট কোন মানে নেই। আমি জানি, জীবনটা এমন না। জীবনের আল্টিমেইট মিনিং আছে। অথচ এত সব অনর্থক কাজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছি যে সেই মিনিংটা খুঁজেই পেলাম না পরিপূর্ণরূপে। এই ব্লগে পোস্ট লিখতে বসার মানে কী? বললাম তো, কোন মানে নেই। আমি বলেই দিয়েছি এখানে অর্থপূর্ণ লেখা নেই, আমি মিনিংফুল কিছু লিখিনা সচরাচর। আমি জগতের মাঝে নিরন্তর যাত্রার এক যাত্রী।

কিছু কিছু কথা বলার কোন মানুষ আমি চারপাশে খুঁজে পাইনা। তীব্র ব্যস্ত নাগরিক জীবনে আসলে কারো সাথে সময় করে দেখা করা দুষ্কর। ফোন করলে অচেনা ভঙ্গিতে “কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসের” কৃত্রিম আন্তরিক টোন শুনলে অথবা এসএমএস এর বিচিত্র রিপ্লাই পেলে ভাতে পানি দেয়ার মতন অনুভূতি হয়। তাই হয়ত ঘুরে ফিরে এই কম্পুর স্ক্রিণে কতগুলো শব্দ-বাক্য তুলে ফেলা। ক’দিন আগে একটা বড় প্রতিষ্ঠানে চাকুরির অফার পেলাম। যুক্তিযুক্ত কিছু কারণে বড় পাওয়াটাকে অগ্রহণও করলাম। একটা প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়লে বের হওয়া যায়না সহজে — এই ব্যাপারটা আমাকে ভাবাচ্ছিলো সবচাইতে বেশি। ক’দিন বেঁচে থাকবো জানিনা। তবে অল্প কিছু বেশি টাকার জন্য অর্থহীন কাজ করতে চলে যেতে মন চাইলো না। আসলে জীবিকার জন্য আমরা সারাদিন কাটাই। এমন কিছু যদি নাইবা করলাম যার অর্থ আছে — তাহলে সারাদিন বৃথা গেলো না? অনেকে আউটসোর্সিং করতো — এসইও এর কাজ। একদিন কাজ পেলো পর্ণ সাইটের রেটিং আপ করার মতন। এইটা যেমন একটা কাজ — করার পর পেইড হওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু এমন একটা কাজ — যার কোন দুনিয়া-পারলৌকিক প্রাপ্তি নেই। আমি তো এমনটা চাইনা। কী চাই সেটাও জানিনা। তবে অর্থপূর্ণ কিছু চাই। সেটা অর্জনের জন্য আমার সময় লাগলে লাগুক। এই কর্ম-প্রাপ্তির ব্যাপারটা নিয়ে দীর্ঘদিন চিন্তা করছি আর তাই বিব্রতকর অনুভূতিদের চেপে রাখতে পারলাম না বলেই লিখতে বসা!

জীবনের প্রতি আমার একটা ‘অ্যাটিচিউড’ আছে, হয়ে গেছে কোনভাবে, আমি জানতাম না– এইটাকে হয়ত ‘পারফেকশনিস্ট’ বলা হয়। আবার না-ও হতে পারে। ‘অ্যাবসোলিউটনেস’ও হতে পারে। কিছু একটা হবে। সবকিছুর অর্থ থাকতে হয়। কীভাবে হয় সেটা তা আমি জানিনা। এই জীবনের অর্থটা জানি। কারণ, আমি একজন বিশ্বাসী — ‘বিলিভার’। একটা অনন্ত মুক্তিই পরম আরাধ্য। আমার জীবনের শেষ আছে। এর পরের অনন্ত জগত আছে। আমি বুঝতে পারছিনা এই দুয়ের সিঙ্ক তথা ‘সিনক্রোনাইজেশন’ কীভাবে করতে হয়। আমি পড়ছি, জানছি, বোঝার চেষ্টা করছি আমার/আমাদের জীবনবিধানটা যা একমাত্র সমাধান! অথচ এর পালনের সম্পূর্ণ পথ খুঁজে পাচ্ছিনা, বা চোখে যেসব পথ দেখছি সেগুলো পছন্দ হচ্ছেনা। এটা একটা ব্যাপক আন্ডারস্ট্যান্ডিং। আমি এটুকুকে অনুভব করতে পেরেছি। অনেক কিছু পারিনি, পারছিনা সেই হতাশাও পীড়া দেয়। কিন্তু যতটুকু পেরেছি — তাও হয়ত অনেকে পারেন না। আমার অদম্য চাওয়া আর আকাঙ্ক্ষা ছিলো বলেই হয়ত অন্তত এই বোধটুকু জাগ্রত হয়েছ — আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা দয়াপরবশ হয়ে আমাকে দান করেছেন! যারা পারেন জীবনকে সুন্দর করে — অর্থপূর্ণ করে ধারণ আর পালন করতে — তারা আসলে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেন। লোভ-ভোগ-ক্রোধ-কামদের গতানুগতিক ধারাকে সামলে রাখতে শ্রম দিতে হয়। মুসলিম হিসেবে আমার আদর্শ, আমার ‘রোল মডেল’, মহান নেতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম; সেই সাথে উনার সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের জীবনগুলোর মতন অর্থপূর্ণ জীবন যাপনে ইচ্ছে হয়। সেই মহান মানুষদের জীবনীগুলো পড়ছি — ইন্সপিরেশনগুলো জীবনের অনুভূতির পরতে পরতে রাখার ব্যাপার আছে। এটাকে খুঁজতে চাইছি। একটা নিঃসীম জীবনকে দেখা যায়না, তাতে সফলতা পেতে প্রচেষ্টা করা — ব্যাপারটুকুর মাঝে বিশালতা আছে। কিন্তু আসলে এখানে একটা জড়তা কাজ করে। আমরা যা করতে থাকি সেটাকে বদলাতে না চাওয়ার জড়তা। নিজের খায়েশকে পূরণ করার জড়তা। অনবরত আত্মাকে চাপের মাঝে, কষ্টের মাঝে ফেলে রেখে আসলে আমরা ঘোরের মাঝে থাকি। সেই দলে আমি নিজেও ছিলাম, এখনো আছি হয়ত। কিন্তু এর নাম বেঁচে থাকা না!

অথচ আত্মার মুক্তি, আত্মার ভালোলাগা ভোগের মাঝে, নিজেকে জোর করে বড় করার মাঝে নেই এটা অন্ততঃ বুঝি। জানিনা কবে হুট করে জীবনের একটা যতিচিহ্ন চলে আসবে। আসতেই পারে যেকোন দিন। তখন প্রাপ্তি কী হবে আমার? শূণ্যতা? অথচ আমি জানতাম কী করে সফল হওয়া যাবে। কেবল কর্মের মাঝেই যত ফারাক! এলোমেলো থাকছি, হয়ত গুছিয়ে উঠতে পারছিনা। আবার নিজের জীবনকে নৌকার মতন ভাসিয়ে দিতেও ইচ্ছে করেনা। অনলাইনে ব্লগ আর সাইটে, বইতে আর পত্রিকায় দেখি কত-শত মত, ভাবনা, ধ্যান আর প্রচেষ্টা — তীব্র জাগতিক আর ক্লান্তিকর। বিশেষ কোন গন্তব্য নেই কারোই!

একটা বাক্যের দুইটা যোগ্যতা –সত্য আর মিথ্যা। একটা জীবনের দুইটি গন্তব্য — বাগান অথবা আগুন। মাঝামাঝি দল থাকলে ভিন্ন ব্যাপার ছিলো। বাগান ছেড়ে আগুন নিতে কার ইচ্ছে করে? যেন মৃত্যুর পরের অনন্ত জগতে শান্তি পাই। অথচ, ক্রমাগত যেন বদলেই চলে এই জীবনবোধ, জীবনানূভূতি, জীবনের রঙ, চারপাশ, বন্ধু-বান্ধব। কী অদ্ভূত! বদলে যাওয়া অনুভূতি আর সময়দের বৈচিত্র্য ভেবেই অনেক সময় পেরিয়ে যায় আমার। তাই হয়ত এলোমেলো অনেক কথা, এলোমেলো এই জীবনভাবনা।

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

এইসব দিনরাত্রি-এ 10টি মন্তব্য হয়েছে

  1. Saiful ISlam Chowdhury বলেছেন:

    আপনি অনেক সুন্দর লিখেন। লিখাটা মিনিংফুল হইছে। আপনাদের লিখা দেখে আমি একটু শিখার চেষ্টা করছি।
    তবে আমার জীবন নিয়ে আমি খুব ঝামেলায় আছি। আমি আমার জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছি না। আমার জন্য একটু দোয়া করবেন।
    ধন্যবাদ।

  2. Shohan বলেছেন:

    একদম পরিষ্কার লেখা… পড়ে খুব ভালো লাগলো। আশা করি সব সময় এই রকম লেখা পরতে পারবো।
    অনেক ধন্যবাদ।

  3. fadedreamz বলেছেন:

    হুম … দ্বন্দ

  4. tusin বলেছেন:

    মিনিংফুল একটা লেখা। কিছু একটা বুঝার চেষ্টা করেছি লেখা প্রথম বার পড়লে সাধারন একটা লেখা মনে হতে পারে…..আমি দুইবার পড়লাম লেখাটা………………সুন্দর এবং সবলীল লেখা……
    ভাল থাকুন ভাই……….এই শুভ কামনা……….

    অফটপিক:( আপনার মেইল আইডিটা দরকার। আপনার সাথে কথা আছে)

  5. jakirseu বলেছেন:

    সুন্দর একটা লেখা। ভালো লাগলো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s