আকাশের ঐ মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা


রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার ছেলেবেলা থেকেই গভীর আকর্ষণ অনুভব করতাম। অসংখ্য তারাদের মাঝে দু’একটার ঔজ্জ্বল্য ছিলো চোখে পড়ার মতন। গোড়ানের তিনতলা বাসাটায় থাকতে সাজু ভাইয়াদের ছাদের ট্যাঙ্কিটার ঠিক ওপরে আমি প্রতিদিন ভোরে একটা তারাকে জ্বলতে দেখতাম। ফজরের নামায শেষে আম্মু যখন কুরআন পড়তেন, তখন আমি বারান্দায় বসে আস্তে আস্তে তারাটাকে সূর্যের আলোতে মিলিয়ে যেতে দেখতাম। সন্ধ্যার পর আমি তাকিয়ে থেকেও তারাটা আর খুঁজে পেতাম না।

তখন হয়ত টু-থ্রি তে পড়তাম বা তার চেয়েও ছোট। আমার ছেলেবেলায় তারাদের প্রতি এই ভালোবাসাটাকে একটা সময় আর খুঁজেই পাইনি। ওই তারাটার কথা আমার আজো মনে পড়ে। বড় হয়ে একটা বই পড়েছিলাম, সেই বইটা পড়ে বুঝতে পেরেছিলাম সেই তারাটার নামই ধ্রুবতারা, সন্ধাতারা, শুকতারা। সাজু ভাইদের ট্যাঙ্কিটা পুবদিক ছিলো।

অনেক বছর পর কুয়েটে গিয়ে তারা দেখতে শিখেছিলাম। আমার অদ্ভূত সময়ের অদ্ভূত পাগলামিতে কাউকে বন্ধু করে খুঁজে পেতাম না বলে একাকী বড় মাঠে গিয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখতাম। একাকী হয়ত অনেক কথাও বলতাম। তখন Orion কালপুরুষ, সপ্তর্ষীমন্ডল ডিটেক্ট করার চেষ্টা করতাম। আকাশটাকে এর চাইতেও সুন্দর করে আর দেখেছিলাম যেদিন সেন্ট মার্টিনে রাত কাটিয়েছিলাম সিএসই’০৫ এর বন্ধুরা সবাই। হোটেল ব্লু মেরিনের দোলনাটায় ঝুলতে ঝুলতে তারার পানে চেয়ে চেয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলাম ঘন্টার পর ঘণ্টা…

চাঁদ-তারারা আমাকে অমন করে টানতো কেন? এই চাঁদ নিয়ে ”মুনলিট নাইট” প্যারাগ্রাফ লিখতে গিয়ে আমার চোখ যেমনটা স্বপ্নালু হতো ক্লাস টেনে থাকতে, বোধকরি আর কাউকেই অমন অনুভব করে লিখতে দেখতাম না। “twinkle twinkle little star, how i wonder what you are, up above the world so high, like a diamond in the sky….”

আকাশের পানে তাকিয়ে এই বিস্তীর্ণ কালো জমিনের বুকে হালকা ফোঁটা ফোঁটা আলোর সেই তারাগুলো যে খুব কৃতিত্বপূর্ণ ছিলো–তা না। কিন্তু তারা ছিলো প্রবল শক্তিময় কালো আঁধারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী। তারা ছিলো আশাবাদী। অন্ধকারে তারারা মিটমিট করে জ্বলতে থাকে। তবু হারিয়ে যায় না সহসাই। চাঁদকে আমি খুব ভালোবেসেছিলাম কখনো? নাহ। ‘মুন’ এবং ‘স্টারে’-এর মাঝে পার্থক্যটা সবসময় অনুভব করতাম। চাঁদ আলোর বিচারে অনেক শক্তিশালী, তবু সে সবসময় থাকে না। পূর্ণিমা, অষ্টমী, অমাবশ্যাতে তার রূপ ভিন্ন। চাঁদের ভরা জোছনার আলোতে ম্লান হয়ে যায় তারাদের অস্তিত্ব। কিন্তু তারারা তো থাকে বছরের পর বছর — একটানা। অনেক দূরে হলেও তাদের অস্তিত্ব তারা জানান দিয়ে যায় মিটিমিট করে জ্বলে থেকে — একটা নির্ভরতার প্রতীক, একটা আশ্বাসের প্রতীক হয়ে…

একদিন কোথায় যেন পড়েছিলাম — যেই তারার আলো আমি দেখতে পাচ্ছি, হতে পারে সেই তারাটার তখন অস্তিত্বই নেই। শত-সহস্র বছর আগে তার বিকীর্ণ করা আলোতে মুগ্ধ হয় আমার মন। কেন যেন ওই হারিয়ে যাওয়া অসহায় তারাটার কথা ভেবে আমার মন অনেক বিষণ্ণ হতো। তার অস্তিত্ব নেই বলে আমার মন খারাপ হতো। আমি নিজের অজান্তেই হয়ত সেই তারাদের ভালোবেসে ফেলেছিলাম। ভালোবাসাও কি অমন হয়? ভালোলাগারাও কি অমন হয়? স্মৃতির পরশ দিয়ে ভালোবাসার রেশ রয়ে যাবে হৃদয়ে। যখন পাবোনা, তখনো হয়ত ভেবে নেবো সেই তারাটা ছিলো একটা সময়ে, আজ সে নেই, কিন্তু সে ছিলো। তার নিজস্ব আলোতেই জেগে উঠেছিলো আমার অনুভূতি আর মুগ্ধতারা।

চাঁদের আলোতে জোয়ার আসে, সেই আলোতে অবগাহন করে সমগ্র বিশ্বচরাচর। সেই আলোটাও নাকি তার ধার করা। তবু এই চাঁদকে নিয়েও তো কত হৃদয়ের কত স্বপ্নগাঁথা! চাঁদকে দেখে আমি সমীহ করি। তার সৌন্দর্যে আমি মুগ্ধ হই। তার আলোতে আমি ভেসে যাই। চাঁদ তবু আপন না। চাঁদ থাকে না অমাবশ্যার গহন আঁধারে, বিপণ্ণ পথচলায়, প্রয়োজনে যখন দরকার পাশে। পঞ্চমীতে চাঁদ ডুবে থাকে আপন ব্যস্ততায়। বদলে যেতে থাকে তার নশ্বর আলোর তীব্রতা।

চাঁদের পানে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিই তাই। আকাশের অন্য প্রান্তে খুঁজে ফিরি আমার ছেলেবেলায় হারানো তারাদের কাউকে। এলোমেলো হৃদয়ে কীসের খোঁজে কী খুঁজি আমি নিজেই কি জানি? মুখে অজানায় অচেনা ফিরে ফিরে আসে গানের চরণ–

“আকাশের ঐ মিটিমিটি তারার সাথে কইব কথা
নাইবা তুমি এলে
তোমার স্মৃতির পরশ ভরা
অশ্রু দিয়ে গাঁথব মালা
নাইবা তুমি এলে… ”

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in শুধু তোমার জন্য. Bookmark the permalink.

আকাশের ঐ মিটিমিটি তারার সাথে কইবো কথা-এ 4টি মন্তব্য হয়েছে

  1. suknopata বলেছেন:

    হুম…হুম…হুম…

  2. কি আশ্চর্য !!! গত পরশুদিন ডিসকভারী চ্যানেলে দেখছিলাম ব্ল্যাক হোলের উপর একটা অনুষ্ঠান। এটা আমি আগেও একবার দেখেছিলাম তবে পরশুদিনের টা ছিলো বাংলায় ডাব করা। ওটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম সেই মানুষগুলোর কথা । কি এক অদম্য আকর্ষণ তাদের তারা নিয়ে।

  3. কাঠপুতুল বলেছেন:

    এইটা ভালো লাগছে। পারফেক্ট লেখা।

  4. তাশফিকা বলেছেন:

    দিনলিপিটা সুন্দর।মনখারাপ মাখা।
    মনের বিভিন্ন অনুভূতি প্রকাশের জন্য লেখনী খুব ভাল মাধ্যম,তাই না?
    আপনি ব্লগে নিয়মিত সময় দেন,হয়ত লেখা মাথায় আসে বলেই আর সেটা ঝরঝরিয়ে বের করতে পারেন বলেই
    এটা ভাল্লাগে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s