পদ্মপাতার জল


শিরোনামটা আগেই দিয়ে বসলাম। দেখতেই কেমন সুন্দর লাগছে! কেমন একটা কাব্যিক কাব্যিক প্রকাশ! অথচ আমি ঠিক কাব্য লেখার কোন মুডে নাই। অনেকটাই ক্লান্ত, অবসন্ন। ‘পদ্মপাতার জল’ গানের কিছু শব্দ মাথায় ঘুরছে গতকাল থেকেই। এই গানটা একটা সময়ের জনপ্রিয় ব্যান্ডশিল্পী জেমস এর গাওয়া। এই গানটা জীবনে খুব অল্প কয়েকবার শুনেছি, হয়ত গুণগুণ করেছি অজস্রবার। জেমসের এই গান আমার কালেকশনেও নাই।

আমি ইদানিং গান শুনিই না একদম, কেন যেন শোনা হয়না। নাহ… এভাবে বলা ঠিক হলো না। বরং বলা উচিত, ‘গান শোনা’ ব্যাপারটার প্রতি একটা অভক্তি কাজ করে ইদানিং। অনেকবার নিজেকে খেয়াল করে দেখেছি– গান জিনিসটা প্রায়ই বুকের ভিতর এক ধরণের শূণ্যতার সৃষ্টি করে আমার মাঝে। অনেক প্রিয় গান শুনলেই ওই সময়টাকে ফিরে পেতে, ওই গানের স্মৃতিকে ঘেরা সময়টাকে, অথবা কিছু মানুষকে কাছে পেতে ইচ্ছা করে। প্রকারান্তরে আমি অস্থির হয়ে যাই। এইটাকে বড্ড ভয় করি! বলা যায় না, নিজের অযাচিত আবেগগুলো– যাদের ছাইচাপা দিয়ে রেখে চলি– তারা হয়ত এই দুর্বল মূহুর্তের সুযোগে আবার জেগে উঠতে পারে। কেন অযথা সমস্যায় আক্রান্ত হবো? আরেকটা জিনিস আছে, যা আরো অনেক সঙ্গীতে অনুভব করি তা হলো– উন্মাদনা। আমি যতটুকু স্মৃতি ঘাঁটতে পারি, তা থেকে এতটুকুই আমার এই ক’প্রকার– শূণ্যতায় ঘেরা না পাবার অনুভূতি, স্মৃতিকাতরতা আর উন্মাদনাই আমার সঙ্গীতঘেরা সময়ের তলানি হিসেবে রয়ে যায়। তাই ক্ষমা চাই হে সঙ্গীত, আমাকে ছেড়ে দাও ভাই!

‘পদ্মপাতার জল’ জীবনের প্রথম শুনেছিলাম আমার ক্যাডেট কলেজ জীবনের একজন প্রিয় বড়ভাই ‘রাফিয়াদ ভাই’ এর গলায়। তখন ৮ নাম্বার রুমে থাকি। দুপুরের দিকে প্রায়ই ভাই গলা ছেড়ে গান ধরতেন বাথরুমে এলে। জানালার পাশের বিছানা হওয়ায় আলতো স্বরের গানটি জোরে শোনার তাগিদে আমি বেশ অনেকদিনেই বাথরুমে এসে সাবান দিয়ে মুখ ধোয়ার কাজটা দীর্ঘায়িত করতাম। কেন যেন আজ এই ‘পদ্মপাতার জল’ বলতে গিয়ে অনেক কথাই মনে চলে এলো। সবচেয়ে মজার কথা হলো– রাফিয়াদ ভাইয়ের গলায় এই গানটা আমার যত ভালো লেগেছিলো, স্বয়ং জেমসের কন্ঠে শুনে মোটেই তা লাগেনাই।

রাফিয়াদ ভাইকে কোনদিন তার গানের প্রতি আমার এই ‘মোহগ্রস্ততার’ কথা জানানো হয়নি। সংকোচ, নাকি উপলক্ষ্যের অভাব তা জানিনা। আজ অনেকদিন হলো তার সাথে দেখাও হয়না! হায়রে অদ্ভূত সুন্দর কিছু স্মৃতি! হায়রে সময়গুলো! শেষ দুইটা বছর ভাইকে অনেক জ্বালাইসিলাম। সেই ‘কাদামাটির মূর্তি’ সংক্রান্ত টিজ করার জন্য একদিন লাঠি হাতে ধাওয়া করেছিলেন রাফিয়াদ ভাই আমাকে আর সাবরীকে😀 … আমরা তখন ওয়াল ম্যাগাজিনের কাজ করতেসিলাম… সেই সাবরীর সাথে বসে একটু আড্ডা দেইনা তা কত বছর! সাবরীর হাতে হ্যান্ডমেড কাগজে কয়েক ঘন্টায় আঁকা সেই ‘দেয়াল পত্রিকার প্রচ্ছদ’ আজো আমার টেবিলের এক-হাত দুরত্বে শোভা পায়। পেছনে সাবরীর হাতে লেখা —

Remember Me
–Sabri/1907

আচ্ছা, সাবরী কী ভেবেছিলো যে ওকে আমি ভুলে যাবো? অথচ আমি যখনই ইমেইল অ্যাড্রেসের ক্যাডেট নাম্বার চাপি প্রতিদিন কয়েকবার করে– প্রায় দিনই ওর কথা, খালিদের কথা, মুশফিকের কথা মনে পড়ে। অন্য সময়ের কথাগুলো তো বাদই দিলাম! খুব বেশি কাছের অনুভব হওয়া বন্ধুগুলাকে বলা হয়নি ওদের কত বেশি অনুভব করি। হয়ত ওরাও আমাকে করে– হয়তো না। কেননা আমি দেখেছি আমি কেন যেন খুব সহজেই সবার স্মৃতি থেকে বিস্মৃত হই…

আমি আসলে শিরোনামে এই শব্দটা পছন্দ করেছিলাম অন্য একটা কারণে। ভাবছিলাম বিশেষ একটা কথা। শুনেছি পদ্মপাতার জলে নাকি পানির ফোঁটা কখনই লেপ্টায় না। গড়িয়ে পড়ে যায়। এই দৃশ্যটা আমার কখনো দেখাই হয়নি। আমার আজ মনে হচ্ছিলো– জীবনের কিছু কিছু অনুভূতি, যেগুলো কষ্টদায়ক– সেগুলো এরকম করে যদি পদ্মপাতার জলের মতন করে গড়িয়ে দেয়া যেত হৃদয় থেকে– কতনা ভালো হত! আসলে, সুখী হবার এটা একটা বিশেষ কৌশল। আমি হয়ত কারো উপকার করবো– কিন্তু সেটা কোন প্রতিদানের আশাতে না, বরং কেবল স্রষ্টাকে খুশি করতেই। আল্লাহই আমাকে আমার ভালো কাজের প্রতিদান দেবেন– কোন মানুষের জন্য আমি অপেক্ষা করবো না। তাহলে আর আশাভঙ্গ হয়না। আর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ হয়, সাথে উপরি হিসাবে হৃদয়-ভঙ্গ থেকে মুক্তি আসে।

আমরা মাঝে মাঝেই দুঃখ পাই হয়ত এমন কিছু আচরণে– যা কিনা ওই মানুষগুলোর কাছ থেকে আশা করিনা। পথের মানুষের কাছে খারাপ ব্যবহার পাবার ব্যাপারেও একটা সতর্কতা থাকে। অথচ যারা প্রিয়, যাদের জায়গা হৃদয়ের একটা উঁচুতলার প্রকোষ্ঠে– তাদের ক্ষুদ্র ব্যতিক্রমী আচরণেও কেমন যেন কষ্ট কষ্ট লাগে। আমি জানিনা এই ব্যাপারে সঠিক আচরণ কী হওয়া উচিত। হয়ত এটাই স্বাভাবিক– আর সেজন্যই ভিন্ন কোন উপায়ে এই ‘এক্সপেকটেশন’টাকে বদলে দেবার কোন ‘আইডিয়া’ পাইনা… তবে হ্যাঁ, নিকটতম একটা সমাধান হলো– ‘পদ্মপাতার জল’ গড়িয়ে দেয়া… হে আমার ছোট ছোট দুঃখেরা, গড়িয়ে বয়ে যা অমন করে, তোদের আর রাখতে চাইনা আমার মাঝে… আমি তোদের দূর করে ঝামেলামুক্ত রাখতে চাই এই নাজুক মনটাকে। তোরা বড্ড ভার বাড়িয়ে দিস!

পদ্মপাতার জল নিয়ে অনেক কথাই বললাম, লিরিকটা শেয়ার করেই ফেলি। হয়ত আজকের লেখার জিনিসগুলো দিয়ে দুইটা আলাদা পোস্ট লেখা যেত! তবে অনুভূতির স্রোতদের বাধা দিতে বা কাটাকুটি করতে চাইনি বলে পুরোটাই লিখে ফেললাম। হয়ত অমন করে পরে আর মনে না-ও হতে পারে!

কবিতা তুমি স্বপ্নচারিণী হয়ে খবর নিয়ো না
কবিতা এই নিশাচর আমায় ভেবো না সুখের মোহনা
দেখবে আমাদের ভালোবাসা
হয়ে গেছে কখন যেন
পদ্মপাতার জল

বেদনাসিক্ত অশান্ত এই মন
ঘুরে ফিরে মেটায় প্রয়োজন
যতদূর যাবে এ ব্যাকুল হৃদয়
নীল বিষের পেয়ালায়
মনের বাঁধন

দেখবে আমাদের ভালোবাসা
হয়ে গেছে কখন যেন
পদ্মপাতার জল

নয়নগভীরে আমি নাই
নিবিড়তার ছোয়ায় হৃদয় প্রতিমায়
কোথায় হারালে বলো পাবো তোমায়
বসন্তে মাতাল আমি এক অপূর্ণতায়

দেখবে আমাদের ভালোবাসা
হয়ে গেছে কখন যেন
পদ্মপাতার জল

গায়কঃ জেমস
(গানটা স্মৃতি থেকে লিখলাম, লিরিকে আংশিক ভুল হতেও পারে।)

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in গান, স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

পদ্মপাতার জল-এ 9টি মন্তব্য হয়েছে

  1. maq বলেছেন:

    আমাদের ভার্সিটিতে এক নাইজেরিয়ান ছিল। সেই ছেলে অসম্ভব সুন্দর করে এই গানটা গাইত। ও যখন গানটা গাইতো, কেউ যদি না দেখে, তাহলে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে এক বিদেশী যে বাংলা প্রায় বুঝেইনা – সে গানটা গাচ্ছে!

    (পুরো লেখাটা পরে সময় করে পড়ব, ইদানিং সময় নিয়ে টাল-মাটাল অবস্থায় আছি! গুগল রিডারে শিরোনামটা দেখেই ঢুঁ মারলাম🙂 )

    • mahmud faisal বলেছেন:

      এই গানটা বিদেশী গাইতো? সে কেম্নে এইটার প্রেমে পড়লো জানতে ইচ্ছা করতেসে…😛

      আপনি ইদানিং এতো ব্যস্ত কেন তানিম ভাই? একটু অবসর নেন, সারাজীবন দৌড়ের উপর থাকলে চলবে বলেন? দেশে আসেন, ঘুরে-টুরে যান কিছুদিন🙂

  2. রকিব বলেছেন:

    দুঃখ কিংবা বিষণ্নতাগুলো যদি ওভাবে পদ্মপাতায় ঝরে পড়া জলের মতো গড়িয়ে তলিয়ে যেত দারুণ হতো। আবার অনেক সময় মনে হয় হতো না; ছোট ছোট কিছু দুঃখ, কিছু নিঃস্বার্থ স্মৃতি অনেকটাই যেন জীবনের পরিপূর্ণ স্বাদ এনে দেয়। আবোল তাবোল বলতেছি, এই বেলা ক্ষান্ত দেই।

    রাফিয়াদ ভাইয়ের কথা শুনে ওমন কিছুই মনে পড়ে গেলো। অঞ্জনের বেলা বোস আর নীলাঞ্জনা গানটা প্রথম শুনেছিলাম ফারহান ভাইয়ের গলায়। ভালোলাগার রেশটা এতটাই গভীর ছিল, স্বয়ং অঞ্জনের গলাতে শুনে আর সেই পুরনো স্বাদটা পাই নি।

    শিরোনাম দেখে অবশ্য আমি এ’কবিতার কথা মনে করেছিলামঃ

    তোমাকে ভালোবেসে
    — জীবানানন্দ দাশ

    আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল
    এই জীবনের পদ্মপাতার জল;
    তবুও এ জল কোথার থেকে এক নিমেষে এসে
    কোথায় চলে যায়;
    বুঝেছি আমি তোমাকে ভালোবেসে
    রাত ফুরুলে পদ্মের পাতায়।

    আমার মনে অনেক জন্ম ধরে ছিলো ব্যথা
    বুঝে তুমি এই জন্মে হয়েছো পদ্মপাতা;
    হয়েছো তুমি রাতের শিশির—
    শিশির ঝরার স্বর
    সারাটি রাত পদ্মপাতার পর;
    তবুও পদ্মপত্রে এ জল আটকে রাখা দায়।
    নিত্য প্রেমের ইচ্ছা নিয়ে তবুও চঞ্চল
    পদ্মপাতায় তোমার জলে মিশে গেলাম জল;
    তোমার আলোয় আলো হলাম,
    তোমার গুণে গুণ;
    অনন্তকাল স্থায়ী প্রেমের আশ্বাসে করুণ
    জীবন ক্ষণস্থায়ী তবু হায়।
    এই জীবনের সত্য তবু পেয়েছি এক তিল
    পদ্মপাতায় তোমার আমার মিল।

    আকাশ নীল, পৃথিবী এই মিঠে,
    রোদ ভেসেছে; ঢেঁকিতে পাড় পড়ে;
    পদ্মপত্র জল নিয়ে তার—জল নিয়ে তার নড়ে
    পদ্মপত্রে জল ফুরিয়ে যায়।

    • mahmud faisal বলেছেন:

      রকিব, অনেকদিন পর!
      রাফিয়াদ ভাইয়ের গলাটা আমার চরম ভালো লাগতো কারণ উনি একদম দরদ দিয়ে গাইতেন। এই স্টাইলটা আমি চরমভাবে রপ্ত করেছিলাম। তাই হয়ত কলেজে থাকতে প্রতিটা বছর প্রেজেন্টেশন নাইটে স্টেজে গান গাইতে উঠতাম পেছন থেকে বন্ধুদের ঠেলা খেয়ে। স্মৃতি…

      কবিতাটা অনেক সুন্দর। ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য।
      মন্তব্যটা পেয়ে ভালো লাগলো…

  3. rafiad বলেছেন:

    আমি নির্বাক।শুধুমাত্র একটা কথা বলি তোর জন্য আমার শুভকামনা রইল।হারিয়ে যাব সবাই শুধু স্মৃতি গুলো রয়ে যাবে সারাজীবন……

  4. razibdeb বলেছেন:

    লিখাটা পড়ে খুব ভাল লাগল। অনেক দিন পর বাংলা লিখা পড়লাম।

  5. Rony Parvej বলেছেন:

    গানটাই শোনা হয়নি আমার।😦

  6. pial hasan বলেছেন:

    কলেজ এর বিন্দু মাত্র কিছু শুনলেও মনটা জানি কেমন করে ওঠে…………খুব ভাল লাগলো ভাই……

  7. তাজিন বলেছেন:

    হুম…
    স্মৃতিময়…গীতিময়…।।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s