দেয়াল পত্রিকা এবং একটি কবিতা — ‘প্রথম সূর্যোদয়’


এই কবিতার পেছনে একটা ঘটনা আছে।
তখন ২০০০ সাল।
আমরা ৩৬ তম ব্যাচ তখন ক্লাস এইটে — জুনিয়র মোস্ট ক্লাস। ৩২ তম ব্যাচ হলো ক্লাস ইলেভেন। এস.এস.সি. পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফলাফল নিয়ে কলেজে এসেছে নব উদ্যমে। তারা আমাদের দেখা সকল ক্ষেত্রে সেরা পারফর্মারে ভরা অসাধারণ একটা ব্যাচ ! যারা কঠোরতাতেও (যার অভদ্র ভাষা হলো — ‘অত্যাচার’) ততদিনে আমাদের হৃদয়ের মাঝে জায়গা করে নিয়েছেন, অনেক ঊঁচু জায়গা আর কি !! তারিক হাউসের সেই ব্যাচে ছিলো রিজওয়ান ভাই (কলেজ প্রিফেক্ট), লুৎফুল ভাই, সাইফুল ভাই, আজিজ ভাই, আলী আহসান ভাই, আব্দুল্লাহ ভাইদের মতো দুর্দান্ত পারফর্মাররা। (সত্যি কথা বলতে কি, এই ব্যাচ কলেজ ছেড়ে যাবার সময় আমরা ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে তাদের সাথে অসম্ভব ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো)

সেই ব্যাচের তৎকালীন দুর্ধর্ষ JP ভাইয়েরা হুকুম করেছেন প্রত্যেক জুনিয়রকে লেখা জমা দিতেই হবে ৫ দিনের মধ্যে ক’দিন পরে প্রকাশিতব্য দেয়াল পত্রিকার জন্য … ক্লাসরুমে এসে খবর পেলাম শুধু আমাদের হাউসে নয়, সব হাউসেই একই আদেশ। ব্যাপারটা নিয়ে আমরা সবাই আতঙ্কিত! নিজেদের ভেতরের লেখক স্বত্বাকে জাগিয়ে তুলতে ভীষণ ব্যতিব্যস্ত থাকলাম পরবর্তী কয়েকদিন। একাডেমী টাইম, প্রেপ টাইম এই সময়গুলোতে রাফ খাতার অনেকগুলো পৃষ্ঠা নষ্ট করলাম। হায় আফসোস! তবু কোন লেখার জন্ম দিতে পারলাম না… প্রেপে বসে ডানে বামে তাকিয়ে মায়াই লাগত ছেলেগুলোকে দেখে !! কী ভীষণ প্রচেষ্টা একজন কবি, গল্পকার অথবা প্রাবন্ধিক হওয়ার… অন্যদের কথা জানিনা, আমার চরম প্রাণান্তকর অবস্থা তখন। ৪ দিন শেষেও যখন আমার কোন উপায় হলো না, তখন ভাবলাম এবার ভিন্ন কোন উপায় বের করতে হবে।

কর্মমুখী শিক্ষা ভবনে একটা কক্ষে পুরনো দেয়াল পত্রিকাগুলো একসাথে করে ফেলে রাখা হতো — অযত্ন, অবহেলায়। আমি ফর্ম লিডার থাকার সুবাদে একাডেমী ভবনের পেছনের ঐ ভবনে একবার গিয়েছিলাম স্যারের কাছে পাক্ষিক পরীক্ষার নম্বর আনতে। তখন দেখেছিলাম সেই রুমটি। লেখা জমা দেয়ার শেষ দিন, রোজ বৃহস্পতিবার বরাবরের মতই ছিল সি এস সি/ ডি ডি পি, অর্থাৎ মঞ্চ প্রতিযোগিতা। সেই উপলক্ষে স্টেজ সাজাতে কিছু কর্মী প্রয়োজন হয় যা আমাদের ক্লাস এইট থেকে নেয়া হত। সেইদিন ঐ অনুষ্ঠানের দ্বায়িত্বে ছিলেন সাজ্জাত ভাই (আমার দেখা একজন অসাধারণ বক্তা)। তিনি আমাকে ঐ কর্মমুখী ভবনে পাঠালেন কাজে। তখনই বুকটা আমার আনন্দে নেচে উঠল সম্ভাব্য উপায়ের কথা ভেবে। আমি ভবনে গিয়ে খবর পেলাম মালাকার ভাই আরও সময় নিবেন কাজ সারতে। সেই সুযোগে ঢুকে পড়লাম ঐ রুমে, ছিঁড়ে যাওয়া একটা পুরনো দেয়াল পত্রিকা থেকে মাত্র ২০ মিনিটে মুখস্ত করেছিলাম একটা কবিতা।

সেই থেকে আজ অবধি ছাত্রজীবনে স্মরণশক্তির ক্ষেত্রে এতখানি কৃতিত্বের পরিচয় আর কখনো দিয়েছি বলে মনে পড়েনা। কবিতাটি লিখেছিলেন “ক্যাডেট বদরুল”। আমি বেশ খোঁজ নিয়ে কয়েকবছর পর জেনেছিলাম এই বদরুল ভাই খুব সম্ভবত ২৮ তম ব্যাচ এর। যা হোক, হাউসে গিয়ে কাগজে কবিতাটি তোলার পর দেখলাম তা অতিমাত্রায় দারুণ কবিতা। বুকে আর সাহস হলো না ঐটা জমা দেয়ার। তবে কবিতাটা পড়ে আমার মাঝে একটা ভাবের উদয় হয়েছিল যার ফলে আমি আরেকটি কবিতা লিখে ফেলেছিলাম এবং জমা দিয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম।

সেই দিনটি ছিল আমার কবিতার হাতেখড়ি। শুধু কবিতা নয়, যে কোন লেখালেখির হাতেখড়ি। এরপর কেন যেন আমার হাতে আর কখনও লেখার অভাব হয়নি। পরে প্রায় ৩/৪ টা দেয়াল পত্রিকা প্রকাশে মূল আয়োজকদের মাঝে ছিলাম। একটা দেয়াল পত্রিকা নিজের হাতে লিখে আলহামদুলিল্লাহ সেরা হাতের লেখার পুরষ্কার পেয়েছিলাম। দ্বাদশ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে প্রকাশিত কলেজ বার্ষিকীর সম্পাদনাতে ছিলাম হাউস কালচারাল প্রিফেক্ট থাকার বদৌলতে। গতবছর বিশ্ববিদ্যালয় বার্ষিকীর সম্পাদনাই করলাম। আমি জানি হয়ত প্রাপ্তির হিসেবে এই ব্যাপারগুলো সবার কাছে তেমন কিছু না… কিন্তু এই আমি ছিলাম কপর্দক শূণ্য। তারপর যতটুকু পূর্ণতা সেই ক্যাডেট জীবনের মাধ্যমে। আমার যতটুকুই প্রাপ্তি তার সিংহভাগের কৃতজ্ঞতা স্বীকার আমি নিঃসঙ্কোচে ক্যাডেট কলেজের প্রতি, আমার বন্ধুদের, সিনিয়রদের, জুনিয়রদের এবং সর্বোপরি শিক্ষকদের প্রতি করতে ভুলিনা কখনো।

এইগুলো পুরনো অনুভূতি, বহুদিনের জমিয়ে রাখা কথা!! বদরুল ভাইয়ের কবিতাটি হুবহু হবে না হয়ত। কিছু পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। আমার বিশ্বাস কবিতা যারা পড়েন তাদের এইটা ভালো লাগবে। এইটা আমার খুব পছন্দের কবিতা যা সবার জন্য তুলে দিলাম । আর হ্যাঁ, নামকরণটা আমার করা। এই কবিতা রচনা হয়েছিল আনুমানিক ১৯৯৭ সালে। অনেক পুরনো বটে !!

স্বাধীনতার দীর্ঘশ্বাস

প্রথম সূর্যোদয়ের এক তরুণ,
আলোকিত দিগন্তে দেখেছিল সে পরাধীন।
নিজের দিকে তাকিয়ে আবিষ্কার করেছিল — সে নগ্ন।
সমস্ত তারুণ্যকে দু’হাতের মুঠোয় করে বলেছিল,
“স্বাধীনতা দাও
একটু খাওয়ার, বাঁচার, আর লজ্জা ঢাকার একটু সুতিবস্ত্র মাত্র।”
হায়েনাগুলো তাতেও নারাজ।

প্রকৃতি বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, কেঁপে যায় আল্লাহর আরশ।
নীল বজ্র চিৎকার করে বলে — “লড়ে যাও, তোমাকে জিততেই হবে।”
কোটরাগত চোখে প্রতিশোধের আগুন ছোঁয়।
বজ্রপাতকে সংগী করে শুকনো পেশীগুলো স্টেনগান হয়ে ওঠে।
উত্তরে ভেসে আসে পিশাচের শেষ আর্তনাদ।

এগিয়ে চলে তরুণটি তার গন্তব্যে,
গর্ভধারিণীকে সুসংবাদ দিতে হবে — স্বাধীনতা এসেছে।
সর্বশক্তিতে এগোয় সে… পায়ে কী যেন ঠেকে,
পথে আছড়ে পড়ে শোনে সে — “স্বাধীনতা নিলে, কিছু দিবে না?”
ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে ওঠে — চিরতৃপ্তির হাসি…
খোলা প্রান্তরে পড়ে থাকে সবুজ এক তরুণ,
বুকের শার্টে রক্তের লাল চিহ্ন…
তখন সূর্যাস্ত গেছে।

এখন নতুন সূর্যোদয়।
তরুণের হাতে আনকোরা স্বাধীনতা,
জিন্সের প্যান্ট, টি-শার্ট, আর ফিফথ এভিনিউ- এর স্বাধীনতা।
আর নির্লজ্জ তরুণ-তরুণীদের খোলা রাস্তায়
উদ্দাম চিৎকার– আমরা স্বাধীন।
আর ক্যামিস্ট্রি ফ্যাকাল্টির সেই তুখোড় ছেলেটা,
যাকে স্বাধীনতা দিয়েছে কোমরে পিস্তল গুঁজে রাখার অধিকার।

সেজান, সেই নিরীহ ছেলেটা যার
জীবনের সোনালী দিনগুলোই নিয়ে গেল স্বাধীনতা…
ও তো কিছু করেনি, শুধু বলেছিল –
“আমি রাজনীতি করব না।”
হায়রে স্বাধীনতা–
চেয়েছিলাম জাতিটার কুষ্ঠ সারাতে কিন্তু
কখন যে ক্যান্সার বাঁধিয়ে বসেছে বুঝতেই পারিনি।

এখন এখানে সবাই স্বাধীন–
মন্ত্রী স্বাধীন, মজুর স্বাধীন,
স্বাধীন ‘সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন’ ট্রাকের চালকেরা…
আর ঐ ছেলেটা– যে
গুলি খাওয়া চোখ উপড়ানো লাশের বুকে পা রেখে
ক্যাম্পাস কাঁপিয়ে রাইফেল চালায়, আর বলে–
“আমরা স্বাধীন”।।

—-
পুনশ্চ ১ — বদরুল ভাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তার সাথে আমার কখনো দেখা হয়েছে কিনা জানিনা। তবে এই পোস্টটি তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে লিখলাম। আপনার জন্য অনেক দোয়া আর শুভকামনা রইলো ভাইজান🙂

পুনশ্চ ২– ধন্যবাদ ৩৫ তম ব্যাচের নাহিদ আল রাকিব ভাইকে। উনিও একই রকম ‘ভাবে’ পড়েছিলেন এই কবিতা পড়ে এবং উনিও একটা কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। আর কবিতার নামটা নাহিদ ভাই জানালেন। তাই ‘প্রথম সূর্যোদয়’ (আমার দেয়া নাম) থেকে পরিবর্তন করে দিলাম🙂

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in কবিতা, স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s