চলে গেলেন?


আজ ছুটির দিন ছিলো। সপ্তাহে ছ’দিন শ্রম বিক্রি করা এই আমার অন্য একটা আনন্দের দিন বরাবরের মতনই। সকালে উঠেই কোন টেনশন নিয়ে বিছানা ছাড়তে হয়না। বরং একটা পাশ ফিরে আরেকটু গড়িয়ে নেয়া যায় বিছানার এই মাথা থেকে ওই মাথা।

কিন্তু আজ সকালে আম্মুর ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো। হালকা শীত শীত ভাব, দেখলাম মা ঠিকই রাতে কখন যেন ফ্যানের তেজ খুব কমিয়ে আর গায়ের কাঁথাটা চাপিয়ে দিয়েছেন… এসব ফিল করছিলাম– তখনই আম্মু বললেন, “পাশের বাসার যেই নূরুল ইসলাম সাহেব ছিলেন না? যিনি তোমার আব্বুর সাথে প্রতিদিন নামাযে থেকে আসতেন, একটু আগে মারা গিয়েছেন।” ঘুম থেকে উঠে একটা তীব্র বিষাদের মনটা তেতো হয়ে গেলো। “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পড়লাম। যার অর্থ শিখেছিলাম, “নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।”

কী অদ্ভূত এই জীবন! পাশের বাসার এই চাচা আমার আব্বাজানের মতই সুন্দর চেহারার ছিলেন। তার মুখের দিকে তাকালে মনে হত যেন একটা আলো ঠিকরে পড়ছে। একজন ভালো মানুষ বলতে যেমনটা বুঝায়, চাচা অমনই ছিলেন। পথে মাঝে মাঝে দেখা হত, সকালে অফিসে বের হবার সময়, নতুবা কখনো নামায থেকে ফেরার সময়– সালামটা উনি অনেক সময়েই আগে দিয়ে ফেলতেন। ব্যক্তিগত আচরণ সুন্দর হতে হলে মানুষটাকে সুন্দর হতে হয় ঠিকই! ক’দিন আগে হঠাৎই জ্বরাক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই জ্বরেই বিদায় নিলেন। অত বড়সড় রোগ ছিলো না, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাকে নিয়ে যাবেন, এটাই হয়ত ঠিক ছিলো। রোগটা একটা উপলক্ষ্য মাত্র।

সূরা বাকারাহ এর ১৫৫-১৫৬ আয়াতের কথা মনে পড়লোঃ

  • এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। (155)
  • যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো। (156)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের এত সুন্দর একটা জীবন দিয়েছেন নিয়ামাত। অথচ ক্রমশঃ হারিয়ে যাই পার্থিব চিন্তায়, শঙ্কায়, হতাশায়… এই মৃত্যুই আমাদের অন্যরকমের অনুভূতি দেয়। আজ দুপুরে বাদ জুমু’আ চাচার জানাযা ছিলো। জানাযার নামায আমার কাছে কেমন যেন লাগে! শুনলে কখনও ফেলতে পারিনা। শুধু মনে হয়– আমি এমন করেই একদিন চলে যাবো– আমার জন্য কি কেউ দাঁড়িয়ে পড়বে না– “আল্লাহুম্মাগফিরলি লিহাইয়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা…… ”

মৃত্যু আমাদের জীবনে অবধারিত। আমি মৃত্যুভয়ে জবুথুবু হয়ে নেই। তবে মৃত্যুভয় আমাকে কাঁপিয়ে দেয়। আমি শিহরিত হই। কতখানি কী অর্জন করেছি? আজ আবার আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি। জানিনা, আমি সবার কাছ থেকে পাবো কিনা। অল্প ক’দিনের এই পৃথিবীতে আর কতটা পার্থিব লালসায় কাটাবো আমরা?

মৃত্যুর পর কবর, তারপর আলমে বারযাখ, কিয়ামাত, হাশর, মীযান, জান্নাত-জাহান্নাম। আল্লাহ, আমাকে সমস্ত ধাপগুলোতে মুক্তি দিয়ো। আমার সাথে আমার সকল মুমিন ভাইবোনদের। রক্ষা করিয়ো ভয়াবহ জাহান্নাম থেকে।

Advertisements

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

13 Responses to চলে গেলেন?

  1. শাহরিনা বলেছেন:

    জীবনে প্রথম মৃত্যু দেখেছিলাম তিন বছর বয়সে। রাত দুটোয় ডোরাণ্টির চিৎকারে ঘুম ভাঙতে শুনি, দাদুমণি নেই। প্রথম আমার দাদুমণি হারানো।
    অলৌকিকভাবে, আমার সত্যিকারের দাদুমণিও মারা গেছেন এই একই সময়ে। রাত দুটোয়। একটা ফোন পেলাম, তিনি নেই। এ্যানজেলার চিৎকার, মিথ্যা কথা, মিথ্যা কথা। এরপরে বাবার ফোন, তিনি নেই। তখন আট বছর বয়স।
    তৃতীয়ত, এক নানুমনিকে হারালাম এভাবে। তার সাথে দেখা হয়েছিল তিনি মারা যাবার এক বছর আগে। শেষবার দেখতে চেয়েছিলেন, পারিনি। একেবারেই পারিনি। এই ব্যর্থতা আজও কুরে কুরে খেতে থাকে..
    তার আগে যদি বলি, আমার অদেখা ভাইবোনগুলো। পৃথিবীর আলো দেখতে না দেখতেই চলে গেছে। আমার আর ভাই পাওয়া হয়নি, বোন পাওয়া হয়নি। যাদের অভাব অনুভব করি খুব..মাঝে মাঝে..

    “মৃত্যু আসবেই। তাকে তাই ভয় করিনা। অপার স্বাধীনতা দিলাম তাকে, সে আসুক, যখন খুশি, যেভাবে খুশি।”

    “চারপায়ার ঐ ঘুমের গাড়ি, আসমান ভরা জোছনার তরী, পাল ভিড়াইয়া উঠানে মোর সাদা জ্যোৎস্নার চাদর পরি…” (অর্ণবের গান)

  2. boder haddi বলেছেন:

    ব্যাপার নাহ, মরতে তো হইবোই, ক্যামনে কি?

  3. উনার বিদেহী আত্নার মুক্তি কামনা করছি।

  4. maq বলেছেন:

    কী বলব! বলার মত কিছু নেই। মৃত্যু অবধারিত জানি, কিন্তু তারপরও মৃত্য়ুর কথা শুনলে মনটা খারাপ হয়ে পড়ে। মনে হয়- কী দরকার ছিল চলে যাবার?

    নুরুল ইসলাম সাহেবকে আল্লাহপাক সকল দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে জান্নাতে রাখুন – এই কামনাই করি।

  5. পিংব্যাকঃ চলে গেলেন? | indiarrs.net Classifieds | Featured blogs from INDIA.

  6. উনার আত্মার শান্তি কামনা করি ।

  7. ochena pothik বলেছেন:

    onekbar blogtite asha hoyeche. kintu koshto kore comment kora hoyni….
    sheijonno dukkho prokash korchi.

    লেখাটা পড়ে আবার মন খারাপ হলো। ঠিক যেমনটা হয়, প্রতিবার কারও মৃত্যু সংবাদ শুনে। কিন্তু ওই পর্যন্তই……।

    • mahmud faisal বলেছেন:

      কমেন্ট করেছেন দেখে বড়ই খুশি হয়েছি। কমেন্ট পাওয়া অনেক আনন্দের জিনিস 😀

      আসলে আমাদের মন খারাপ হওয়াটাও কেমন যেন দিন দিন পানসে হয়ে যাচ্ছে! ইদানিং অনেক মৃত্যুর খবর শুনলেও মন খারাপ হয়না। অন্ততঃ এই অনুভূতিটা আসা উচিত– একদিন এভাবে চলে যাবো আমিও! এই চাচার মৃত্যুর দিনে কিছু মূহুর্ত কেমন একটা ঘোরে ছিলাম কেন যেন!

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s