বিচ্ছিন্ন ভাবনার ব্যবচ্ছেদ

ইদানিং আমার বড্ড মৃত্যুভয় হয়। অফিসে এসে লিফটে চড়লে কখনো কখনো মনে হয় লিফট ছিঁড়ে পপাত ধরনীতল হলে! অথবা বাসে করে অফিসে যাবার পথে পাসের বাসটা যখন প্রায় এক ইঞ্চি ব্যবধানে ওভারটেক করে– জানালার পাশে বসে আমি মাঝে মাঝেই শক্ত হয়ে যাই। পত্রিকায় পড়া ফোবিয়া না এইগুলা– এটা অন্যরকম মৃত্যুভয়। কখনো মালিবাগে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়েও বিপুল ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত যানগুলোর ফাঁকে থৈ করতে পারিনা রাস্তা পারাপারের জায়াগাটুকু–তখনো মনে হয় হঠাৎ কিছু এসে চাপা দিলে! ঢাকার জীবনে কিছুই অবাস্তব না! অথবা মাটির মসজিদের শক্তিশালী মাইকটিতে করে যখন মসজিদের খাদিম অথবা মুয়াজ্জিন সাহেব আমাদেরই কোন এলাকাবাসীর মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে জানাজার নামাযের সময় জানিয়ে দেন তখন…

বুকটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে যায় ঐ সময়টায়। অজান্তেই কল্পনায় নিজেকে একটু ঠেসে ধরি কবরটার মাঝে, অন্ধকার, গুমোট, তীব্র একাকী। চারিপার্শ্বে আলোর লেশমাত্র নাই। নড়াচড়া করার সুযোগ নাই। গায়ে আমার এক টুকরো সাদা কাপড়– অনাড়ম্বর, সেলাইবিহীন। আমি চিৎকার করে চলেছি অথচ কেউ শুনতে পাচ্ছেনা! আমি চারপাশে তাকিয়ে কিছুই দেখতে পারছিনা। আজ আর আমি কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছিনা। আমার বন্ধুগুলো যাদের সাথে অজস্র সময় কাটিয়েছি, আমার ভাইবোনগুলো যারা আমার একটু ভালোলাগাকে দাম দিতে কতনা কষ্ট করতেন… এমনকি আমার মা-বাবা শুনতে পাচ্ছেন না আমার চিৎকার, আজ নেই তারা আমার পাশে। দম আটকে পড়া গুমোট পরিবেশ, আজ শুধু হিসাব দেয়ার পালা। আলো-বাতাস-মাটি-পানি-সম্পদ-ভালোবাসা-পরিবার-বন্ধুবান্ধব-বুদ্ধিমত্তা-দৃষ্টি-শ্রুতি-কন্ঠ-অনুভূতি আর এরকম আরো হাজার ইউনিটের আজ বিল দেয়ার পালা… পোস্ট পেইড বিল, কিছু লিমিট ছিলো, তা অতিক্রম করে কতটা বকেয়া হয়েছে তার হিসাব…

সেখানে আমার পরম মমতাময়ী মা নেই আমার সাথে ডাকলেই যিনি ছুটে আসবেন, যাকে হতভাগা আমি প্রায় সবসময়েই রূঢ় হয়ে কথা বলতাম। অথচ ভালোবাসার আধিক্যে যেই মা আমাকে আজতক বকা দিয়ে কথাও বলেননি আমার সারা জীবনে!! যিনি খুব অসুস্থ হলেও আমার জন্য রাতে খাবার বেড়ে দিয়ে পাশে বসে থাকেন, আমার খাওয়া দেখেন। আমি টের পাই অনেকক্ষণ পর– যখন মা আমার খাওয়া শেষে বিছানায় শুয়ে পড়েন তখন বুঝি মা’র শরীরটা আজ বড্ড খারাপ। হতভাগা আমি সেই মা-কে কিছু দিতেও পারিনা– একটু ভালো ব্যবহারও না! সারাজীবন এই মানুষটি শুধু দিয়েই গিয়েছেন, যাচ্ছেন। আমাদের ৫ ভাইবোনকে ছাপিয়ে বড় ভাইয়ার পিচ্চি দুইটা, আপুর পিচ্চি দুইটার যত্ন-আত্মি ভালোবাসার দ্বায়িত্ব এই মানুষটিই সারাজীবন অকাতরে নিয়েছেন। আজো তার নাতি-নাতনীগুলো কোলে উঠে ভিজিয়ে দেয় যখন তখন। হয়ত নামায আর ইবাদত বন্দেগীর ইচ্ছা সত্ত্বেও হয়ে উঠেনা… এতগুলো মানুষের প্রতি খেয়াল রাখতে গিয়ে কখনো নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেন কিনা আমি জানিনা, আমার মনে হয়না। আমি মায়ের সাথে খুব সময় দিয়েছি, দিতে পেরেছি তাও না। আগে একটা সময় বাসায় ফিরতাম দীর্ঘদিনের ছুটি শেষে– ক্যাডেট কলেজ, ভার্সি্টি– মায়ের মুখটা যদি বাসায় ফিরে দেখতে না পেতাম, অস্থির লাগতো। এখন আমার বাসায় ফিরে নিজের অজান্তেই প্রথম কাজটি হয় মা-বাবার ঘরের পর্দাটা সরিয়ে তাকে দেখে একটু সালাম দেয়া, তারপর অন্যকিছু। সারাজীবন ছাদ হয়ে থাকা বাবার কথা বলার শব্দ আমার জানা নাই। যিনি সবসময়ের আস্থা, নির্ভরতা– তিনি আব্বা। আমি জানিনা বেশি কিছু, শুধু ভাবতেই পারিনা এই মানুষগুলো একটা সময় আমাকে ছেড়ে চলে যাবেন, অথবা আমি তাদের ছেড়ে চলে যাবো।

জীবনটা এত অদ্ভূত! আমার আল্লাহ একদিন আমাদের সবাইকে নিয়ে চলে যাবেন। অনন্তকাল থাকবো অন্ধকার, সংকীর্ণ, একাকীত্বময় কবরে– হয়ত যন্ত্রণায় অথবা আনন্দে। আমায় ক্ষমা করিও খোদা, আমাদের সবাইকে ক্ষমা করিয়ো– আমাদের মুক্তি দিয়ো।

আজ সকালে মিডওয়েতে করে আসছিলাম মতিঝিল থেকে সাইন্স ল্যাব– পথিমধ্যে যেন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর মিছিল বয়ে গিয়েছিলো বাসে। কারো পা নেই, কেউ অন্ধ– একজন আবার মাথার অংশ নাই, খুলি কেটে যাওয়া… হয়ত কেউ তাকে কুপাইসিলো। জানিনা, ইচ্ছে করেনি জানতে। সত্যি কথা বলতে কী– হতবুদ্ধি হয়ে আমি জানালা দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম কেননা লোকটার হাতও ছিলো না। সাহায্য দেয়ার কথা বলছিলো লোকটা। আড়ষ্ট হয়ে পকেটে হাত যাচ্ছিলো না– ভাবছিলাম, জগতে ভালো থাকা কোনটা? আর এই আমার সুস্থ, সবল হাত-পা, এই অলমোস্ট নীরোগ শরীর– তা কি শুধু শুধুই?

আমি অনন্তকে ভাবতে পারিনা। অনন্তকালের জীবনের কথা ভেবে শিউরে উঠি, আমার হিসেবের কথা ভাবলে আমি শিউরে উঠি। এই জীবনটা ছেলেখেলা না, এই জীবনটা যা-ইচ্ছে-তাই করার না। এই জীবনটা “ড্যাম কেয়ার” হবার না। বিদ্ধ্বস্ত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছুদিন কিছুটা ড্যাম-কেয়ার হতে বাধ্য হয়েছিলাম। ফলতঃ কড়া মূল্যে তার শোধ দিয়েছি ফলাফল অর্জনে– তার সুদূরপ্রসারী যন্ত্রণাভোগ করছি অনেক অনেক জায়গায় আবেদনপত্র অবধি জমা দিতে না পেরে। ব্যাস… আর জীবন কি এতই সহজ? এতই বিনা পরিশ্রমের জিনিস হতে পারে? নিজের চিন্তা ছাপিয়ে মাঝে মাঝে আশেপাশের অনেকের কথা মনে হয়– তাদের যদি একটু ভাবিয়ে দিতে পারতাম!! আমি হয়ত সঠিক কাজ করতে পারছিনা অনেক কিছু বুঝেও, হয়ত মহান স্রষ্টার দাসত্ব করতে পারছিনা যেভাবে করা উচিত। যারা বুঝতে পারেননি, তারা হয়ত বুঝতে পারতেন, হয়ত তারা করতেন!!

আচ্ছা, রামাদানের এই দিনে আমি আমার প্রতি যত মানুষ আজ অবধি অবিচার করেছিলেন, সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। আমার কাছ থেকে সবার দায়মুক্তি। আমার বন্ধুজনদের থেকে শুরু করে আমার দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন মানুষগুলো যারা তাদের খামখেয়ালিপনায় অজস্র কষ্ট পেতে বাধ্য করেছেন আমার সাথে আরো অনেক মানুষকে। আমি ক্ষমা পাবো তো? আমি কাদের অবিচার করেছি, জানিনা। অনেককে হয়ত চিনিনা, যাদের আমি অনৈতিক কাজে উৎসাহ দিয়েছিলাম নিষেধ না করে, সঠিক পথ না দেখিয়ে– তাদের কই পাবো?

লেখাটা এরকম করে লিখতে চাইনি, হয়ে গেলো। আর এডিট করতে যাবো না, হোক পাবলিশ। অনেকেই এই লেখা পড়ে বলে খানিক অস্বস্তিবোধ হচ্ছে, ভাবনাটা বেশি এলোমেলো হয়ে গেলো! তবু থাকনা। মিথ্যে কিছু তো আর লিখিনি, হয়ত একটু বেশিই ব্যক্তিগত অনুভূতি। কিন্তু এই জায়গাটার নামই যে–“আমার স্বপ্নময় জগত”!

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

বিচ্ছিন্ন ভাবনার ব্যবচ্ছেদ-এ 18টি মন্তব্য হয়েছে

  1. মৃত্যুভয় মাঝে মাঝে পিছু টেনে রাখে। ভয় থাকা চলে, ভয়ে ভীত হয়ে থাকাটা চলে না।

  2. jabir rizvi বলেছেন:

    কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম, এরকম ভাবনা মাঝে মাঝে অনেকের মাঝেই ভর করে, তবে জীবন তার গতিতে চলে, মৃত্যু সেই গতিকে হয়ত থমকে দিতে পারে, কিন্তু থামিয়ে দিতে পারে না। কারন, মানুষের জীবনকাল অনন্ত, মৃত্যু পরিবর্তনের (transformation) একটি উপলক্ষ্য মাত্র।

    তোর উপলব্ধি করা বাস্তবতাগুলো মেনে নিয়েই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে, হয়……..

  3. beatified বলেছেন:

    আমার প্রত্যেক রাতে শোবার পর মনে হয় যদি একটু পরে মারা যাই। কোথায় যাব আমি? কবরে কি হবে আমার সাথে?
    এই রকম চিন্তা আমার প্রতি রাতেই হয়। তখন আর কিছু ভাললাগে না। ঘুমতো দূরের কথা। এখন মনে হয় দিন গুনে বেঁচে থাকার পালা।

  4. হিমেল বলেছেন:

    মাহমুদ ভাই, আপনার লেখা পড়ে মন্তব্য করার কিছুই খুঁজে পাই না। আপনাকে বলার মতো কিছুই নেই। মৃত্যুর ভয় মানুষ কে দিতে পারে আসল পথের দিশা। হাজারো ভুল ও অপরাধে ঢাকা আমাদের এই লাইফটা, আপনার মতো এমনটা আমিও মাঝে মাঝে ভাবি তবে ভেবে বেশী দুর আগাতে পারি না। পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও সকলের জন্য প্রার্থনা করেই ক্ষ্যান্ত হয় ।

  5. তাপস বলেছেন:

    ইদানিং তোমার লেখা পড়ে আমিও বিষন্ন হয়ে যাচ্ছি। তোমার মধ্যে যে সৃষ্টিশীল মানুষটা আছে তার হতাশা তোমায় পেয়ে বসেছে। সব সৃষ্টিশীল মানুষেরই এটা হয়, fat-stupid দের হয় না। ভালো থাক-আনন্দে থাক। শুভেচ্ছা রইলো।

  6. নিঃসঙ্গ গোধূলি বলেছেন:

    মৃত্যুভয় মাঝে মাঝে আসা ভালো। তখন বেশি বেশি লিখতে ইচ্ছা করে। মনে মনে ভাবতে ইচ্ছে করে, “আমরা মরে গেছি। কত মানুষ ব্লগে এসে আমাদের সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বলছে। আহা!” খিকজ!!

    যা হোক, রসিকতা করা ছাড়া কিছু করার পাইলাম না। কমেন্টে একাত্মতা প্রকাশ করার মত কিছু নাই। আমার ভাষায় বলি, “মৃত্যু যখন আসে আসুক, ইচ্ছেমত আসুক। অপার স্বাধীনতা দিলাম তাকে। তার পথে সে চলুক, পথ ভুল করে আমার পথে পা ফেলুক, আমায় নিয়ে যাক, তার অপার স্বাধীনতার দেশে..”

    • mahmud faisal বলেছেন:

      আমি মরে গেসি আর লোকজন আমার ব্লগে সুন্দর কথা বলতেসে, এইটা আমি জীবনেও ভাবি নাই!!😯 শুনেই তো রোমহর্ষক লাগলো আমার কাছে। বাপ্রে!!

  7. যাযাবর বলেছেন:

    মজার ব্যাপার, কাকতালীয়- আমি জাষ্ট আজকে ভোরেই ঘুম ভেংগে প্রথম ভেবেছি ইশ, যদি এই পর্যন্ত যত মানুষের সাথে মিশেছি, থেকেছি- সবার কাছ থেকে যদি জনে জনে মাফ চেয়ে নেয়া যেতো মরার আগে! ইসলামকে যতটুকু বুঝি, ইসলাম খুব স্ট্রংলি মানুষের অধিকারের কথা বলে। অন্য মানুষকে কষ্ট না দেয়াও তার অধিকার বলেই মনে করি। কিন্তু জীবনে আল্লাহই জানে কত মানুষকে যে কষ্ট দিছি!😦

    ((আর আরেকখান অফটপিক কথা- তুমি মিয়া খালি এইরকম ফ্রাস্ট্রেটিং, হতাশা হতাশা আর হতাশা মার্কা চিন্তাভাবনা করো কেন?????? এই ছোট জীবনের একটা মিনিং খুঁজতেই এত ব্যস্ত, চিন্তারই টাইম পাইনা, আর তুমি আছো খালি হতাশ-চিন্তা নিয়া! -এইখানে একটা রাগের ইমো হবে!))

    • mahmud faisal বলেছেন:

      সবার কাছ থেকে যদি জনে জনে মাফ চেয়ে নেয়া যেতো মরার আগে!
      আমারও এটা মনে হইসে অনেক…

      আমিতো হতাশা চিন্তা করতে চাইনা আপু! যেকোন কিছু গভীর করে ভাবতে গেলেই আউলায়া যাই পুরা!😦

  8. নিশাচর বলেছেন:

    মৃত্যু মানুষের শেষ পরিণতি। সবাইকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আগে অথবা পরে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s