আজি ঝরঝর মুখর এই বাদল দিনে


সুচরিতাসু,

চিঠিটা পেয়েই বুঝি একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে ফেললে? বুঝে ফেলেছ, তাইনা? তুমি যে বুঝতে পারবা, সে আমি জানি! তাতে কী? তাই বলে বুঝি আমার লেখালেখি বন্ধ হয়ে থাকবে? সত্যিই আজকে ঝরঝর বর্ষাধারা বয়েই চলেছে প্রকৃতিতে… আর এই অপদার্থ উজবুকটা ছটফট করে বসে পড়েছে চিঠি লিখতে… মনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভূতিগুলোকে রূপ দেয়ার চেষ্টা করতে…

আরে আরে….হাসি থামাও তো!! সুস্থির হয়ে বস দেখি! আমাকে একটু বলতে তো দাও!! জানো, সকাল থেকেই আকাশ কালো হয়ে আছে জমাট মেঘে। আর আমি মনে মনে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, এই মেঘলা মেঘলা দিনে কোন গানটা যেন আমাকে অনেক উদাস করে দিত সে-ই কৈশোরে… তারপর মনে পড়ে গেলো রবিঠাকুরের সেই গানখানিঃ


আজি ঝর ঝর মুখর বাদরদিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতেই কেন মন লাগে না ।।
এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদ্ভ্রান্ত মেঘে মন চায়
মন চায় ঐ বলাকার পথখানি নিতে চিনে ।।
মেঘমল্লারে সারা দিনমান
বাজে ঝরনার গান ।
মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা- মন চায়
মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে ।।


আসলেই আমার কিছুতেই মন লাগছে না। আমাকে ধানমন্ডিতে দেখা করতে বলেছেন জুয়েল ভাই। ছোট বোন একটা কাজ করতে দিয়ে কলেজে গেছে, দুলাভাই আজই আমাকে সময় করে দেখা করতে যেতে বলেছিলেন… অথচ আমি কিনা ঘরকুনো হয়ে বসে আছি!! কারণ কি জানো? আমার যে কিছুতেই একদম মন লাগছে না!!!

এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদ্ভ্রান্ত মেঘে বলাকার পথখানি চিনে নিয়ে যদি সত্যিই উড়ে উড়ে তোমার কাছে চলে যেতে পারতাম! তবে আর তোমার পথ চেয়ে অপেক্ষা করতে হত না! তোমার কোলে চিঠিখানি ছুঁড়ে দিয়ে আমি লুকিয়ে দেখতাম কী করে চিঠিটা পড়ে তুমি হেসে কুটি কুটি হও…

সত্যি কথা কী জানো হে বরষা কন্যা? রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো, গানগুলো কেন যেন আমাকে বড্ড বেশি বেশি স্পর্শ করে… আমার অনুভূতিগুলো কি ঘুরে ফিরে ঠাকুরদা’র কবিতার মতন হয়ে গিয়েছে কিনা তা-ই বা কে জানে! ছেলেবেলায় আমার বালিশের পাশে সঞ্চয়িতা থাকত সবসময়… অদ্ভূত একটা আবেশে কেটেছিলো আমার কৈশোরটা জানো? আমি চোখভরা বিষ্ময় নিয়ে পড়তাম কবিতার পংক্তিগুলো… প্রতিদিন… প্রতিটি অবসর!!

গানটার কথা দেখেছ? মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা… মন চায় এই হৃদয় নাকি কার চিরঋণে জড়াতে… হাহাহাহহা!! না ভাই, না ভাই, আমি ভাই ঋণে জড়াইতে চাইনা… আমি ঋণী করে দিতে চাই… হুমম!!

নাহ। গান নিয়ে আর কথা বলবো না… এখন চুপ যাই। এমনিতেই এই ডিজিটাল যুগে মানুষ বইপত্র দেখলে শুধুই বিরক্ত হয়… তার উপর আমার চিঠির মতন এই বিশাল কলেবরের জিনিস হয়ত তোমাকেও “বোর” করে দিতে পারে! তুমি কেমন অদ্ভূত, বুঝো? একটা বার কোনদিন বললা না, আমার চিঠিভরা যেই বকবকানি, সেগুলো তোমার কেমন লাগে! অথচ আমি কোনসময়েই যে তোমার মন্তব্যের অপেক্ষা করিনা, তা তো না… যাক গে, হয়ত কোনদিন বলবা, হয়ত সেই একদিনের কথাতেই আমার চাওয়াখানি পূর্ণ হয়ে যাবে… হয়ত… জানিনা!

একটা কথা জানো, আমার ইদানিং মনে হয় আমি মনে হয় যন্ত্রমানব হয়ে যাচ্ছি। নতুবা কি পাষাণ হয়ে যাচ্ছি? আমাকে আর আগের মতন অনুভূতিগুলো স্পর্শ করে না। এই বৃষ্টি আর আমাকে আগের মত করে ছুঁয়ে যায় না… আমার হৃদয় অবধি যেতে পারেনা বর্ষাধারার শীতল অনুভূতিখানি…
আমি যেন তোমাকে ঠিক আগের মতন করে অনুভব করিনা… কেন এমন হয়ে যাচ্ছি বলতে পারো? বলতে পারো, আমি কেন আমার কথাগুলোকে কিছুতেই ব্যক্ত করতে পারছিনা ইদানিং… আমার ভেতর হতাশা ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু তোমার বকা খাওয়ার ভয়ে তাকে ব্যক্ত করতে পারছিনা…

অথচ আমি দিব্যি জানি, আমি ক্রমাগত বদলে চলেছি। যেই বদলে যাওয়া আমার কাম্য না। আমি বদলে যেতে চাইনা… আমি সেই আগের আবেগপ্রবণ বোকাসোকা ছেলেটাই থাকতে চাই… তোমার স্মরণে আমি বিবশ হয়ে যেতে চাই… তোমার হাসিমুখ দেখে আমি চুপটি করে বোকাবোকা হাসি দিয়ে তাকিয়ে থাকতে চাই অপলক…… আমি বড় হতে চাইনা, চাইনা বদলে যেতে!!

কত কিছুই যে চাইনা, অথচ দেখ, সবই তো হয়ে যাচ্ছি… ক্রমাগত যেন জঞ্জাল এসে ভরিয়ে দিচ্ছে জীবন কুঠুরিটা… সেই জঞ্জাল দেখতে তো খারাপ বটেই। ধরে নাও জীবনের এই জঞ্জালগুলোকে ইগনোর করে অন্যকিছুতে মন দিবো-–তা যে হবেনা! সেসব বাজে জিনিসের তীব্র দুর্গন্ধে আমি বুঝতে বাধ্য হবো– আমি ভুল করেছি জীবনে… তার খেসারত আমায় দিতেই হবে…

নাহ! এখনি লেখাটা শেষ করতে হবে। কেমন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে লেখাগুলো। আর চাইনা এসব লিখতে। কিন্তু একটা সত্যি কথা বলে শেষ করি? আমার ইদানিং মনে হয়–- আমার বুঝি আর লেখার কিছুই নেই, আমার লেখনি স্তব্ধ হয়ে যাবে একদম… নতুন অনুভূতি নেই, নেই কোন ভালোবাসা আর ভালোলাগাদের দল…

আমার মনে হয় আর তোমাকে লেখা হবেনা গো “সুহাসিনী” !
অনেক অনেক ভালো থেকো, হুমম? আর আমাকে দোয়া দিয়ো একটু প্লীজ।
তুমি তো জানো, আমি একটু প্রশান্তিই চাই এই জীবনে। অর্থ-বিত্তের প্রাচুর্য নয়… শুধু নির্ঝঞ্ঝাট একটা জীবন… দোয়া করিও মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে। আমি সুখের স্পর্শ পাবই ইনশাআল্লাহ দেখে নিয়ো…
এই জীবনে না পাই, অনন্ত জগতে আমার সুখ হবেই।

— শেষান্তে
পথহারা পথিক

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in চিঠি, ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

আজি ঝরঝর মুখর এই বাদল দিনে-এ 19টি মন্তব্য হয়েছে

  1. শাহরিনা বলেছেন:

    আহা! কাহার জন্য এই পত্রখানি! তাহাকে দেখিতে মন চায়! :))

    খারাপ লাগেনি। গুড ওয়ান। যা হোক, ব্লগটা চেক কইরো, নতুন করে সাজাইসি।😀

    • mahmud faisal বলেছেন:

      আমারো যে বড্ড দেখিতে মন চায়!! কী করা যায় বল দেখি!😉
      থেঙ্কু।
      যা হোক, ব্লগ চেক সেইদিনেই করেছি। দেখেছি নতুন টেমপ্লেট, নতুন লেখা। কিন্তু আলসেমির চোটে কমেন্ট হয় নাই। যেইদিন কর্মঠ হইব সেইদিন কমেন্ট পাবি, বুঝসিস?

  2. তাপস বলেছেন:

    জানিনা সুহাসিনী কল্পলোকের বাসিন্দা না বাস্তবের তবে এইটুকু বুঝেছি- সে বড় নিষ্ঠুর।

  3. rongtuli বলেছেন:

    ” তোমার হাসিমুখ দেখে আমি চুপটি করে বোকাবোকা হাসি দিয়ে তাকিয়ে থাকতে চাই… “- তোমার বোকাবোকা হাসিটার মাঝে যেন কখনো যেন ব্যাঘাত না আসে, এই আশায় করছি ভাইয়া।

  4. নিবিড় বলেছেন:

    খ্যাক, খ্যাক, খ্যাক…হাসিটার অর্থ আপনি জানেন স্যার 😀

  5. farjana বলেছেন:

    Jotttttilllllllllllllllllllllll fatafati!!!!

  6. Saiful ISlam Chowdhury বলেছেন:

    Really Nice…Just I like this…🙂

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s