সেই কঠিন হৃদয় মানুষটির অনন্তের পথে যাত্রা


জ আমার কিছু কথা বলার আছে। জানিনা ঠিক কীভাবে শুরু করব। দেখি, বলতে থাকি। হয়ত সঠিক একটা প্রবর্তনা এসে পড়তে পারে। এসে পড়তে পারে একটা ধারা। আসলে, আমি যেই মানুষটির স্মরণে লিখতে বসেছি তিনি নিঃসন্দেহে আরও অনেকেরই স্মৃতিতে জুড়ে আছেন। তবে এইটা ঠিক, আমার এই স্মৃতিচারণের সাথে যেমনি কিছু আনন্দের কথা জুড়ে আছে, তেমনি জুড়ে আছে কিছু দুঃখময় অনুভূতি।

২০০০ সাল। তখন আমরা ক্লাস এইটে পড়ি। হঠাৎ একদিন শুনলাম আমাদের প্রিন্সিপাল স্যার এর ফেয়ারওয়েল হবে। বর্তমানে যিনি ভিপি আছেন, তিনিই হবেন আমাদের আগামী প্রিন্সিপাল। যথারীতি সেই আসনে অধিষ্ঠিত হলেন জনাব ফায়জুল হাসান, যিনি ‘পটুয়া’ কামরুল হাসান-এর সহোদর। তাকে সহযোগিতার নিমিত্তে অতি অল্প ক’দিনের মাঝেই হাজির হলেন একজন মানুষ যার নাম — প্রসন্ন কুমার পাল। দৈর্ঘ্যে অনধিক সাড়ে পাঁচ ফুটের এই ভাইস প্রিন্সিপাল বেশ হাল্কা পাতলা দেহবিশিষ্ট ছিলেন। কিন্তু তার চলাফেরায় ছিল প্রবল আত্মাবিশ্বাসের ছাপ। তিনি একজন স্বল্পভাষী এবং সদাগম্ভীর ব্যক্তিত্ব।

এই মানুষটিকে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ-এর আমাদের ব্যাচ পেয়েছিলাম ক্লাস ইলেভেন অবধি। আমাদের ব্যাচটি শৃঙ্খলার ব্যাপারে ছিলাম দারুণ বিখ্যাত, (কুখ্যাত বললাম না, যদি ব্যাচমেটরা ধরে মার দেয় সেই ভয়ে !!) সেই সূত্রে ভিপি হিসেবে থাকা মানুষটি শৃঙ্খলা রক্ষার ভার সহকর্মীদের উপর ন্যস্ত করেই ক্ষান্ত থাকতে পারতেন না। তাই সময়ে অসময়ে আমাদের সাথে তার সাক্ষাৎ হত। হয়ত ক্লাসরুমে আরেফীন আর হোসেন এর ঝগড়া চলছে… দারুণ বাকপটু এবং পরাজয় স্বীকারে চির-অসম্মত এই দু’জন ঝগড়া করলে তা সবার জন্য নির্মল বিনোদন এর ব্যাপার হত– সুতরাং হৈ-হল্লাও হতো সেই রকম ! এই রকম এক মূহুর্তে অবধারিতভাবে হাজির হতেন পি,কে,পাল স্যার।
“হুমম…হুমম…বয়েজ, কী ব্যাপার?”
বজ্রকন্ঠের গুরুগম্ভীর আওয়াজ শুনে পড়িমড়ি করে সবাই নিজ নিজ ডেস্ক এর দিকে ছুটে যেতাম। কিন্তু শুধু কিছু উপদেশ দিয়েই এই মানুষটি চলে যেতেন…
আমরা যারপরনাই আনন্দিত হতাম। চারিদিকে যখন দৈহিক আর মানসিক অত্যাচার প্রতি মূহুর্তে, তখন সদুপদেশ জিনিষটা আমাদের কাছে জান্নাতের “মান্না-সালওয়া” বলে মনে হতো! হয়ত রাতের সেই প্রেপ এর পরেই অপেক্ষা করছে ক্লাস ইলেভেন আয়োজিত “স্পেশাল ডোজ ফর ক্লাস এইট”। অথবা হয়ত নির্ধারিত রয়েছে হাউস প্রিফেক্ট-এর রুম এর সামনে ফল ইন…… আর সেই বিখ্যাত লাঠির বাড়ি আমাদের পশ্চাদ্দেশে ভূপাতিত হওয়া … ইইহহ !! সেই তুলনায় এই জাতীয় নির্ভেজাল উপদেশ বড়ই উপাদেয় ছিল বৈকি!!

আমার মনে পড়ে, যখন এস,এস,সি পরীক্ষার আগে চরম খারাপ অবস্থা প্রিপারেশন-এর, তখন প্রেপে এসে স্যার অসম্ভব সুন্দর কিছু কথা বলে প্রেরণা দিতেন, স্বপ্ন দেখাতেন! আর কারও কথা জানিনা, আমি তার প্রেষণায় অসম্ভব প্রভাবিত হয়েছিলাম।
মানুষটার হাসি ছিল দুষ্প্রাপ্য। তার মুখের কোণে হাসি দেখতে আমাদের তিনটি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ২০০৩ সালের পিকনিক আয়োজিত হয়েছিল পাবনার টেবুনিয়ায়, সেইদিন তার সদাগম্ভীর মুখটিতে প্রথমবারের মতো হাসি দেখেছিলাম। যতদূর মনে পড়ে তখনকার সবগুলো ব্যাচের ক্যাডেটরা খুব খুশি হয়েছিলাম সেই হাসিমুখ দেখে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এক সুযোগে কলেজ প্রিফেক্ট আহসান ভাই স্যারকে প্রশ্ন করেছিলেন, “স্যার, আপনার নাম প্রসন্ন কুমার পাল হলেও আপনার মুখে আমরা প্রসন্ন হাসি দেখিনা কেন?” তিনি জবাবে গল্প শুনিয়েছিলেন একটা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের আপন প্রায় সবাইকে হারিয়েছিলেন; হারিয়েছিলেন আপন ৪ জন ভাইকে সহ ১৮ জনকে– সেই গল্প। এই ঘটনার পর থেকেই হয়ত তার জীবনে হাসি খুব কম এসেছে…
আরও একবার তার হাসি দেখেছিলাম আমাদের একাদশ শ্রেণীতে করা উপহার রজনীতে যখন মুশফিক আর ইমতিয়াজ তাদের নাটক মঞ্চস্থ করছিলো। অসাধারণ হাস্যরসাত্নক সেই অভিনয় দেখে মিলনায়তনে উপস্থিত প্রত্যেকটি মানুষ যখন হাসিতে লুটিয়ে পড়ছিলো, তখন স্যারকেও আমরা হাসতে দেখে বুঝেছিলাম নাটকটি সত্যিই দারুণ হয়েছে।

চাকুরীতে পরিবর্তনের স্রোতধারায় এই মানুষটি আমাদের কলেজ ছেড়ে স্থানান্তুরিত হন রংপুর ক্যাডেট কলেজে। পেছনে রেখে যান আমাদের মতো কিছু ছাত্র যারা আজও স্মরণ করি তাকে হৃদয় ভরে। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। জেনেছিলাম তিনি সিসিআর এর এ্যাকটিং প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। একদিন হঠাৎ শুনলাম পি,কে,পাল স্যার আত্নহত্যা করেছেন। প্রবল অবিশ্বাস নিয়ে ফোন করলাম একজন স্যারকে, যিনি সিসিআর-এ কর্মরত। তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেন। স্তব্ধ, হতবিহব্বল হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন সকালে পিটিতে যাননি তিনি, অফিস টাইম হয়ে যাওয়া সত্বেও তার খবর নেই দেখে দরজা ধাক্কায় গার্ড। সাড়া না পেয়ে অবশেষে জানালা দিয়ে দেখতে পায় তিনি সিলিংয়ের সাথে রশি বেঁধে ঝুলছেন। অমন ইস্পাত কঠিন মানুষটা কোন এক অজানা দুঃখ বুকে করে সবার সাথে অভিমান করে চলে গেছেন অজানার পথে। আর কোনদিন তার মুখ থেকে উচ্চারিত হবেনা –“হুমম…হুমম…বয়েজ, কী ব্যাপার……”
আমার খুব কষ্ট হয় যখন মনে করি তাকে কোনদিন বলতেও পারব না– স্যার আপনি যে প্রকৃত মানুষ হতে বলতেন, তার জন্য আজও চেষ্টা করে চলেছি…

শুনেছিলাম স্যারের এক ছেলে আরসিসির ক্যাডেট ছিলেন। পারিবারিক জীবনে তার কোন অশান্তির কথা শুনিনি কোনদিন, অন্য স্যাররাও কিছু বলতে পারেননি তার আত্নহননের সম্ভাব্য কোন কারণ সম্পর্কে। অজানাই থেকে গেছে সারাজীবন অনেক বড় আঘাত সামলে চলা মানুষটি কর্মজীবনের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে, শেষ বয়সে তিনি কেন স্বেচ্ছায় আত্নহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

যা-ই হোক না কেন, তার জন্য আমার হৃদয়ের গভীর থেকে অনেক অনেক শ্রদ্ধা, আর অন্তহীন শুভকামনা…

আমার একটা পোস্টে রংপুর ক্যাডেট কলেজের সাবেক কলেজ প্রিফেক্ট ফয়েজ ভাইয়ের মন্তব্যটি তুলে দিলাম। তাঁর কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম আরো কিছু তথ্য…… বেদনানীল, মর্মন্তুদ…

স্যার কে আমরাও পেয়েছিলাম ‘৮৭ – ‘৮৮ সালে। ‘৮৮ তে বদলী হয়ে যান তিনি। মেন্ডেলের জ্বীন তত্ত্ব স্যারের কাছে প্রথম শুনি, “বাবা কালো, মা কালো, মেয়ে কেন ফর্সা হল” কবিতার ছন্দে শিখিয়েছিলেন। আমাদের এস, এস, সি পরীক্ষার এক্সটার্নাল হয়ে এসেছিলেন আবার, সেই স্যার কে শেষ দেখা।
স্যারকে তোমরা সবাই গম্ভীর বলছ, অথচ আমার ওনার হাসিখুশি চেহারাই মনে ভাসে। সিনিয়র দের নিয়ে অনেক মজার মজার কৌতুক ছিল উনার, এগুলো পরে আমরা যখন রি-ইউনিয়নে শুনি, খুব মজা পেয়েছিলাম।
যতদূর শুনেছি ‘৭১ এর যেইদিন তাদের পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা হয়, প্রতি বছর সেইদিন তিনি খুব কষ্টে কাটাতেন, তিনি মারা গেছেন সেইদিন রাতেই, যতটুকু শুনেছি। আর তিনি একাই ছিলেন সেই রাতে বাসায়।
স্যারের আত্মা শান্তিতে থাকুক।


আমি তার মৃত্যু সম্পর্কে আর বেশি কিছু জানতে পারিনি, চাইনি… আমার লেখায় কোন ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমাপ্রার্থী। কেননা এটা শুধুমাত্র আমার একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ…

(রচনাকালঃ ০১ এপ্রিল, ২০০৯)

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

সেই কঠিন হৃদয় মানুষটির অনন্তের পথে যাত্রা-এ 2টি মন্তব্য হয়েছে

  1. akashlina বলেছেন:

    ওনার আত্না শান্তিতে থাকুক-এই দোয়াই করছি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s