বড় আক্ষেপ হয়

কাল বিকেল থেকে একটা বিষণ্ণতা কাজ করছিল। এইটার কারণ আমি জানিনা। এইরকম মাঝে মাঝে হয় আমার, একটু বেশী একাকীত্বতে ভুগি বলে। এই বিষণ্ণতার কোন কিনারা করতে পারিনি। বিমল মিত্রের “কড়ি দিয়ে কিনলাম”-এ নাক ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভোরে উঠেই ফজরের পর অভ্যাসানুযায়ী ব্লগে ঢুকে পেলাম তুহিনের খবর। মনটা তিক্ততায়, বেদনায় ভরে গেল। শুধু দোয়া পড়ছিলাম আর একটু পর পর আপডেট পড়ছিলাম। যখন জ্ঞান ফেরার খবর পেলাম, তখনই কেবল একটু আশ্বস্ত হলাম।

আজ সারাদিন এইরকম কেটেছে। মহানগরী ঢাকা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি শিক্ষার্জনের জন্য। আমার বন্ধুরা সবাই যখন ডিএমসি হাসপাতালে অপেক্ষা করছিল খুব কাছের হাসিখুশি বন্ধুটার ব্যাপারে অপারেশন থিয়েটার থেকে সুখবর শোনার আশায়–তখন আমার সেইরকম কিছু করার ছিলো না। শুধু একটু পর পর আপডেট দেখা আর দোয়া করা ছাড়া। কী এক ভয়ংকর মূহুর্তের মুখোমুখি হয়েছিল আমাদের বন্ধুটি– তা ভাবার মত যোগ্যতাও আমার নেই! আল্লাহ তুহিনকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন এই দোয়াই করি।

সবকিছু কেমন যেন অর্থহীন লাগে। তুহিন যখন বাসা থেকে বের হয়েছিল, তখনও তো সে জানতো না ওর ঠিকানা হয়ত হাসপাতালের বেড হতে যাচ্ছে। যেই অমানুষেরা ছুরি চালিয়েছিল, তাদের হয়ত মনেও হয়নি কোনদিন তারা কী করতে যাচ্ছে। কী অদ্ভূত মানুষের মন! আমরা কেউ কেউ অন্য কাউকে একটু কড়া গলায় কথা বললেই আফসোসে ডুবে যাই। কিন্তু ওই মানুষরুপী পশুগুলোর হাতে কখনো বাধে না একজন নিষ্পাপ মানুষকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিতেও। বিনিময়ে তার একবেলা নেশার যোগান হবে কিনা তা-ও অনিশ্চিত। হায়রে মানুষ! হায়রে বিবেক!

কীসের পিছনে ছুটে চলেছি আমরা? সারাজীবন অন্যের উপকারে জীবন বিলিয়ে দিয়ে আমাদের মরতে হয় অপমৃত্যুতে। মনুষ্যত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সর্বত্রই যেন চলছে নগ্ন স্বার্থোৎসব। কেউ চাইছে পাঁচ হাজার টাকা, কেউ পঞ্চাশ হাজার টাকা, কেউ চিন্তা করছে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার, কেউ ভাবছে পঞ্চাশ কোটি টাকা… সবাই ওই ভাবছে–অর্থ অর্থ অর্থ।

ধর্মপ্রেরণাহীন মানুষগুলো স্বল্প পরিসরের এই জীবনের ভোগসামগ্রী অর্জনের জন্য মরিয়া হয়ে যাই– ওষুধে ঢুকাই ভেজাল দ্রব্য, খাবারে দেই ভেজাল। প্রতিটি সামগ্রীতে ভেজালে সয়লাব। কেননা, তাতে একটু লাভ! বাড়তি লাভ মানেই বাড়তি আয়! আর বাড়তি আয়ের ফলে আছে বাড়তি আয়েশ!! আমার “চাই চাই” ভাবনার লাগাম ধর্মচিন্তা ব্যতীত আর কোনভাবে কি আমি দিতে পারি? আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে কুলায় না। অনাগত অনন্তকালের চিন্তা মানুষের মাঝে কাজ করলে হয়ত আমরা ছাড় দিয়েই চলবো… যারা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন–তারা কোথায় আছেন, কীভাবে আছেন– এইসব মনে হলে আর ভালো লাগেনা। খুব মনে হয়– কীসের পিছনে ছুটছি? কী পাওয়ার আশায়? ক’দিন ধরে রাখতে পারবো?

অর্থ– পৃথিবীর বুকে যোগ্যতার একমাত্র মানদন্ড…
আমি ঠিক জানি, যদি নিজের জীবনে আমিও ওই টাকার স্লোগান বুকে-মুখে ধারণ না করি; আমি হয়ত রিক্ত হয়ে থাকবো। যখন আমার গ্রহণযোগ্যতা হবে সবার কাছে ‘শূণ্য’ পর্যায়ের। এইটাকে এড়িয়ে চলতে হলে আমাকে বদলে যেতে হবে। সেই আমি আর এই আমি থাকবো না।

নিজেকে নিয়ে বলা নয়— আমি ভাবছিলাম গোটা সমাজে, পৃথিবীতে এইরকমটাই চলছে। শুধু আত্মচিন্তা। শুধু আমি কী পেলাম, কী পেলাম না। তাইতো গোটা জাতিকে বোমার আঘাতে জর্জরিত করে দিয়ে তার কাছ থেকে জ্বালানী নিতে বাধে না। আমার স্বার্থসিদ্ধি হবে বলে পুরো তরুণ সমাজকে নীতিবোধশূণ্যতার পথে সুযোগ দিতে আটাকায় না বুকে। কখনও হয়ত আমরা ভাবি না, আমার এই কাজটি আর কতগুলো মানুষকে উৎসাহী করবে আরেকটি ক্ষতিকর কাজে জড়িয়ে পড়তে।

কবে আমরা বুদ্ধিমান বাংলাদেশী হবো?
কবে হবো একজন এমন মানুষ– যার সান্নিধ্যে অন্যেরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে।
কবে এমন জাতি হবো যেদিন আমাদের নারীরা নির্ভাবনায় পথ চলতে পারবেন, লোকে নির্ভেজাল খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাবেন– ফুড পয়জনিং এর খপ্পরে পড়বেন না…
কবে আমরা সঠিক ওজনের পণ্য দেব– মজুতদারী না করে…… আমরা কবে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের নকল না বানিয়ে মানুষে উপকারার্থে চলে এমন কিছু নিয়ে জীবিকার কাজে লাগবো?

কবে হবো সত্যিকার একজন “মানুষ”?
কবে হবে সেইরকম একটা জাতি? মৃত্যু চলে এলেও কি কোন পরিবর্তন দেখতে পাবো না?? কোনদিনই কি এইরকম কিছু হবে না??

(রচনাকালঃ ১৩ জুন, ২০০৯)
*আমার দারুণ মন খারাপ অবস্থায় বিব্রত- বিচ্ছিন্ন মনের স্বরুপ এই লেখা।

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

বড় আক্ষেপ হয়-এ একটি মন্তব্য হয়েছে

  1. shetu বলেছেন:

    কবে হবো সত্যিকার একজন “মানুষ”?
    কবে হবে সেইরকম একটা জাতি? মৃত্যু চলে এলেও কি কোন পরিবর্তন দেখতে পাবো না?? কোনদিনই কি এইরকম কিছু হবে না??
    খুব গভীর কিছু আবেদন…চিরন্তন কিছু প্রশ্ন…ছোয়া যায়না,কিন্তু অনুভব করা যায়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s