মেঘলা দিনের কথন

জ অনেকদিন পর ঝাড়া নিরবচ্ছিন্ন, আর পরিপূর্ণ একটা ছুটির দিন পাওয়া গেলো। কোন কাজ নেই, কোন চাপ নেই, কোন দায়িত্ব নেই। আসলে ব্যস্ত সময়ের মাঝে না থাকলে অবসরের মর্যাদা বোঝা যায় না, সেই সত্য আবার নতুন করে উপলব্ধি করলাম আমি। জুলাইয়ের শুরু থেকেই টার্মের শেষের কুইজের ঝাঁক, একটানা পরীক্ষা, তারপর দশদিনের ছুটির পর আবার থিসিসের উপর একটা প্রোগ্রেস ডিফেন্স– এসবগুলোকে শুধু পার করতেই দেখি দু’মাস কেটে গেছে… মাঝে অল্প ক’দিন ব্লগ থেকে দূরে ছিলাম। তারপর ঠিকই কিছু লেখা পড়েছি, কমেন্ট করেছি, শুধু নিজে থেকে লেখাটা হয়নি।

কাল প্রোগ্রেস ডিফেন্স এর প্রেজেন্টেশন দিলাম। এই জিনিসটা বেশ ভালো লাগে। কাল আমার অনেক কথা মনে হয়ে গেলো যখন সমস্ত স্যার-ম্যাডাম, রুমভর্তি ছেলেমেয়েদের সামনে আমার থিসিসের প্রোগ্রেস নিয়ে কথা বলতে যাওয়ায় অনেক কথা মনে পড়লো প্রথম যেদিন স্টেজে উঠি ক্যাডেট কলেজে সেদিন আমি ইংরেজি বিতর্ক করতে উঠেছিলাম, সেদিনের কথা। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছিল, শব্দ আটকে গিয়েছিল মুখে মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে। এরপর দু’বছর পর ফিরেছিলাম আবার, এবার ইংরেজি কবিতা আবৃত্তিতে প্রথম হয়ে। তখন প্রতিযোগিতার আগে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যেত, পা কাঁপত স্টেজে মাইক্রোফোন সামনে নিয়ে বলার সময় … সেই ভয় কেটে গিয়েছিল ইলেভেনে থাকতে থাকতেই। সৌভাগ্যক্রমে অনেকবারই উঠেছিলাম ওই স্টেজটিতে। ক্লাস টুয়েলভের প্রতিযোগিতার সময়ে আমার এগুলো যেন কিছু মনেই হতনা, এমনকি আন্তঃক্যাডেট কলেজ সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় এতসব মানুষ আর বড় বড় বিচারকদের সামনেও হয়নি। আমার ব্যক্তিজীবনে এইটা অনেক বড় পাওয়া….. আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি আরেকবার।

এরপর দীর্ঘদিন পর, সাড়ে চার বছর পর একটানা তিনটা প্রেজেন্টেশন দিতে উঠলাম কারিকুলাম অনুযায়ী। উপলব্ধি করলাম আমার ক্যাডেট কলেজের অবদান, কৃতজ্ঞতাবোধে আরেকবার নিমজ্জিত হলাম। মনে আছে রিজওয়ান ভাই, আজিজ ভাই, সাঈদ ভাই, রওনক, মুসলেহদেরকে যতবার স্টেজ কাঁপিয়ে পারফর্ম করতে দেখতাম, ততবার মনে হত, “ইশশ, আমি যদি পারতাম!!” তাদের মতন পারিনা, তবে অন্যরকম একটু একটু পারি।

গতকাল থিসিস প্রেজেন্টেশন শেষে ডিপার্টমেন্টের হেড স্যার কথা বলছিলেন, যার সারকথা এরকম– আর অল্প ক’টা মাস তোমরা আছ এখানে, থিসিসের কাজে মনোযোগী হও, সুন্দরভাবে শেষ করো এই জীবনটা। এরপর তো তোমরা চলে যাবা কর্মজীবনে, সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের অভিজ্ঞতা যেখানে অপেক্ষা করছ…

আরেকটা বিদায়ের গন্ধ পেলাম। আরেকবার ভারাক্রান্ত হলাম। আরেকটু উদাস হলাম। সাড়ে তিন বছর অচেনা অজানা এই ক্যাম্পাসটা বড় আপন হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে হলের সবচাইতে আনন্দের বিষয় আমার মনে হয়েছে, অন্তহীন স্বাধীনতা। শুধু নৈতিক বাধা ছাড়া আর কোন বাধা নাই যেখানে… কোন সময়ের ফ্রেম নাই। নির্ঘুম রাত, একটানা ১৫-১৬ ঘন্টা ঘুম, মাঝরাতে ফুটবল নিয়ে খেলতে নেমে পড়া, মাঝরাতে পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে বন্ধুদের ঝাঁপাঝাপি করে গোসল করার দৃশ্য… বৃষ্টি হলেই বল নিয়ে মাঠে চলে যাওয়া…বৃষ্টিতে মাঠের সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে আকাশে পানে তাকিয়ে থাকা…সন্ধ্যায় মাঠে সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে রাতে তারাদের জ্বলতে দেখে রুমে ফেরা…… হলে না থেকে বাসায় কোনদিন কি এই অবারিত স্বাধীনতা আর আনন্দ পাওয়া যেত! কত সৌভাগ্যই না পেয়েছি! আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতাবোধে নতজানু হয়ে পড়ি সহসাই।

আজ আকাশটা মেঘলা মেঘলা। বিষণ্ণ প্রকৃতি, বিষণ্ণ মানব মন। তবু আমার অসম্ভব প্রিয় এই আবহাওয়া। মনে কেমন যেন অদ্ভূত ভালোলাগায় ভরে যায়। কখনও হয়ত বিমর্ষও হয়ে পড়ি, কিছু পাওয়া না-পাওয়ার হিসেব যখন আমাকে আক্রান্ত করে ফেলে… কিন্তু ভেবে দেখলাম, আমার জীবনের যখনই লিখতে বসেছি কোন অনুভূতির তীব্রতায়, অর্ধেকেরও বেশি সময় ছিল এই মেঘলা দিন!

আমি হয়ত মেঘলা দিনকেই ভালোবাসি। একে তো ভালোবাসাই বলে… তার উপর যোগ হয়েছে একটা গান। গানটি গত দুই ঘণ্টা ধরে শুনছি মৃদু ভলিউমে, যখন থেকেই লিখতে বসেছি। কেন যেন ভালো লেগে গেলো। দু’ঘন্টা থেকে লিখছি, বারবার কাটাকুটি করছি, শব্দ পছন্দ হচ্ছেনা প্রায় ক্ষেত্রেই। যা বলতে চাচ্ছি, তা যেন পরিপূর্ণভাবে বলতে পারছিনা…… তার উপর নিচের লাইনগুলো একদম ভাসিয়ে দিচ্ছে অনুভূতিদের মেঘের সাথে… ভেসে চলেছি নিঃসঙ্গ মেঘেদের সাথে…… কার কণ্ঠ কার লেখা, জানিনা…… কী দরকার… ভেসে যেতে থাকি……

কেন চলে গেলে দূরে
ভাসায় মোরে সুরে
কেন ফিরে এলে আবার
বাড়াতে দুখের ভার…
—-
যাক না জীবন যাচ্ছে যখন
নির্ভাবনায় নাটাই হাতে
ইচ্ছে যেমন মেঘ আকাশে
ভাসাবো না চোখটা ছুঁয়ে……

কেউ জীবন থেকে চলে যাক কি না যাক, সে ফিরে আসুক, বা না আসুক… আমার দুখের ভার যেন বেড়ে যেতে থাকে… আমার না পাওয়ার হঠাৎ করে যেন চেপে বসছে… বিষণ্ণতা গ্রাস করে নিচ্ছে অনুভূতিদের……… যাক না জীবন যাচ্ছে যখন নির্ভাবনায় নাটাই হাতে……

(অনেকদিন পর লিখলাম। এমনিতেই লিখতে পারিনা, তার উপর এলোমেলো কথা দিয়ে গাঁথা দিনলিপির মালা)

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

মেঘলা দিনের কথন-এ 6টি মন্তব্য হয়েছে

  1. অজানা বলেছেন:

    অসাধারণ ভাল লেগেছে আপনার এই লিখাটি। আপনার মেঘলা দিনের এলোমেলো কথাগুলো আমার মনটাকে ভালো লাগায় ভরে দিয়েছে। গানের লাইনকটি আসলেই সুন্দর… ধন্যবাদ আপনাকে।

    • Mahmud বলেছেন:

      আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ অজানা…
      এরকমভাবে ‘অজানা’ কেউ এসে আমার লেখা পড়ে ভালোলাগার স্পর্শ পেলে, সেইটা আমার জন্য পরম এক উৎসাহ।
      ধন্যবাদ। পড়তে আর লিখতে থাকুন…

  2. Muntasir বলেছেন:

    ভাই
    পড়ে ভাল লাগলো। এই অপূর্ব লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।

  3. jajaborrr বলেছেন:

    সব সময়’ই একসময় অতীত হয়ে যায়। কী আর করা……

    গানটার কথাগুলো তো বেশ সুন্দর, আমাকে সেন্ড করে দিবেন প্লীজ?

    • Mahmud বলেছেন:

      গানের পুরোটা যেদিনই পাবো, পাঠিয়ে দিবো আশা করি…
      আমি কিন্তু আপনার মতন এতটা সুন্দর করে লিখতে পারিনা। যেদিন দারুণ মন খারাপ করা লেখা লিখতে পারবো, সেদিন আপনাকে সবার আগে চোখ ভেজাতে হবে দেখবেন….

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s