একদিন বৃষ্টিভেজা দিন



আজ ঘুম থেকে উঠেই দেখি চারপাশ অন্ধকার, আকাশ ঘনকালো মেঘে ঢাকা। একটানা অনেকদিন দুঃসহ গরমের পর বর্ষার আগমন মনে অনেক স্বস্তি আর আনন্দ নিয়ে আসে। গতকালকের মতন উষ্ণ দিনের পর আজকের আবহাওয়াটা খুব স্বস্তিকর। মন চাইছিল আরেকটু কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে। যদি বাসায় এসময় থাকতাম, আর মা যদি একপ্লেট খিচুড়ি আর আচার আমার সামনে নিয়ে আসতেন! উফফ! কী দারুণ হত সেইটা!

কিন্তু এই সুন্দর বর্ষাকে উপভোগ করার কোন উপায় আজ নেই। কাল বাদ আগামী পরশু আমার “অটোম্যাটা থিওরি” পরীক্ষা। আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জীবনে সবচাইতে কঠিনতম বিষয় বলে অনুভূত হচ্ছে। মনে কতরকম ইচ্ছে হয় এই বর্ষাধারার অবিরল বর্ষণ দেখলে… কিন্তু তাদের ধামাচাপা দিয়ে এতক্ষণ অবধি নিরতিশয় বোরিং, ক্লান্তিকর কিছু গাণিতিক থিওরি নিয়ে বসে থাকলাম। এখন প্রায় পৌনে বারটা বাজে। কিন্তু দিব্যি সূয্যিমামা লুকিয়ে আছেন মেঘের আড়ালে। হলের সামনের গাছগুলো দেখা যায় আমার বিছানা থেকে। এক সারিতে অনেকগুলো সবুজ গাছ, বৃষ্টিতে ভিজে নিষ্কলুষ পবিত্রতার একটা প্রতিমূর্তি হিসেবে প্রকাশ পাচ্ছে। গাছের পাতাগুলো কতটা সবুজ, তা স্বাভাবিক সময়ে বোঝার কোন অবকাশ পাইনা। টকটকে সবুজ পাতাগুলো দেখে এখন সেরকমই মনে হচ্ছে। আমার বিছানাটা জানালার পাশেই– বৃষ্টির ছাট এসে মুখে পড়ছিল, আর তাতেই আমার ঘুমটা ভেঙে গেল… কী অসম্ভব সুন্দর সেই অনুভূতি! সে হয়ত ভাষায় প্রকাশ করা যায়না… বুঝতে হলে এরকম করেই অনুভব করতে হয়!

বিছানায় শুয়ে অনুভব করছিলাম মুখে বৃষ্টির ছাঁট, কানে ঝমঝম শব্দ ভেসে আসা… চোখের কোণ দিয়ে জানলা দিয়ে সবুজ গাছের পাতা আর তার উপর সুবিস্তৃত আকাশ… মৃদু ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় কাঁথাটা পায়ের কাছ থেকে নিয়ে গায়ে মুড়ি দিয়ে শুয়ে রইলাম কিছুক্ষণ… ভাবছিলাম মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কী সুন্দর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন… এই প্রকৃতি কত না সুন্দর। কৃতজ্ঞতা বোধে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে বিছানা ছাড়লাম।

একটানা কিছুক্ষণ পড়ার পর মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। কেনি রজার্সের ভরাট গলায় Lady, I’m your knight in shining armor and I love you…. গানটি শুনলে ঠিক এরকম অনুভূতি হয় কিনা জানিনা… কিন্তু বুকের ভিতরটায় কেমন যেন মৃদু কম্পন, একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। এইটাকে ভাষায় প্রকাশ করার যোগ্যতা আমার নাই। এসব অনুভূতিদের মাঝে আর পড়তে ইচ্ছে করছে না দেখে ভাবলাম লিখতে বসে যাই। বর্ষা আমার জীবনে অনেক প্রভাব নিয়ে আসে। এর আগে আরেকদিন এরকম উদাস হয়ে কিছু লিখে ফেলেছিলাম…

একটা কবিতার চরণ মনে পড়ছে খুব। পাঠ্য বইতে পড়েছিলাম কবি ‘জসীমউদ্দীন’-এর কবিতাঃ

আজিকে বাহির শুধু ক্রন্দণ ছলছল জলধারে
বেণু বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে

আজ বর্ষাধারা দেখে উদাস-উতল মনে কারো কথা খুব মনে পড়ছে। এইটা আসলে আমার মনের কল্পনা, হয়ত মনের চাওয়া মানুষটা কাছে থাকলে সেইটা খুব বেশি আনন্দকর কিছু হত না! কল্পনাপ্রবণ, অনুভূতিপ্রবণ মন আমাকে প্ররোচিত করছে…
আবার পরক্ষণে মনে অন্যরকম একটা ভাবনার উদয় হচ্ছে। একটা গান শুনেছিলাম কোন এক সুললিত কণ্ঠের নারী শিল্পীর গাওয়া। গানটি জানিনা কেন যেন আমার হৃদয়ের একদম ভিতরে নাড়া নিয়ে যেতঃ

কবিতায় বলেছিলে
চন্দ্ররাতে তুমি আসবে কাছে
এরপর কেটে গেছে
কতনা ভরা পূর্ণিমা।

স্বপ্নে পেয়ে বলেছিলে
বৃষ্টি হলে আসবে কাছে
এরপর বয়ে গেছে
কতনা বরষাধারা।

বলেছিলে এক নদী দুঃখ হলে
ভালোবাসবে এই আমাকে
চেয়ে দেখ এই বুকে আজ
কত শত নীল বেদনা……

হৃদয়ের ভিতরটা কেমন যেন আনচান করে উঠছে। হয়ত এই অনুভূতিগুলোকে বেশিক্ষণ প্রশ্রয় দিলে চোখে অশ্রুফোঁটা এসে পড়তে তেমন বিলম্ব হবেনা। জগতের নিয়মগুলোকে খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে কেন যে এত বেগ পেতে হয়!

কেন যে মনের স্বপ্ন-চাওয়া আর্তিগুলো আজীবন অধরাই থেকে যায়!

* *

০৫ আগস্ট ২০০৯
রুম : ২০২, ফজলুল হক হল
কুয়েট, খুলনা

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in ব্লগর ব্লগর. Bookmark the permalink.

একদিন বৃষ্টিভেজা দিন-এ 4টি মন্তব্য হয়েছে

  1. akashlina বলেছেন:

    হুম…শুধু মন খারাপ না?

  2. akashlina বলেছেন:

    ” আজিকে বাহির শুধু ক্রন্দণ ছলছল জলধারে
    বেণু বনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ, মন যেন চায় কারে”—–লাইন গুলো স্কুল জীবনের কথা মনে করিয়ে দিল।স্যার কবিতাটা যা দারুণ করে পড়াত না!

    • mahmud faisal বলেছেন:

      আমার তো সেই সুন্দর সময়গুলোর কথা মনে পড়ে বলেই এখানে উল্লেখ করেছি!
      আহা !! কী সুন্দর দিনগুলোই না ছিলো!!🙂

      ((((( গালে হাত দিয়ে উদাস হয়ে গেলাম )))))

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s