হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ৩

রচনাকালঃ ০২ জুন, ২০০৯

letter3


আনন্দ আনন্দ,
কী খবর তোমার? এত্ত অস্থির হয়ে যাও কেন চিঠির উত্তর না পেলে? সুযোগ পেলেই যে তোমাকে লিখব তা তো তুমি জানোই। আমি তো সুস্থই আছি, আলহামদুলিল্লাহ কোন সমস্যা নাই।
বোকা ছেলে, জীবন কি আর আগের মতো আছে? জীবন আমারও অনেক বদলে গেছে, যেমনি বদলেছে তোমার… সুতরাং, চাইলেও অনেক কিছু করা হয়ে ওঠেনা আগের মতন…

আজ আমি কোন পচা কথা বলব না কিন্তু, আজ আমার মনটা হঠাৎ উদাস হয়ে আছে। আজ আমি শুধু স্মৃতিচারণ করব বুঝেছ? আমি তো ওই স্মৃতি নিয়েই বেঁচে আছি… ওটাই তো আমার হৃদস্পন্দন ধারণ করে আছে বুঝোনা? আমার বর্তমানের কথা শুনে কি আর তোমারই ভালো লাগবে বলো?

আজ আকাশটা এত সুন্দর মেঘলা হয়ে আছে জানো; ঠিক আমরা ছেলেবেলায় একদিন যেই আবহাওয়াতে বাড়ির পেছনের বড় দীঘিটা সাঁতরে পার হয়েছিলাম… ইশশ, তারপরের ঘটনা মনে আছে? খালামণি যেই মারটা দিলো তোমাকে! হিহিহি…

জানো, এই জীবনের উপর দিয়ে এত্তোসব ঝামেলা চলে যাওয়ার পরেও আমার কাছে এই প্রকৃতির আবেদন এতটুকু কমেনি! ঘন বর্ষার মাঝে আমাদের বাড়ির টিনের চালের উপর জলধারার শব্দ শুনতে আমি ছুটে চলে যাই… এই শোন শোন, তোমাকে একটা সুখবর দেই। তুমি আমাদের বাড়ির পাশে যেই কাঠগোলাপ গাছটা লাগিয়েছিলে, সেইটাতে ভরে ফুল এসেছে! যা সুন্দর গন্ধ ছড়াচ্ছে না ক’দিন ধরে… আহা !

ইচ্ছে হচ্ছিল তোমার জন্য ক’টা ফুল প্যাকেটে করে পাঠিয়ে দিই। আজ আমি শখ করে বৃষ্টিতে ভিজেছি। আরে অবাক হয়ো না তো! বড়ো হলেই কি একটু শখ করতে পারব না? আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে একটা আড়াল দিয়েছেন বড় ভাইজান। আমি, তোমার বোন দুইটা রিনি আর রিমি– সবাই মিলে আজ ভিজেছি… আজ বাচ্চাদের মতো মজা করেছি জানো?

আমার খুব নিজের ছেলেবেলার কথা মনে হচ্ছিল… সেই আনন্দ করে ছুটে বেড়ানো, নির্ভাবনায় সাঁতরে আসা ওই ফুলঝাড় দীঘিতে… যেই বড় হলাম একটু, আর তর সইলো না কারো… বিয়ে দিয়ে দিলে। কত স্বপ্ন নিয়ে সংসার শুরুও করেছিলাম… কী যে হলো জীবনে!

এই ভাগ্যে যদি কষ্ট লেখা থাকে, তবে কী করে খন্ডাব বলো? তাইতো তোমাদের শখ করে বিয়ে দেয়া বরটার সাথে আর থাকা হলো না… আমার অনেকবার মনে হয়েছে আর কোন কথা কইব না তোমার সাথে। অনেক ক্ষোভ জমে আছে আমার মাঝে… তোমরা চাইলে হয়ত অনেক কিছুই করতে পারতে। এমন একটা মানুষকে সবার খুব পছন্দ হয়ে গেল– শিক্ষিত, বড় ঘর !

একটা কথা জানো আনন্দ, আমার নিজের জীবনের কষ্ট নিয়ে আমার ভয় হয়না আর– আমি কষ্ট পাই মা, খালামণিরা আমাকে দেখে দেখে প্রতিসময় কষ্ট পান… তারা নাহয় একটু ভুল করেই ফেলেছিলেন– কিন্তু তার জন্য সবসময় অনুতাপে দগ্ধ হয়ে চলেছেন!

আমি নতুন করে সব সাজিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। কলেজে ভর্তি হয়েছি প্রিয় বিষয় বাংলাতে, হুমম। বেশ ভালোই লাগছে পড়তে। হাজার হলেও এই জিনিসগুলো পড়তে আমার সবসময় ভালোই লাগত। ভাইয়া আমাকে পড়তে খুব উৎসাহ দিচ্ছেন, আমার খুব ভালো লাগছে।

আমার ওই বাড়ি থেকে ফিরে আসার আগেই তো তুমি চলে গেলে দুবাই। অবশ্য মা-খালা সবাই তোমাকে নিয়ে আজো খুব গর্ব করে চলে, এরকম ছেলে নাকি গোটা ফুলদিয়াতে নেই… তুমি আর বেশিদিন বাইরে থেকো না আর। আর ক’টা বছর একটু টাকা আয় করে ফিরে এসে ঘর-সংসার করো…

অ্যাই, তোমার ওখানে কি বৃষ্টি হয়? তুমি কি আমাদের মত করে অনুভব করতে পারো বর্ষার জলধারাকে? পাগলা মিয়া, তোমার কি মনে আছে তুমি ছেলেবেলায় আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলে–”বরষা কন্যা” হিহিহিহি… কী লজ্জা পেয়েছিলাম আমি! অবশ্য খুব ভালো লেগেছিলো… কিন্তু সেইটা তো বলিনি কখনো… আজকে বলে ফেললাম। কী হলো? কলার উচিয়ে ভাব দেখানোর ওই ভঙ্গিটা করলে নাকি? করার তো কথা……

আমি তোমাকে অনেক ভালো চিনি, তাইনা আনন্দ?… … …

শোনো, আজ আর লিখব না। ভাবছি আরেকটা চিঠি লিখে দু’টো একসাথে পাঠাব। বুদ্ধিটা কেমন বল দেখি? তাহলে ফুরুত করে শেষ হয়ে যাবেনা পড়া– সময় নিয়ে পড়তে পারবা।

ভালো থেকো। আর শুনেন, আমি রোগ-বালাইদের পুষি না বুঝেছেন? আপনি নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রেখেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তার রহমত দিয়ে বেষ্টন করে রাখুন দোয়া করি।
বিদায় তবে…

হতভাগিনী
সুপ্রভা

* * * * * * * * *

পরিশিষ্টঃ
দ্বিতীয় চিঠিটা লেখা হয়নি বলে আনন্দ আর কোনদিন সুপ্রভার লেখা চিঠিটা পায়নি।
হারিয়ে যাওয়া চিঠি -১ | হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ২

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in গল্প, চিঠি. Bookmark the permalink.

হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ৩-এ 6টি মন্তব্য হয়েছে

  1. এরকম লেখাগুলো বেশ মজার লাগে। নিজেই লিখে আবার নিজেই প্রাপক হিসেবে উত্তর দেয়া। হা হা হা। নিজের মত করে ভেবে নেওয়া যায়। ওপাশ থেকে কী উত্তর আসবে, তার পরোয়া করা নেই। শুধু ভেবে নেয়া আর কলম চালিয়ে নেয়া।

    • Mahmud faisal বলেছেন:

      ঠিক… তবে এইটা আমার সেরকম লেখা না। এই লেখার চরিত্রগুলো সম্পূর্ণ আমার কল্পনা। এবং অনেক বাস্তব ঘটনার গল্প শুনে তাদের থেকে উপজীব্য করেই লেখা🙂

  2. তাজিন বলেছেন:

    বাপরে!
    আপনি এমন কিভাবে লেখেন।
    অনেক ভালো লাগলো…।।

  3. রহস্য বালিকা বলেছেন:

    সুন্দর লিখেছেন। মেয়েটার ভাবনা বেশ রোম্যান্টিক। যদিও একটু একটু স্যাড টোন আছে জায়গায় জায়গায়।
    ভালো লাগল লেখাটা।

  4. পিংব্যাকঃ হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ২ | আমার স্বপ্নময় জগত

  5. sangeeta tikader বলেছেন:

    তোমায় ছুতে চাওয়ার মূহুরত রা………
    জানিনা কি আবেশে দিশাহারা………
    লেখাটা পড়তে পড়তে হারিয়ে যাচ্ছিলাম খুব চেনা পরিচিত একটা অচিন জ়গতের গহীন অরণ্যে

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s