হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ২

রচনাকালঃ ১৭ মে, ২০০৯


সুপ্রভা,
তাকিয়ে তাকিয়ে সময় বয়ে যেতে দেখলাম, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দিলাম… তবু তোমার চিঠিটা পেলাম না তো! কিছু হয়েছে কি তোমার?

আমি কি তোমার স্মৃতির বিস্মৃত একটি অংশ হয়ে গেলাম? নাকি তোমার ব্যস্ততা আজ আকাশ ছুঁয়ে গেছে? অথবা হয়ত তুমি আজ কোন বিপদের মাঝে আছ… কিছুই জানিনা আমি…

সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার অনেক প্রার্থনা তোমার জন্য … তুমি ভালো থাকবেই দেখে নিয়ো। এই অভাগার দোয়া যে !!

জানো সুপ্রভা, আজ অনেকদিন হলো আমায় কেউ জিজ্ঞেস করে না –
“তোমার শরীরটা কেমন আনন্দ?”
“তোমার মনের মাঝে কি এখনো দ্বীপান্তর হওয়ার পোকাটা আছে?”

আমার দ্বীপান্তর হওয়ার ওই অদ্ভূত ইচ্ছেটা মনে হয় তুমিই খুব ভালো বুঝতে। মাঝে মাঝেই আমার মনে হয়, মানুষের জীবন এত অদ্ভূত কেন হয়? কেন যেন আমার জীবনে অনাকাঙ্খিত ঘটনা মনে হয় একটু বেশিই ঘটে গেছে…… দ্বীপান্তর না হয়ে হলাম দেশান্তর!

ভাবতে বসে আমি না কোন থৈ পাইনা জানো? তাই ভয়ে আর বেশি ভাবতে যাইনা। কত কিছু ভেবে যাই আনমনে! অথচ যেটাই চিন্তা করি– দেখি আমার হিসেব মেলেনা। কত কী করেছিলাম, আর কত না অদ্ভূত পরিণাম হয়েছে! আমি কী করে এই হিসেবের খাতা মেলাব বলো? আমার নিয়তি বলে ধরে নিয়েছি কতগুলো বিষয়…

আমি জানি তুমি এইটা শুনে ভুরুটা কুঁচকে একটা বকা দেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছ ইতিমধ্যেই… এই এই শোন আগে, আমার কথাটা তো শেষ করতে দাও আগে… আমার ঠিক মনে আছে তুমি সবসময় বলতে,” নিয়তি হলো দুর্বল মনের ভাবনা, কর্ম দিয়ে জীবন জয় করে নিতে হয়… ”

letter box

সুপ্রভা, বিশ্বাস কর, আমি কম চেষ্টা করিনি এই জীবনের একটু উন্নতির জন্য। তুমিই বলো, আমার জীবন জুড়ে যত প্রচেষ্টা তুমি কাছে থেকে আমায় দেখেছ তা-কি কম? আমি কি এই জীবনে তোমার দু’চোখের সামনেই কম করেছিলাম? এই বিদেশ-বিভুঁইতে এসে শ্রমিকের চাকুরী করতে আমার ভালো লাগে না। কেউ কি ভাবতে পারবে এই আমি এস,এস,সি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় জায়গা করে নিয়েছিলাম। আমার কলেজে ভর্তি হবার পর বাবা মারা গেলেন কেন? কেন বড় ভাই সংসারের সব দ্বায়িত্ব আমার উপর ছেড়ে পরিবার নিয়ে দূরে চলে গেলেন তারপর। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মাঝে বাবা আমাদের জন্য ওই ভিটাটুকু ছাড়া কিছু রেখে যেতে পারেননি। আমি সেটা নিয়েই যুদ্ধ শুরু করলাম– জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার যুদ্ধ। মমতাময়ী দুঃখিনী মা, ছোট ছোট দু’টো বোন আর একটা ভাই– ওদের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ দুটো অশ্রুতে ভিজে যেত। অভাবের মাঝে…

ধুরর !! আমার মনখানি খারাপ হয়ে গেল অতীতের এই স্মৃতিচারণ করে। আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। এখন একটু আকাশ দেখব। বিমর্ষ মনটা যদি ভাল করতে পারি! আমার বাড়ির উঠোন আর এই দেশের মাঝে এই একমাত্র মিল! আকাশখানি ছাড়া মন খুলে কথা কইবার মত আর কাউকে পাইনা জানো?

একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ব। সকালে ফজরের সালাত আদায় করেই ছুটতে হবে। দুবাইয়ের কারখানায় আর এই ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে সময় করে উঠতেই আমার প্রাণান্ত হয়। তোমাকে লিখব লিখব করে কতদিন যে পার হয়ে গেল!

এখন কলম থামিয়ে দেই তবে, হুমমম? কাল ফিরে এসে পারলে লিখব তোমায়… তদবধি বিদায়! আর পারলে আমায় দু’কলম লিখে দিয়ো সুপ্রভা। বড় আশা করি তোমার চিঠির…

শেষান্তে পথহারা –
আনন্দ।

আরো চিঠিঃ
হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ১
হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ৩

Advertisements

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in গল্প, চিঠি. Bookmark the permalink.

3 Responses to হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ২

  1. পিংব্যাকঃ হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ৩ | আমার স্বপ্নময় জগত

মন্তব্য করুন

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s