হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ১

letter1


সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি
দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায়…
রইল না, রইল না
সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি……


প্রিয় সুপ্রভা,
রবিঠাকুরের গানের এই চরণগুলো শুনছিলাম একটু আগে একমনে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল অনেক কথা। তোমায় মনে পড়ে গেল, আর আমায় পেয়ে বসল পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ। আসলেই নানা রঙের দিন কেটেছে আমার জীবনে, কখনো অমাবশ্যার গহন কালো আঁধার, কখনো রংধনুর মত বর্ণিল। কখনো হতাশায় কেটেছে অনেকদিন, কখনো আবার স্বপ্নালু চোখে কাটিয়েছি অনেকগুলো রাত্রি। কখনো কল্পনায় আমি হাতে পেয়েছি তোমার হাতের স্পর্শ। আবার দুঃস্বপ্নের মতো হাজির হয়েছে কত-শত বিপত্তিরা।
তবু স্মৃতির পাতা থেমে থাকে না– তাতে লেখা হতে থাকে ক্রমশ… কখনো কালো রঙের কালিতে, কখনো বা লাল কালিতে, কখনো ধূসর বর্ণে, আর কখনো নানা বর্ণিল রঙ্গের আঁচড়ে…

স্মৃতিরা সতত অপসারী। তারা দূরে চলে যায় সময় সময়… যেতে যেতে একসময় হারিয়ে যায়। একটা সময় হৃদয়ের মাঝে কত-শত স্বপ্নেরা খেলা করত! কিছু পাব কি পাব না তা ভেবে দেখতাম না… শুধু জানতাম চোখ বুজলে যেই অকলঙ্ক পবিত্রতা আমায় আচ্ছন্ন করে– সেইটাই আমার স্বপ্ন, সেটাই হলো আমার আজন্ম প্রত্যাশা…

সময়ের পরিবর্তনে মনও বদলে যায়, বদলে যায় ধ্যান-ধারণা। জাগতিক পৃথিবীর রূঢ় বাস্তবতা বুঝে যাওয়ার পর এখন স্বপ্নও আর দেখতে পারিনা। স্বপ্ন যদি আকাশ না-ই ছুঁলো, তবে সেকি স্বপ্ন হলো?

জানো, সেই ছেলেবেলায় যখন বিকেলে মা খেলতে যেতে দিতে রাজী হতেন, তখন আকাশে বিমান উড়ে যেত গগনবিদারী শব্দ করে… তা দেখে মনে হত একদিন আমিও বিমান চালাব…সেই স্বপ্ন সত্য হয়নি।

কখনো ভরদুপুরে যখন হোমওয়ার্ক করতে বসে থাকতাম বাসার কোণার ওই ঘরের জানালার ধারে — বাইরে শালিকগুলোকে নিঃসীম স্বাধীনতায় উড়তে দেখে আমারো কতবার অমন শালিক হতে ইচ্ছে করেছে!

পরিষ্কার মনে পড়ে জানো, ভোরবেলায় উঠে যখন একঝাঁক চিল দেখতাম ও-ই দূরে উড়ে উড়ে যাচ্ছে…তখন কতবার ইচ্ছে করেছে আমিও অমন গাংচিল হয়ে উড়ে যাইনা কেন আকাশে…দূরে বহু দূরে…

জানো, এলাকার চঞ্চল ছেলেগুলো যখন বিকেলে আকাশে ঘুড়ি উড়াত, তখন ওদের নাটাই ধরতে দিত না বলে কতবার রাগ করে মনে মনে বলেছিলাম — আমি যখন বড় হবো তখন তিনটা নাটাই আর অনেকগুলো ঘুড়ি রাখব আমার সাথে… কিন্তু বড় হয়ে আর আমার ঘুড়ি কেনা হয়নি!

সামনের বাড়ির কাশেম ভাই একদিন ওর ক্রিকেট ব্যাটটা ধরেছিলাম বলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল… তারপর থেকে আমি কোনদিন ক্রিকেট খেলতে যাইনি জানো? অবশ্য একটা ব্যাট আর কেনাও হয়নি জীবনে।

পাশের বাসার তন্ময়-তৌফিক যখন আমেরিকা থেকে ওদের মামার পাঠানো রিমোট চালিত গাড়ি চালাত সামনের রাস্তাটায়… তখন ধরতে দিত না দেখে আমি বলেছিলাম — “আমার মামাও আমাকে এরকম গাড়ি পাঠাবে”…আমার মামা পাঠায়নি অমন কোন গাড়ি, পাঠানোর প্রশ্নই উঠেনা… কিন্তু এতগুলো বছর কেটে গেল তবু আমার অমন গাড়ি পাওয়া হলোনা…

ছেলেবেলায় আমি বেশ দুর্বল ছিলাম। মায়ের কড়া নির্দেশ ছিল– “কারও সাথে কোনদিন মারামারি করেছ এমন নালিশ যেন না শুনি”। আমিও তাই কখনও এমন কিছু করতাম না যাতে নালিশ যেতে পারে মা’র কানে। কিন্তু একদিন শেষ বেঞ্চে ব্যাগ রেখেছিলাম বলে শয়তান লোটাসটা আমাকে থাপ্পড় দিয়েছিল জানো? আমি কিছু বলিনি সেইদিনেও। একটা ভয় আচ্ছন্ন করে রাখত আমাকে — একদিকে মারামারি করে কাপড় নোংরা হলে মা বকবে, অন্যদিকে যদি স্যার দেখতে পান এসে তাহলে বেত দিয়ে পিটাবেন। তাই আমার আর লোটাস-নয়নদের কিছু বলা হয়নি।
পরে শুনেছিলাম, ওরা এস,এস,সি পরীক্ষা দেয়ার সময়টাতেই একটা খুন করেছিলো… সেদিন মনে হয়েছিল, আমি অমন হবো না বলেই হয়ত থাপ্পড় খেয়েও কিছু বলতে পারিনি…

সুপ্রভা, আজ তোমায় ভাবছিলাম আমি-তুমি নিয়ে কিছু কথা বলব। কিন্তু পুরোনো সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে আর ইচ্ছে করছে না ওসব বলতে। আর চিঠিটাও ফেলে রাখব না। পাঠিয়ে দিব পোস্ট মারফত তোমার স্নিগ্ধ হাতের স্পর্শের জন্য। আর আজ যা বলতে চাইছিলাম ওসব কথা নাহয় পরের চিঠিতে লিখব, হুমম?

তোমার শেষ চিঠিটার ওই কথাগুলো এখনো বুঝতে পারিনি–
“নীল আকাশের কোণে যেই স্নিগ্ধ শুভ্র মেঘখণ্ড দেখা যায়,
সেটাই যে তুমুল ঝড় নিয়ে আসতে পারে তা কি জানো?”

এর অর্থ ভেবেই চলেছি আমি। তুমি তো শুধু এই অর্থে বলার মেয়ে নও। এর নিগূঢ় অর্থ বের করেই তোমায় জানিয়ে দেব দেখে নিয়ো…

শরীরের প্রতি যত্ন নিয়ো অনুগ্রহ করে। রোগ-বালাইদের পোষা ময়নাজোড়ার মতো আদর না করলেই কি না?

আজ বিদায়। তোমার পরের চিঠিটার প্রতীক্ষায় থাকব…

শেষান্তে এক অভাগা
আনন্দ

রচনাকালঃ ০১ মে, ২০০৯

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in গল্প, চিঠি. Bookmark the permalink.

হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ১-এ 18টি মন্তব্য হয়েছে

  1. akashlina বলেছেন:

    আজ আপনার অনেক লেখায় চোখ বুলিয়েছি।কী বলব …এত সুন্দর লেখেন!প্রতিটি শব্দ হৃদয়ের গভীর কোণে ঠোকা দেয়।মনে হয় ,আমার ও কিছু বলার ছিল কোন একজনকে…অথচ বলা হয়নিঃ)

    • Mahmud বলেছেন:

      হৃদয়ে গভীর কোণে টোকা দিতে পারা খুব বড় ভাগ্যের ব্যাপার বৈকি!😀
      একজনকে কিছু বলার থাকলে বলে দিতে পারতেন! তবে না বলাতেও আনন্দ আছে😉

  2. rizel বলেছেন:

    ওই তুই আমগো “পথ হারা পথিক” কইসস কিল্লাই ????? ঠিক কর কইলাম।

  3. MysticSaint বলেছেন:

    You have an excellent talent for writing. Pls keep up.

    Sadiq

  4. jajaborrr বলেছেন:

    hmmmm….. na bolateo anondo!🙂

  5. Meghla Ratri বলেছেন:

    WoW! onk nyc hoice… But kothagulo bolar chithi ta kobe likhben?! naki likhben e na?! jai hok, etai eto nyc hoice… ashol kotha likhle na jani ki hobe!!!

  6. isti বলেছেন:

    dosto khub valo lagse tor lekha !! onek din por kisu porte gie onnanno kaje deri kore fellam…

    P.S. english a bangla lekhar jonno sorry !! i knw u dont like it ..

  7. তাজিন বলেছেন:

    অনেক সুন্দর লেখেন তো আপনি…!!!

  8. পিংব্যাকঃ হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ৩ | আমার স্বপ্নময় জগত

  9. পিংব্যাকঃ হারিয়ে যাওয়া চিঠি – ২ | আমার স্বপ্নময় জগত

  10. Badhon বলেছেন:

    jotobar pori totobar mugdho hoye jai…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s