হয়ত অন্য কেউ

misty

এই তীব্র স্থিতির মাঝে গতিটাকেই কেমন বেখাপ্পা লাগে।
ভেবে দ্যাখো, আমার শব্দগুলোও কি বেখাপ্পা আর অদ্ভুত?
আমার শত-সহস্র বাক্যগুলো, অনুভূতিদের ছড়িয়ে থাকা কত!
তবু আমার গভীরতম কথা নাকি প্রকাশিত হয় না।

আমার আবেগের গহীনতম শব্দগুলো নাকি অর্থ বয়ে নেয় না।
ছোট্ট এই জীবনের যেখানেই হাত বাড়াই, আমি হেরে যাই।
এই তো কতবার বদলেছি দেখার বাতায়ন, বদলেছি দৃশ্যপট,
অথচ কেন বারবার লজ্জায় নুয়ে পড়তে বাধ্য হই অসহায় হয়ে?

অদৃশ্য পিঞ্জরের এপাশে আমার একলা বসবাস অহর্নিশ।
জানি এই ফেলে যাওয়া দুপুর আর কোনদিন আসবে না।
জানি এই কার্তিকের সন্ধ্যার বিষাদের কবর এখানেই।
জীবন খুবই ক্ষুদ্র, যে যায়, যারা যায়; চিরতরেই যায়।

হাজারবার ভেবেছি জীবনে এই তো শেষ, এই তো!
এই মহাকাব্যের যেন শেষ নেই। প্রতিটি শব্দ বয়ে যায়
তপ্ত অশ্রুধারা আর বক্ষপিঞ্জরের ভেতরে অগ্ন্যুৎপাতের পর।
এ আমার অনুভূতিমালা, আমার নিঃশব্দ বচন, নিশ্চুপ কোলাহল।

বলো তো, বছরের পর বছর ধরে বলা আমার শব্দগুলো
কেমন করে এতটা অর্থহীন বোধ হতে পারে?
কী গভীর যন্ত্রণা সে প্রতিটি শৃঙ্খলাবদ্ধ আবেগের প্রকাশে
তার হিসেব হবে কোন খাতায়? কবে, কোথায়, কেমন করে?

শূণ্য দিয়ে পূর্ণ করি আমার রিক্ততার ডালা।
অঘ্রাণে সেই মেঠো পথের গন্ধে আমার জীবনটা,
পরাবাস্তব জগতের স্বপ্নগুলো, তিক্ত আর কটু স্বাদ;
অনবরত মুচড়ে ওঠা বুক, হেসে ভুলে যাওয়া।

এমনি করে ভুলে যেতে যেতে ক্লান্ত হই, তবু উন্মত্ত হতে পারিনা।
হাসিমুখ পথ চলি, কিছুমিছু জোগাড় করার ন্যুনতম প্রচেষ্টা।
আমি রিক্ত ছিলাম, আছি, থাকবো হয়ত। আমার রিক্ততা
আমাকে করেছে পড়ে থাকা মেরুদন্ডহীন কেঁচোর মতন।

হয়ত একদিন মানুষ হবো, একজন সত্যিকার মানুষ।
ক্ষতবিক্ষত দেহ-প্রাণের আমি নই, সেই শৈশবের আমি।
মেঠোপথে ভেজা শিশিরে পা গলিয়ে ধনেপাতার ক্ষেতে পাশে
নানীর আঙ্গুল ধরে আনন্দে কেঁদে ফেলা সেই আমার মতন কেউ…

হয়ত সে কেবলই স্মৃতি, অথবা বিভ্রম?
অথবা আমি নই! সে হয়ত অন্য কেউ…

Posted in কবিতা, ব্লগর ব্লগর | মন্তব্য দিন

নীল

onioto

তখন সন্ধ্যা নাকি বিকেল মনে নেই। আবছা আলো, স্মৃতির চাইতে বেশি ঘোর সঙ্গী। কোথাও কোন শব্দ হচ্ছিলো একটানা, যান্ত্রিক শব্দ। হুলুস্থূল চিৎকার, বেদনাহত মানুষের আহাজারি, রিকসার ক্রিং-ক্রিং বেলের শব্দ, একটা বাচ্চা ছেলের কন্ঠে মা-সংক্রান্ত খিস্তি, মোবাইলে বেজে যাওয়া অনবরত হিন্দি গান। বৃষ্টির শব্দও আছে, একটানা ঝরে যাওয়া। ঝরে যায় ক্রমাগত। এই পথের কোন ভবনের জানালায় কিশোরি পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে আছে আনমনে এমনই পথে। দোকানে জ্বলে উঠেছে এনার্জি সেভিং ল্যাম্প।

এমন অনেক মূহুর্ত থাকে প্রতিদিনই। মানুষের মনের দৃশ্যগুলো অন্যরকম হয়ত। ঝরে যায় বৃষ্টি, ঝরে যায় অনুভূতি, ঝরে যায় স্মৃতি। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় অনেক তীব্র অনুভূতিরাও জাঁকিয়ে ওঠে, মাটির সোঁদা গন্ধে হয়ত মস্তিষ্কের ভিতরে অনাহূত যন্ত্রণা জেগে ওঠে। চোখের সামনের দৃশ্য ঝাপসা হয়ে ওঠে, ম্লান হয় বোধ, নিঃশ্বাস গাঢ়…

হেঁটে যাওয়া এই পথ, ঝরে যাওয়া বৃষ্টি। হয়ত পথের শেষ আছে, হয়ত নেই। এই পথ ধরে হেঁটে গেলে ক্লান্তি থাকে হয়ত, হয়ত থাকে না। এই দৃশ্যগুলো হয়ত বিভ্রম, হয়ত না। মানুষে মানুষে আর জনে জনে বোধের জগতে নানান রঙের বিক্ষেপ। অনুভূতিদের হয়ত আলাদা তরঙ্গ আছে, তারা কেবল তাতেই সঞ্চারিত হয়। পাপাচারী আত্মার তরঙ্গ হয়ত প্রশান্ত হৃদয়ের তরঙ্গের চাইতে ভিন্ন। তাদের পথ আলাদা, তারা কেউ কাউকে স্পর্শও করে না। ভিন্ন দ্যোতনায়, ভিন্ন মাত্রায় সঞ্চারণ। বেঁচে থাকার অমোঘ বাস্তব কিছু নিঃসরণ।

বৃষ্টি ঝরে চলেছে গ্রামের মেঠোপথেও। লাল ইট বিছানো, খোয়ার স্তূপের পাশ দিয়ে ট্রাক চলা পথের ভেঙ্গে যাওয়া এই রাস্তা এঁকেবেঁকে যায় বিশাল ভিটে পার করে। রাস্তার পাশেই বড় বটগাছ, আজকাল দেখা যায় না। আগামীতে হয়ত থাকবে না। অনুভূতিরাও কি এভাবে হারায়? আবার, শতবর্ষী এইরকম বটের ছায়ায় হয়ত অনেক মানুষ নিয়েছে ছায়া, অনেক কিশোরের হাতের লাঠি আঘাত করেছে বৃদ্ধ বটের গায়ে। সে তবু আগের মতন আছে, অপরিবর্তিত। বয়স হয়েছে, ঠায় দাঁড়িয়ে সে দেখে গেছে মানুষের কাজ। কত মানুষও এমন বটের মত, দীর্ঘকাল দেখে চলে। চারপাশ বদলায়, তার মাঝেও পরিবর্তন আসে। শাখা-প্রশাখা মেলে ধরে বড় হয়। আয়ুষ্কাল কমতে থাকে বলে একসময় শক্তিও কমে যায়। বার্ধক্য গ্রাস করে ধরে।

কত কিছুই বদলে যায়। একই রকম সন্ধ্যা-রাতের আগমন ঘটেছে সৃষ্টির শুরু থেকেই। আলাদা কীসে প্রতিটি দিন, কোন মানুষের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়? কেমন করে সুখী হয় কেউ, দুখী হয়। বটের ধরে থাকা, আঁকড়ে রাখা মাটিতেই মিশে যায় গোটা গ্রামের একের পর এক মানুষ। জন্মে যাওয়া, দৌড়ে চলা, উদ্ধত যৌবন, ম্রীয়মান বার্ধ্যকের পরে মিশে যায় মাটিতে। এক অবিন্যস্ত আত্মার উড়ে চলা ইতস্তত তীব্র ধাক্কায় বয়ে চলা অশ্রুধারা, নীলাভ বেদনা, নীল নীল যন্ত্রণার নখর, প্রচেষ্টা আর ঘটনার অনির্বন্ধ পরিণতি। কিছু হয়, কিছু করে কেউ, কিছু অনড়, কিছু হয়ত অভিশপ্ত, কিছু হয়ত সুযোগ, কিছু বিরতিহীন যন্ত্রনার তুচ্ছার্থক ফল। সবই সময়ের, ফলাফল ভিন্ন। কোন মাপনযন্ত্রে মাপে কে? অসহায়ের চিতকারে কার কী আসে যায়?

নীলাভ্র পাহাড়ের চূড়া, শীতল সুউচ্চ পর্বতারোহণ, সুতীব্র ঝড়ো বাতাস, ছাইচাপা আর্তনাদ, পুড়ে যাওয়া তাঁবুর ধোঁয়া, অদৃশ্য অশরীরি আত্মার মরীচীকার মতন বয়ে চলা, নীল অনুভূতি, নীল আসক্তি, নীল অবগাহন, নীল পারমিতা, নীল অভিশাপ, নীলের বন্ধন, নীল চিৎকার, অবনীল, সুনীল, নীলিমার নীতিহীন অনুভূতির নখরাভিজান। অন্য কোন নীলের প্রবাহ জাগায় কি কোথাও অন্য কোন অন্তরে, নতুন কোন নীলাম্বরীর প্রাণে নীল বিষাক্ততা? কে জানে এই বেদনানীল কাব্যের কোন শেষ পংক্তি আছে কিনা, নাকি হঠাৎ এই শত-সহস্র শব্দ নিরর্থক আঁচড় হয়ে রবে, হয়ত কবির স্থান হবে অবাঞ্ছিত কাতারে, অচ্ছুৎ যন্ত্রণা!!

Posted in ব্লগর ব্লগর | ১ টি মন্তব্য

ভোঁতা

আবছা স্মৃতিগুলো তীব্র হয়ে আসে, জ্বলন শুরু হয়। দুবাইয়ের উঁচু অট্টালিকা জ্বলছে। জ্বলে হৃদয়, আহত হয় শরীর। কেউ বাসে পুড়ে, কেউ পেট্রোল বোমায়, কেউ বুলেটে ছিন্নভিন্ন হয়। একটা শরীর যখন অসাড় হয়ে যায়, এরপরেও কী যন্ত্রণা অব্যাহত থাকে না? আমার সেই অপারেশন থিয়েটারের কথা মনে পড়ছে। লোকাল অ্যানাসতাসিয়া দেয়া হলো, আমি ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে পড়ছিলাম। ঘামছিলাম তীব্র, শরীরের মাংশগুলো যেন কেউ মুচড়ে দিচ্ছিলো। ভয়ে হিম হয়ে আসা শরীর, ওটি ছিলো প্রচন্ড হিম। মায়ের মুখখানি মনে পড়ছিলো। এই মানুষটি আমার উপরে আস্থা হারাননি কোনদিন। তিনি জানতেন আমি তাকে কষ্ট দিতে চাইনি কখনো। আমি জীবন ক’জনকে কষ্ট দিতে চেয়েছি? পেছন ফিরে মনে পড়েনা এখনো। তবু অনেকেই অগ্রাহ্য করেছে, অবিশ্বাস করেছে আমাকে। অনেক বড় বড় অবিশ্বাসের মাঝে আমি আমাকে হারিয়েছি। অবিশ্বাসের কষ্টগুলো মনে হয় ওটিতে ছুরি-কাঁচির নিচে পড়ে থাকার কষ্টের চেয়েও বেশি। বেদনা গমকে কান্না আসলেও মুখে তা নিঃশব্দ রয়ে যায়। আপিসে বসে চোখে পানি রাখা যায় না। এখানে টাকা দেয়, এই টাকায় আমার জীবন চলে। এসব ভারাক্রান্ত হৃদয় দিয়ে বাস্তব জীবনে কেউ পুঁছে না। এমনিতেও পুঁছে না। সর্বত্রই সংকট। কলেজ জীবনের নিয়মের চক্রে পড়ে থেকে মাঝে মাঝেই মনে হতো — এই জীবন কখনো শেষ হবে তো? ইদানিংকার জীবনটা আরো বেশি অস্থির লাগে। এই চক্র ভেঙ্গে মুক্ত হতে চাই। যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি এই তীব্র তীব্রতম যন্ত্রণাকে অনন্তকাল আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবেন না ইনশাআল্লাহ। সবকিছুর শেষ আছে। হয়ত কিছু দীর্ঘায়িত, কিছু বেদনাহত, কিছু অসম্মান আর আদিখ্যেতার। এসবে আমি নির্বাক হতে চলেছি। আমার গহীনে আমি প্রচন্ড নির্বাক হতে চলেছি। আমি জানি, আমার পরিবর্তন ঘটছে। হয়ত এমনটা চাইনি তবু হচ্ছে। পরিবর্তনই জীবন। প্রয়োজনে, অনিচ্ছায়, অজানায়, অশ্রদ্ধায়, যন্ত্রণায়… পরিবর্তন ঘটতেই থাকে জগতজুড়ে।

আমার বোধ ভোঁতা হতে চলেছে, হয়ে গেছে হয়ত অনেক আগেই। অনুভূতিরা শুধু টনটনে হয়ে আছে। ভোঁতা বোধে আজকাল আর আকাঙ্ক্ষা জাগে না। পেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে করে। গলাতে ফাঁস আটকে আছে। অ্যাডিলেট ওভালে বৃষ্টিতে আটকে আছে মাশরাফিরা। সবকিছু আটকে থাকে না। যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ হাঁসফাঁস লাগে। বেঁচে থাকা খুব কঠিন, মরণও। মরণের পরেও… এই স্তব্ধ পৃথিবীতে সৎ চরিত্র কি ভোঁতা হয়ে গেলো? সৎ শব্দটা শুনে হাসি লাগলো। প্র্যাকটিসিং শব্দটাতে সত্ত্বা কাঁপিয়ে কৌতুক তোলে। এটাই জীবন। ভোঁতা বোধে কৌতুক নিতান্ত শঠতা ও নির্মমতা। তবু এটাই জীবন। কেমন করে জানিনা। কবে কী ঠিক ছিলো আমার? এভাবে ভেসে বয়ে যেতে যেতেই হারিয়ে যাবো। হয়ত অনেকে খুশি হবে। কেউ কি কাঁদবে সেদিন? একথা মনে হতেই মায়ের কথা মনে হলো। তিনি কাঁদবেন জানি। আমি জানি আমি আব্বা-আম্মার ভালো সন্তান ছিলাম না। কিন্তু আমার হৃদয় খারাপ ছিলো না। কেউ বুঝুক না বুঝুক, যিনি সবকিছু দেখছেন, তিনি নিশ্চয়ই ফেলে দিবেন না আমাকে। প্রতিদানগুলো এখানে না পেয়ে পরে পেলেও শান্তি। অন্তত শূণ্য হাতে যাবো না ঐপারে…

Posted in ব্লগর ব্লগর | মন্তব্য দিন

ক্ষয়


পৃথিবীতে আমাদের ক্ষয় হয়, ক্ষয় হয় পাথর, ক্ষয় হয় পর্বত। মেঘমালার ক্ষয় হয় বৃষ্টিতে, চোখের ক্ষয় হয় অশ্রুতে। ভালোবাসার কিংবা অনুভূতির বুঝি ক্ষয় হয় না? আবার, বসন্তের গানে রয়েছে অনুভূতির ক্ষয়। এই যেমন–

সখীর হৃদয় কুসুম কোমল
কার অনাদরে আজি ঝরে যায়!
কেন কাছে ‘আস’- কেন মিছে ‘হাস’,
কাছে যে আসিত সে তো আসিতে না চায়।
আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফুটে,
এত বাশিঁ বাজে, এত পাখি গায়
আহা, আজি এ বসন্তে…

মানুষের হৃদয় সুতীব্র বৈচিত্র্যের ভরপুর। তাতে অনেক রকম ক্ষয় থাকে। কখনো আশংকা, কখনো বেদনা, কখনো ভয়, কখনো দুশ্চিন্তা, কখনো অনুশোচনা, কখনো বা হতাশায় তার ক্ষয় হতে থাকে। তীব্র অনুভূতিতে ক্ষয় হয় আয়ু, ক্ষয় হয় হৃদয়ের সুস্থতার। তৈরি হয় হার্টের অসুখ। কখনো মাথায় যন্ত্রণা হয়। সুস্থ মানুষ ক্রমাগত অসুস্থ হতে থাকে।

ভালোবাসা তৈরি হয় আকাঙ্ক্ষায়, কাছে পেতে চাওয়ায়, দূরে যেতে না চাওয়ায়, বেদনা মধুর হয়ে যাওয়ার মাঝে… ভালোবাসার সংজ্ঞা কতজনে কত রকম দেয়! ভালোবাসাও ক্ষয় হয়। সে ক্ষয়ে যায় অশ্লীল দিনগুলোতে। আমার স্মৃতি ক্ষয়ে যায়। স্মৃতির বস্তুগুলো যখন দূরে চলে যায় তখন স্মৃতি ক্ষয়ে বেদনাহত করে দেয় মানুষকে।

চারিদিকের ক্ষয়ে একসময় ক্ষয়ে ক্ষয়ে বিদায় নেয় মানুষ। একটি প্রাণ, স্পন্দন থেকে স্পন্দনহীন হৃদয়। একটি নিস্প্রাণ দেহ… একটি ক্ষয়।

Posted in ব্লগর ব্লগর | মন্তব্য দিন

আপদ

দু’চার লাইন লেখাও আপদ। আমি বুঝি, যে কখনো ক্রিকেট মাঠে ব্যাট হাতে নামেনি, তাকে আপনি যদি বলেন কাঠের বলের খেলায় প্রথম বলটা বাউন্স হবার পরেরটা নিচু হয়ে আসা কতটা ভীতিকর, তাহলে সে বুঝবে না আপনার অনুভূতি। লেখালেখিটাও অমন।

অনেক না পড়লে আপনি বুঝবেন না কোন লেখা কখন কেমন করে লেখা হয়। লেখকরা কেমন করে লিখেন, কখন লিখেন, কেন লিখেন।

সম্ভবত মার্ক টোয়েন বলেছিলো, সে যখন লিখে তখন আসলে তার কলম দিয়ে রক্ত ঝরে। কারো ঝরে আগুন, কারো ঝরে কষ্ট, কারো বিষাদ। ঝরে যেতে থাকে শব্দের প্রতিটি বিন্দুতে, যারা গড়ে তোলে একেকটি অক্ষর। আপনার লেখা যখন পাঠক ভুল বুঝবে তাও বিপদ। হতে পারে আমার এই লেখাটাও বিপদ ও আপদ। হতে পারে আমার সবগুলো লেখাই বিপদ-আপদ-মুসিবত। হতে পারে জীবনের লেখালেখিই আপদ।

অনেক কিছুই হতে পারে। পৃথিবীতে অনেক কিছু হয়। প্রতিটি বিপদে শিক্ষা থাকে, ভীতি থাকে, কষ্ট থাকে, জ্বলন থাকে, আতঙ্ক থাকে, ক্রোধ থাকে, অনুতাপ থাকে, হতাশা ও জেদ থাকে। এসবকিছুর পরেও একদিন টুপ করে কফিনে করে আমরা একের পর এক চলে যাই আমাদের লেপ-তোশক, চেয়ার, টেবিল, কম্পিউটারের মালিকানা ছেড়ে মাটির নিচে মিশে যেতে।

একদিন আমিও অমনি করে মিশে যাবো। একা…
চারপাশের বিপদ-আপদ তখন বড্ড তুচ্ছ মনে হবে..

Posted in ব্লগর ব্লগর | ১ টি মন্তব্য

আনত

শব্দখরার মাঝে এক ফোঁটা জল বড্ড আকাংখিত। কীবোর্ড থেমে রয়, অথচ স্ক্রীনজুড়ে ফাঁকা জায়গা। হৃদয়েও হয়ত। হৃদয় সবচেয়ে অসহায় হয় কখন? সম্ভবত যখন হৃদয় ভয়ে ভীত থাকে। ভয় খুব শক্তিশালী অনুভূতি। শরীরে কাঁপন ধরে, শীতল স্রোত বয়ে যায়, দমবন্ধ অনুভূতি হয়। তবু জীবন চলে যায়, বয়ে যায়, যেতেই হবে। ভয়ের মতই আরেকটা শক্তিশালী অনুভূতি ভালোবাসা। যদিও এ দুয়ের তুলনা হয় না। দুয়ের উপস্থিতি একসাথে হতেও পারে, আবার নাও পারে। জানিনা আমি। যা মন চায় লিখছি। না লিখলেও কিছু আসে যায় না, লিখলেও না। আমার লেখা কেউ মন দিয়ে পড়েনা, আমিও আর কাউকে পড়াই না। রবিঠাকুরের কবিতার লাইনের অংশবিশেষ মনে পড়ছে, “প্রতি নিমেষের কাহিনী/বাঁধিস নে স্মৃতিবাহিনী…” মজার অন্ত্যমিল তো! এজন্যই মনে আছে।

জীবন বড্ড ছোট, বড্ড নিস্তরঙ্গ জিনিস। এসে থেকে চলে যাওয়া। বিদায় জানিয়ে মাটির নিচে স্থান নেয়া। সবাই কেন চলে যায়, কী করে গিয়ে? মাটির নিচে কেমন লাগে? আমার অন্ধকারকে বড্ড ভয় হয়। আল্লাহ আমাকে মাফ করে দেন। মাঝে মাঝে আমি চোখেও আঁধার দেখি। তখনো আমার ভয় হয়। ভয়ে মাখামাখি জীবন। তীব্র ভয় নিয়ে বাস করা অবশ্য কমবেশি নিশ্চিত প্রতি জীবনেই। ধৈর্যধারণে সুসংবাদ আছে বটে।

একটা কথা ছিলো বোধহয় লেখার। ভুলে গেছি। না লিখলাম নাহয়। লিখে কী হবে? লিখে কিছুই হয় না। সবই সময়ের সাথে সাথে পুরোনো হয়ে যায়, ম্লান হয়ে যায়। সব অনুভূতিরাই এক সময় বিরক্তিকর হয়। আমার এটাও হবে। সময়, শুধু পেরিয়ে যেতে দেয়ার। যাও পেরিয়ে যাও। বিদায়।

Posted in ব্লগর ব্লগর | মন্তব্য দিন


এখনো শব্দ শুনি পৃথিবীময়। এই তো, ঝংকারে বাজে নূপুর, মেটাল মিউজিক। গমগম করে মানুষের খিস্তি। হিন্দিগানের তীব্র চিৎকার। গন্ধও অনেক, সুবাসটাও। রাস্তাতে জঞ্জালের গন্ধ চারপাশে। ডিজেল পোড়ানো গন্ধ। বাতাসে ওড়ে চুল, ওড়ে ছেঁড়া কাগজ। সুগন্ধিমাখা মানুষ, গোলাপ জল আর আগরবাতির গন্ধ। অসহায়ের হাত পাতা, মিনতি করা ভিক্ষার জন্য।

দ্যাখো, আমার এলোমেলো চিন্তাগুলো বরাবরের মতই অসহায়। অসহায় বোধ, অনুভূতির দল। এতকিছু করে শব্দপিঞ্জরের মাঝে আটকে পড়া। ঘুরে ঘুরে চক্রাকারে বোধের নির্বিকারতা। সময় কেটে যায়, অকৃতজ্ঞ সত্বার বিবমিষা তবু সুস্থতার স্পর্শ পায় না।

কবিতা লিখিনা অনেকদিন। লিখতে পারিনা। হারিয়েছে শব্দরা অনেক আগে। আমি হয়ত অনুভব করতে ভুলে গেছি। হয়ত সবকিছুকেই মানিয়ে নিতে শিখেছি, তাই আর আজকাল কবিতা লেখিনা। কবিতায় অনেককিছু থাকে, অনুভূতি, তীব্রতা, বিষ, ভালোবাসা, ক্রন্দন, উদ্বেলতা। আমার অতকিছু নেই। আমি নির্বিকার লোক। আঘাত পেয়ে আহত হতে হতে শরীরের অনেক জায়গা যেমন ভোঁতা হয়ে যায়, তেমনি হয়েছে আমার অন্তর।

অনেকদিন বিশাল ক্ষেতের কাছে যাইনা, আইল ধরে এগিয়ে যাওয়া, ইচ্ছে হলো ছুট লাগানোর মতন কিছু নির্মল ভাবনায় উদ্বেল হই। নাগরিক জীবনের সব ধরণের জঞ্জালে ও জালে আটকে গেছি। চলবে হয়ত মৃত্যুবধি। মিনতি করি আমায় জঞ্জালমুক্ত শান্তি দিয়ো পরজনমে হে মোর রব!

Posted in ব্লগর ব্লগর | মন্তব্য দিন

অরণ্যাকাশ



সুপ্রভা, তুমি কি আকাশের গল্প শুনেছিলে? না না, আমি বন্ধু আকাশের কথা বলছি না। আমি বলছি নীল আকাশের কথা। সে তো আজ সারাদিন কেমন কালো হয়ে ছিলো। সকালে ছিলো তীব্র রোদ, এরপর থেকেই বিষণ্ণ আকাশ। ওর বিষণ্ণতা কেন জানিনা। তপ্ততার সাথে মেঘকালো বিষণ্ণতা মিলে কষ্টকর এক আবহাওয়া ছিলো। আমার মনেরটা কেমন ছিলো জানো? ধুরর! আমি আশাও করিনা তুমি জানবে। কী হবে সব জেনে? জানলে কি আর বৃষ্টি নামাতে পারবে? আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টিতে স্নাত হবার দরকার আমার। আমি তো চেয়েছি রোদের গন্ধ মুছে ফেলে শুদ্ধ হবো। শুদ্ধির স্পর্শে আমি পবিত্র হবো। এসবই আমার প্রলাপ। আজীবনের প্রলাপেই আমার উপায়।

অরণ্যের কথা শুনেছিলে? অরণ্য আমার মতন। কেউ তার কথা শুনে না। গাছগুলোর মাঝে প্রবল বাতাস বয়ে গেলে কেমন শোঁ-শোঁ শব্দ হয়, তাইনা? কড়কড় করে কোন গাছের শাখা হয়ত ভেঙ্গে পড়ে। আমার হৃদয়ও কি কম ভাঙ্গে অমন করে? আমার মনের ভাঙ্গনে কড়কড় না, মটমট করে ভাঙ্গে। প্রতিটি জোড়, প্রতিটি বন্ধন যেন খন্ডিত হয়ে যায়। আমি আর আমার টুকরো হওয়া — এরই মাঝে অরণ্যের ভালোবাসা। তুমি তো অরণ্য চেন না, তাইনা? তুমি মনে হয় সমুদ্র চেন, ঠিক বলেছি?

সমুদ্রের মাঝে আমি নেই। ঐ বিশালতার মাঝে আমার দু’চার ফোঁটা অশ্রুর লোনাজল মিশে থাকতেও পারে। একবার ভৈরবে আমার চোখের জল ফেলেছিলাম। সেই নদী হয়ত তোমার চেনা সমুদ্রে আমার অশ্রুফোঁটাকে বয়ে গিয়ে গেছে। সমুদ্রের লবনাক্ততার মাঝে হয়ত আমার অশ্রুর লোনাজল মিশে গেছে। তুমি তো সেসব বুঝো না।

ওসব আকাশ, অরণ্য আর সমুদ্রের গল্প আমার এই কাঠ-কাঁচ ঘেরা প্রকোষ্ঠে অর্থহীন। আমি এক প্রলাপময় জীবনকে ধারণ করি। অর্থহীন তিক্ত আলাপই আমার জীবন। এসব কথা আর নতুন কী? আমার জীবন অমনই রবে। নতুনত্ব বলতে কোন কিছু আমি চিনিনা। দেখোনি তুমি? কয়েক বছরই হয়ত হলো এসব প্রলাপ লিখিনি আমি।

আরো অনেক কিছু লেখার মতন ছিলো। সময় নেই। মাথা প্রচন্ড ব্যথা। কাল রাত থেকেই এই ব্যথা আমাকে কাবু করে ফেলেছে। ভালোও লাগে না যত্ন নিতে। যত্ন নেবার অনেক কিছুই বাকি। বেঁচে থাকলে শরীরের মতন আরো কয়েক হালি বিষয় আছে যার প্রতিনিয়ত যত্ন দরকার। সময় নেই, সুযোগও নেই সেই কারণেই। অনেকদিন চিঠিও লেখাও হয়না সেই সূত্র ধরেই। ভালো লাগছে না কিচ্ছু। কী করবো জানিনা। অনেকদিন হলো আমার বই পড়তে ভালো লাগে না, টেলিভিশন ভালো লাগে না, ফেসবুক-টুইটারেও লগিন করিনা। মাঝে মাঝে আকাশ দেখি, দুপুরের আকাশ। অফিস থেকে বের হয়ে গিয়ে দেখি। রাতে বাসায় ফেরার পরে বিছানায় শুয়ে পড়ি আধামরার মতন। সিলিং-টা দেখি। এই সিলিংকে চিনি আমি অনেককাল ধরে… অ-নে-ক দিন ধরে।

লিখতে বিরক্ত লাগছে। যাই এবার। একটা রিকসা নিয়ে সোজা ঘরে যাবো। আলো নিভিয়ে দপদপ করা মাথার শিরা-উপশিরাদের অনুভব করবো। যখন মরে যাবো, অমনই এক অন্ধকার ঘরে থাকতে হবে। তখনো কি বুক এমন রবে? অনেক আতঙ্ক থাকবে, তাইনা? আমি কি আরো প্রশান্ত হতে পারিনা? চেষ্টা তো করি হয়ত, তবু কেন হয়না? আসলে হয়ত চেষ্টাই করিনা। সবই আমার ভ্রম, সবই হয়ত আমার অরণ্যাকাশের কথা ভেবে চলা কিছু বিচিত্র কল্পনা।

বিদায়ের কোন কথা লিখতে ভালো লাগে না। সম্ভাসনগুলো ক্লান্তিকর। এখন তবে নামহীন বিদায়, আচ্ছা?

Posted in চিঠি | মন্তব্য দিন

অনুরণ


তীব্র রোদ, অসহায় দু’টি পা
অস্থিরতার কোলাহলে কেটে যাওয়া সময়
একটি দিন, নির্বিষ অজস্র মূহুর্ত।
হারিয়ে যাওয়া এক একটি দিন,
এমন অদৃশ্য শেকলে বন্দী থাকা আর সহ্য হয়না।

পড়ন্ত বিকেলের রোদ্দুর
একের পর এক বিবষ বেলা,
আমার হারানো শব্দগুলো
হুল ফোঁটায় অনুভূতির ত্বকে।

অপেক্ষার অনুরণ কেটে যাওয়ার আশ্বাস।
দুঃস্বপ্নের এমন কিছু ছিন্নজালে ডুবে থাকা
তবু হাসিমুখে কৃতজ্ঞতা।
সবকিছু তো দৃষ্টিভঙ্গিই বটে!

Posted in কবিতা | মন্তব্য দিন