আচ্ছা, হারিয়ে যাওয়া কাকে বলে? যে আশেপাশেই ছিলো, যা আশেপাশেই ছিলো — সে হঠাৎ করেই নাই হয়ে যাওয়া বা চলে যাওয়াকে তাইনা? সে কোথায় চলে গেলে হারিয়ে যাওয়া হবে? যখন আমি সে জানিনা সে কোথায় গেছে, তখনই কেবল হারিয়ে যাওয়া হয়। যদি জানি সে কোথায় গেছে, আছে — তাহলে তো হারানো হয়না তাইনা? যদি সে আমাকে না বলে চলে যায় তবে? অথবা সে ছিলো, আচানক নাই হয়ে গেলো — তাহলেও কি হারিয়ে যাওয়া নয়?
আমি হারিয়ে যাওয়া নিয়ে কেন এত কথা বলছি? শিরোনামটাই বা কেন ভাববাচ্যে দিলাম? কারণ বিশেষ কিছু না। স্রেফ জীবনের একটা সময়ে এসে থাকা, হারানো, পাওয়া জাতীয় জিনিস বেলা শেষেই মাথায় প্রস্তরাঘাত করে। হঠাৎ সেই ক্যাডেট কলেজের দিনগুলোর কথা মনে পড়লো। সেই ভয়ংকর চাপ, সেই মানসিক যন্ত্রণা আর যুদ্ধগুলো। ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র মানবসৃষ্ট জীবনযুদ্ধ — কিন্তু তার আকার আকৃতি আর তীব্রতা একদম কম ছিলোনা। তখন মনে হতো — এইতো আর ক’টা দিন, তারপর সমস্ত স্বপ্নেরাই পূর্ণ হবে। হয়নি… সেখান থেকে ফিরে ভৈরবপাড়ের তেলিগাতি গ্রামের প্রতিষ্ঠানটিতে কাটিয়ে এসেছিলাম অনেকগুলো বছর। আর কখনই জীবনের প্রতি সিরিয়াস হইনি। হতে পারিনি। একটা কিছু পেতে অনেক কিছু ছেড়েছুড়ে পেতে ইচ্ছে করেনি। আমি ‘সুপারফিশিয়াল’ হয়েই কাটিয়ে দিয়েছি আমার জীবনটা। এতটা ভয় পেয়েছিলাম! আমি জানতাম আমার আন্তরিকতাতে খাদ ছিলোনা, স্বয়ং আল্লাহ আমাকে নিজেই এমন কিছু জাল তৈরি করে ঘটনাগুলোকে বানিয়ে দিলেন — যা ছিন্ন করার সামর্থ্য আর বোধগম্যতার অবকাশ অবধি আমার ছিলোনা! তাতে কী? সময় তো থেমে থাকেনি, থেমে থাকেও না।
আমার সেই বয়ঃসন্ধির কঠিন সময়গুলো মনে পড়ে। ১২নাম্বার রুমের আমি আর মুসলেহ, সেই সাথে সাবরী বৃহস্পতিবার উপরে আসতো– আমরা যে গল্পগুলো করতাম, সেই গল্পগুলোর পরে মনে হতো –জীবনে অনেককিছু হবো আমরা। আমাদের মতন উদ্দীপনা যাদের আছে — তারা কখনই ঠেকে থাকেনা। আমরা চে গুয়েভারার গল্প, ফাইটার প্লেনের গল্প, রাশিয়ার জারদের গল্প, সোভিয়েত ভেঙ্গে যাওয়ার গল্প — অমন শত শত প্রেরণা আর কল্পনায় থাকতাম। যখন মোক্তারপুর ছেড়ে ঢাকায় ফিরলাম — সেদিনই টের পেলাম জীবন নামের জিনিসটাতে অনেক অনেক বেশি ক্লেদ। এটাতে আমি বিক্রিয়কে যতই খাঁটি জিনিস দেইনা কেন, বিক্রিয়ার উৎপাদের বিপুল পরিমাণ খাদ আর বাই প্রোডাক্ট। কখনো কখনো যার পরিমাণ হয় অর্ধেকের বেশি।
তারপর মনে হতো হারিয়ে যাই। স্রেফ চারপাশের মানুষগুলো থেকে চলে যাই। তাদের জানাবো না এই বুকে অনেক স্বপ্ন ছিলো কোনদিন। এই বুকের ভেতরে কেবল পৃথিবীকে সুন্দর করার আর সবাইকে ভালোবাসার ইচ্ছে ছিলো। আমি জানি আমার এই কথাগুলো কেউ বিশ্বাস করবেনা। না করুক। তাইতো এই পাতায় করে আমার স্বপ্ন আঁকি। একদিন আমি থাকবো না– কিন্তু আমার বুকে আর্তিগুলো এই অক্ষরে করে ছেপে থাকবে সভ্যতার ধ্বংসের দিন অবধি। একদিন নিশ্চয়ই সমস্ত ওয়েবসার্ভাররা ধ্বংস হয়ে যাবে — যেদিন আর কেউ কোন ব্রাউজারে ঢুকে ইউ আর এল হিসেবে কিছু চাপতে পারবে না। তার আগে তো আমি নিশ্চিত হারিয়ে যাবো। চলে যাবো আমার স্রষ্টার কাছে। যার অপার ভালোবাসায় আমি সৃষ্টি হয়েছিলাম।
যখন এই শব্দগুলো লিখছি অভ্র চালু করে কীবোর্ড চেপে। তখন আমার মাথার চিন্তা, বুকের অনুভূতি আর আঙ্গুলগুলোর ব্যাপক ভালোবাসা মিলেমিশে সৃষ্টি করছে স্ক্রীনের উপরে ভেসে থাকা একেকটি শব্দ। আমি বুঝি এই শব্দগুলোকে আমারই ভালোবাসার ছায়া। আমাকে আর কেউ না ভালোবাসুক, আমাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি গাফুরুল ওয়াদুদ [ক্ষমাশীল ও প্রেমময়] তিনি অবশ্যই আমাকে অনেক ভালোবাসেন। হারিয়ে গেলে তার কাছেই যাবো।
এই জগতের মাঝে আমি বেঁচে থাকি থাকতে হয় বলে। আমি হয়ত বাস্তববাদীদের মতন অনেককিছু করার মতন নই। আমি সবকিছুতে থেকেও নেই। আমি আসলে কোন মানুষের আপন হবার মতনও নই। আমি তো জানিনা কী করে আপন হয়। আমিও তাই অমন করে সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাই –যারা থেকেও নেই, যারা থেকেও থাকেনা। কাছেপিঠে যাদের পেতাম, হঠাতই একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি তারা দূরে চলে গেছে। যারা চলে যায় তাদের কাছে অনেক যুক্তি থাকে, একগাদা ব্যাকরণ আর সরল অংক কষে তারা হিসেব করেন চাওয়া-পাওয়ার। আমি আগের মতই স্রোতের সাথে ভেসে চলি। নদীর স্রোতে ভেসে থাকা একটা টুকরা পাতার মতই মনে হয় নিজেকে… ভেসে যেতে যেতে দেখি পাড়ের দুখী আবুল হোসেনকে, আর জাহানারা বেগমকে –যাদের সর্বস্ব চলে গেছে কোন এক দানবের পাকস্থলিতে। আর হঠাৎ চোখে পড়ে অট্টালিকা, যার বারান্দায় সুন্দরী অর্পিতা খোলা চুলে হাতে একটা গল্পের বই আর চোখে চশমা লাগিয়ে দুপুরের “বোরনেস” দূর করছে… জীবন তো অমনই হয়!
এই তীব্র হিসেব-নিকেশের বেড়াজাল থেকে বেঁচে থাকতে খুব ইচ্ছে করে! এতগুলো বছর যখন পারছি, আগামীতে পারবো না? জানিনা আমি। এই অসংজ্ঞায়িত বিচিত্রতার তীর আমাকে যেন বিদ্ধ না করে– সেই প্রার্থনা আমার রবের কাছে করি। যার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সিকি শতাব্দী পেরিয়ে গেছে আমার জীবনের। যেন আরো আরো ভালোবাসতে পারি তাকে, যেন কাছাকাছি চলে আসা অনন্ত জগতের একাকীত্ব তার ভালোবাসার ঝর্ণাধারায় ভিজে দূর হয়ে যায়। হারিয়েই যাই, হারিয়েই যাক, যে যেখানেই চলে যাক না কেন — আমার আরাধ্য ওই অনন্ত জগত। অন্যের কাছে বিবেচিত হতে যেতে যেতে ক্লেদে ভারী হয়ে যায় বুক। তাই সকাল বিকেলের ৫ বার স্মরণে ক্লেদমুক্তি ঘটুক অপার সৌন্দর্যে। প্রার্থনাতেই তো অনুভব করি মুক্তি, হারানোর মুক্তি!
ছবিঃ চিম্বুক পাহাড়। আমার তোলা


১।
জীবনের ইনপুট আর আউটপুটের মাঝে অনেক গরমিল থাকবে – এটা সিস্টেম ডিফাইন্ডেড। তাই এটা নিয়ে মাথা ঘামাইনা। গরমিলটুকু উহ্য ধরে বাকী অংশটুকু নিয়েই পড়ে থাকি কিংবা বলা উচিৎ পড়ে থাকতে হয়।
২।
স্বপ্ন কিন্তু এখনো দেখি। বুক ভরা স্বপ্ন এখনো আছে – এতটুকু টান পড়েনি স্বপ্ন ভান্ডারে। স্বপ্ন আছে দেখেই কিন্তু সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহসটা এখনো আছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমার বেশিরভাগ স্বপ্নই কিন্তু উপরওয়ালা পূর্ণ করে দিয়েছেন! আমার মত নগন্য একজন বান্দার প্রতি পরম করুণাময়ের এতটা দয়ার কথা ভাবলে অজান্তেই মাথা নুয়ে পড়ে।
৩।
তাই সকাল বিকেলের ৫ বার স্মরণে নুয়ে পড়া মাথাটাকে আরেকটু নুইয়ে দিই।
সত্য – এর থেকে বেশী কিছু বলার নেই
স্বপ্ন দেখার অংশটাতে নিজের সাথে খুব মিল পেলাম। এখন মনে হয় এদেশটা যেমন অনেক স্বপ্ন নিয়ে তৈরি হয়েছিল, তেমনি দেশটা হয়েছে ঠিক উল্টা। হয়েছে স্বপ্ন ভাঙার দেশ। তরুণদের মন ভাঙার সব রকম জোগাড়যন্ত্র আমাদের সরকার করে রাখে। এজন্য যখন দেখি আমারই সামনে আমার বন্ধু বান্ধবরা কত ছোট ছোট বিষয়ে চিন্তা করছে আর কত ক্ষুদ্র তাদের চিন্তার গন্ডি, তখন সেটা বদলাবার চিন্তা করি না। কারণ এমনই তো হবার কথা। মনে হয় বড় স্বপ্ন দেখে লাভ কী? স্বপ্ন তো কেবলই ভাঙে।