“বরষা মানেনা/ঝরছে জলধারা/ জানিনা, জানিনা কাটবে কি ঘনঘটা/ অনুনয় মানেনা/ অবারিত মনকথা/ জানিনা, জানিনা থামবে কি ঘনঘটা….” গানটা মাথায় কয়েকবার ফর লুপ চালিয়ে ঘুরছিলো। কারণ সম্ভবত একটা কারণে– আজ পরিপূর্ণ ঝরঝর জলধারার একটা দিন। ইদানিং আমার আর আগের মতন লাগেনা বৃষ্টিভেজা দিনগুলো। এ অনুভূতিটা আমার গত চারটি বছর ধরেই খেয়াল করছি আমি। অনুভূতিগুলো ভোঁতা থেকে ভোঁতাতর হচ্ছে। কারণ কী? বয়স বেড়ে বাস্তবতা বুঝতে থাকলে কি অমন ভোঁতা হয়ে যেতে থাকে অনুভূতিরা? আমি ফেলে আসা কৈশোরকে মাঝেই মাঝে অনুভব করি। উদাস দুপুর, একলা সন্ধ্যা, বাসন্তী হাওয়ায় উদাস হওয়া, বর্ষার সাথে মিতালি… সবই অতীত। এখন কৈশোর পেরিয়ে, তারুণ্যও পেরিয়ে গেলাম। সময়ের চক্রে নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার মাঝে ধুঁকে ধুঁকে বড় হওয়াই মাঝে মাঝে এক অস্থির অনুভূতি এনে দেয়।
এই তিলোত্তমা নগরীতে বসবাস নিদারুণ কষ্টের, দুঃখময়তার। মৌচাকে পানি জমে সুইমিং পুল হয়ে যায়, তাতে ভেসে বেড়ায় কারও রান্নাঘরে কুচিকুচি করা লাউ, পালং শাকের ফেলে ডাঁটা। এর মাঝে বর্ষণ ভালো লাগে না। খুলনার তেলিগাতি গ্রামের পাশে বেড়ে ওঠা আমার সেই মাতৃসম প্রতিষ্ঠানটার কথা খুব মনে হয়। তীব্র বর্ষণে যেখানে বিশাল খোলা মাঠে অথবা হলের ছাদে দল বেঁধে খেলা হতো। শারীরিক অসুস্থতার পাকাপাকি অবস্থানের বদৌলতে আমার সেই দিনগুলোতে আমি পুরোপুরি দর্শক হয়ে গিয়েছিলাম। আত্মাটা ঘুরে বেড়ায়, উদ্বেল হয় — অথচ আমি মাঠের সাইডলাইনে বসে চুপ করে বসে থাকতাম। এই স্থির আর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া বোধকরি তখনই শুরু। আজো আমার অনুভূতিরা যখন আমার ভেতরে এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে যায়, তখনো আমি অশ্বত্থগাছের মতন থম মেরে থাকি। এই নিষ্প্রাণ দেহে আনন্দের ফল্গুধারা বইয়ে দেয়ার প্রাণপণ চেষ্টা আমি নিজেই কি কম করেছি?
স্মৃতিময় বাতায়নটার কথা ভাবছিলাম। উত্তরমুখী আমার ফজলুল হকের সেই জানালা। সেই দিনগুলো মনে পড়লে নিজেকে আবারো খুব অদ্ভূত লাগে। আমার ফেলে আসা দিনগুলো সবসময়েই ভালো লাগে। আমি বোধহয় পরিবর্তন সইতে পারিনা। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, নতুন অনুভূতি, নতুন চাঞ্চল্য আমাকে ভীত করে। আচ্ছা, এগুলো কি সীমাবদ্ধতা? সেই বাতায়নে চেয়ে পাশে বেয়ে ওঠা সবুজপাতার গাছগুলোর কথা মনে পড়ে। অদ্ভূত তো! আচ্ছা, যেই গাছটার পাতা থেকে ঝরে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা দেখে কয়েকটা বছর কেটেছে আমার সকালগুলো। আমি কোনদিন সেই গাছটার নামই জানিনি, ইচ্ছেই হয়নি! কী অদ্ভূত!!
বলে যায় তোমায়, অনব ভালোবাসি — এই কথার মানে কী? অনব মানে কি পুরোনো? সেই পুরোনো ভালোবাসা? ভালোবাসা কাকে? আমি কি ভালোবাসতে জানি? নাহ। ছেলেবেলা থেকে যেই ভালোবাসাকে চিনেছি, সেরকম ভালোবাসতে হলে বোধহয় আত্মা লাগে। একটা চঞ্চল আত্মা, একটা অনুভূতির দ্রবণে চুপচুপে হয়ে ডুবে থাকা আত্মা, একটা দৃঢ়প্রত্যয়ী আত্মা। আমার তো নেই কিছুই। ভালোবাসা নিয়ে ভাবতে হলে জীবনের যথেষ্ট জোর থাকতে হয়। সেই জোর এক ভালোবাসার কথা ভেবে আরো চারিদিকের ভালোবাসাকে গুড়িয়ে দিতে পারতে হয়… কী জানি! এই বিচিত্র নগরে বিচিত্র জীবনধারণে অমন কত করে নতুন নতুন ভাবনার সাথে আমার পরিচয় ঘটবে। তবে এই অনব ভালোবাসার সাথে সখ্যতা নেই আমার।
আমি সম্ভবত আর ভালোবাসতেও চাইনা একজনকে ছাড়া– যার প্রতি ভালোবাসায় ভর করে আমি পেরিয়ে যেতে যাই অনন্তপথ, অনন্ত সময়, অনন্ত মুক্তিতে। আজ সন্ধ্যায় যখন একলা বসে ছিলাম শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিশাল মসজিদটার শেষ মাথায়, তখন বারবার মনে হচ্ছিলো, আমার এই ভীষণ একাকীত্ব, এই হৃদয়ের ভালোবাসা তো তারই পদতলে অর্ঘ্য দিবো বলে চেয়েছি শতবার। অথচ মনোসংযোগের অভাবে হারিয়ে ফেলি খেই। বিশালতার শান্তি ছেড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অজস্র চাওয়াতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় শান্তিদের দল। এই মসজিদটা আমার খুব ভালো লাগে। বিশালতার জন্য মনে হয়। আমার আকাশকেও অনেক ভালো লাগে, সাগরকেও ভালো লাগে — সবাইই অনেক বিশাল। আমার বিশাল হৃদয়ের মানুষদেরকেও বড্ড ভালো লাগে। তাদের কাছে গেলে কিছু হারাই না, নিজেকে হারিয়ে ফেলি বিশালতায়, উন্মুখ হই অর্জনের স্বপনে।
লিখবো না লিখবো না করেও বেশ বড় হয়ে গেলো। গানটার কথা ভাবছিলাম। কেমন উদাস করা ব্যাপার স্যাপার। আচ্ছা, অমন উদাস হয়ে ক’জন পারেন নিজের ভেতরের অতৃপ্তিকে ধরে রাখতে? সুরের মাঝে ডুবে যেতে আমার তাই লাগে ভয়। আমি তো আর আমি থাকিনা, যাকে আমি গড়েছি অজস্রসময় ধরে সাধনা করে। আমি আমার চাওয়ার দাস হয়ে যাই, আমার অনভ্যস্ত আবেগের কাছে দূর্বল হয়ে যাই। এভাবেই বয়ে যায় জীবন। অথচ জীবনকে বয়ে যেতে দেয়ার মাঝে নেই সমাধান। বরং তার কাছে যাবো বলেই আমার এই প্রস্তুতি, তার কাছে যাবো বলেই আমাদের এই আয়োজন। বয়ে যেতে দিলে কীভাবে হবে বলো? আর কলেবর বাড়াতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। আজ বরং ঘুমুতে যাই। কাল ভোরে উঠে শ্রমবিক্রয় করতে যেতে হবে শহরের আরেকপ্রান্তে। হে দয়াময়, দয়া করো আমায়!
::::::
বরষা মানেনা
ঝরছে জলধারা
জানিনা, জানিনা কাটবে কি ঘনঘটা
অনুনয় মানেনা
অবারিত মনকথা
জানিনা, জানিনা থামবে কি ঘনঘটা
নির্ঝর গগনে, অপলক চেয়ে রই
বিস্মৃত কবিতায়, অলকা পবনে
মেঘলা কবেকার স্মৃতিময় বাতায়ন
বলে যায় তোমায় অনব ভালোবাসি
দীপিকা সায়রে, অনিমেষ চেয়ে রই
মিথিলা বরষা, অলক দহনে
মেঘলা কবেকার স্মৃতিময় বাতায়ন
বলে যায় তোমায় অনব ভালোবাসি
- কথাঃ শিরোনামহীন
- Photo Courtesy: Rikonen.com


প্রিয় একটা গান মনে করায় দিলি।
এই গানগুলা তোর রুমে বসেই প্রথম শুনসিলাম, তোর খাটে বসে, জানালায় হেলান দিয়ে…
” বিশালতার শান্তি ছেড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অজস্র চাওয়াতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় শান্তিদের দল।”
কথাটা খুবই সত্য। আরেকটা জিনিস হলো- গান খুবই ডিসট্র্যাক্টিং একটা জিনিস। মানুষের চিন্তা-চেতনাকে এলোমেলো করে দেয়, অযাচিত বিষয়ে কনসেন্ট্রেশান চলে আসে, আরো অনেক কিছু… আমি এজন্যে ইদানিং গান শোনাটাকেও খুব লিমিটেড করে এনেছি।
চিন্তায় কনসেন্ট্রেশান খুবই দরকারি জিনিস !
লেখাটা ভালো লাগলো।
আপনার কমেন্টের প্রতিটি কথার সাথে আমি একমত মাসুদ ভাই।
লেখা পড়ার জন্য ধন্যবাদ
ভালো লাগল। বৃষ্টি আমারো ভালো লাগে। কিন্তু যেমন বলেছেন, ময়লা আবর্জনার ঢাকা শহরে বৃষ্টিকে পছন্দ করাও কঠিন কাজ।
যতদিন ওই গ্রামের চোখজোড়া সবুজের মাঝে থাকতাম, ভার্সিটি লাইফের দিনগুলোতে, কলেজ লাইফের দিনগুলোতে আমার বৃষ্টি ভালো লাগতো। ঢাকায় ফেরার পরে লাগে বিরক্ত।
সারাদিন চারদিক অন্ধকার হয়ে পানি পড়ছে, আশপাশ কাদায় প্যাচপ্যাচ করছে, সারাক্ষণ একট মন খারাপ ভাব – সব মিলিয়ে বৃষ্টি জিনিসটাকে তেমন একটা পছন্দ না। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে আমার জন্ম আবার এই আষাঢ় মাসে! আইইউটি জীবনে বর্ষাকে অবশ্য বেশি খারাপ লাগতো না। চারদিকে সবুজের সমারোহ, বর্ষার পানিতে ভিজে যেন আরো সবুজ হয়ে যেত! তাই সব মিলিয়ে বর্ষাকাল তেমন একটা পছন্দ না হলেও খুব একটা আবার অপছন্দও নয়।
লিঙ্কে ইন্টারনাল সার্ভার এরর পেলাম
সবুজের মাঝে আইইউটি তো অনেক সুন্দর দেখেছিলাম, সেখানে তো ভালো লাগারই কথা বর্ষাকে!
গানটা শুনলাম অনেক দিন পর, মাঝে এক সময় ছিল গানটা আমার হেড ফোনে দিন রাত চলত।
তোর লেখাটা পরে ইংলিশ একটা গানের লাইন মনে পড়ে গেল – “স্যাড বাট ট্রু”।
নির্মম সত্যের কাছে আমরা নিজেদেরকে বিসর্জন দিয়ে চলছি প্রতি নিয়ত। এই কাজ সবাই করে আসছে অনেক দিন ধরে, সবার পথে ধরতে হবে কেন? বেচে থাকার জন্য? এই বেচে থেকে লাভ কি?
তবুও বেচে থাকতে হয়, সুন্দর আগামীর আশায় … :’(