সুচরিতাসু সুপ্রভা,
আজ আমি অনেকটাই জোর করে লিখতে বসেছি। তুমি খেয়াল করে দেখো আমার বিগত দিনগুলোকে– সেখানে আমার কোন প্রকাশ নেই। কী প্রকাশ করবো বলো? নিজের ভেতরে যেই অনুভূতির আধিক্য হয়–সে হলো বিষাদ। আমি যে বড্ড ভয় পাই — এই বিষাদের শব্দগুলো না আবার অন্য কাউকে বিষাদ্গ্রস্ত করে ফেলে! অথচ জানো, আমি ইদানিং অদ্ভূত আর অদ্ভূত কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। তাতে আছে অবাক হওয়া, তাতে আছে কিছু বাস্তব উপলব্ধি। সে নাহয় পরে বলি!
জানো, আর মাত্র ক’দিন বাদেই ফাল্গুন আসবে। এই বাতাসের ঘ্রাণটা আমাকে ঠিক ফাল্গুনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। বাতাস আলতো হয়ে বয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির উপর দিয়ে। গাছের শুকনো পাতাগুলো অদ্ভূত করে ঝরে যাচ্ছে… আর এই বাতাসের ঘ্রাণে আমার কেবলি মনে হচ্ছে আমি নিজেই যেন ঝরে যাচ্ছি। শুকিয়ে ঝরেই চলেছি ক্রমাগত। একজন পথচারী আমায় পেলে পদপিষ্ট করে মর্মরধ্বনির সৃষ্টি করবেন– সাঙ্গ হবে আমার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সত্ব্বার ছাপগুলো।
আমি জানি তুমি এখনো কিছু বোঝনি আমার কথার। বুঝতে হবেনা সুপ্রভা। তুমি কেবলি যে শুনে যাও আমার পাগলামিগুলো– সে আমার সৌভাগ্য। অন্য সবার মতন বলতে পারলে হয়ত তুমিও আমাকে ভুল বুঝতে। তখন ভারাক্রান্ত হয়ে কথাগুলো অন্ততঃ লিখে প্রকাশ করারও আর মানুষ রইতো না। আসলে এই কথাটাও আমি ঠিক বলিনি! আজ ফারহান ভাইয়ার একটা লাইন দেখলাম ফেসবুকে– “সবাই মনে করে কেউ তাকে বুঝেনা–এটা প্রত্যেকের ভুলধারণা। আরে ব্যাটা, তুই নিজেই নিজেকে বুঝিস?” … তুমি জানো, কথাটা আমার মনে ধরেছে। হয়ত তাই সবাইকে নিয়ে দুঃখ করার আগে নিজেকে নিয়েই দুঃখ করা উচিত! আমিই আমাকে চিনিনা এখনো। অবশ্য চিনি বা না চিনি–আমি নিজেকে প্রকাশ করতেই পারিনা!
তুমি বলো আমি অনেক কথা বলি? অথচ জানো, আমি কোনদিন কাউকে বলতে পারিই নি তাকে আমি কতটা ভালোবাসি। ভাইয়া, আপুদের কখনো আহলাদ করে এই ভাষাটার আশেপাশে প্রকাশ করতে পারিনা তাদের প্রতি আমার ভালোবাসা কতখানি। অথচ আমি ঠিক জানি, আমি কেবলি ভালোবাসার আর্তি নিয়েই বেঁচে থাকার প্রেরণা পাই। প্রিয় মানুষদের দেখি, তাদের প্রকাশ দেখি, শুনি, তাদের জন্য কিছু করতে পারলে করি; অথচ আর বলতে পারিনা কিছু। এই যে এত ইতংবিতং বলি– অথচ কোনদিন বলিনা যে “হ্যাপি বার্থডে টু ইয়ু”। আপু কাল ফোন করে রাগ করলো– “আজ কত তারিখ বলতো?” আমি তার আগের রাতে ঠিকই মনে রেখেছিলাম আমার আপুমনির জন্মদিন আজ। অথচ আপুকে বললাম, “হুমম। আজকে তো তোমার একটা বিশেষ দিন”। আমার কথা হয়ত বুঝেইনি আপু– “বাসায় আসলা না কেন? আচ্ছা! তোমরা ব্যস্তই থাকো। কিছু মনে রাখতে হবেনা!” এই বলে সে ফোনটা রেখেই দিলো! আমি কেবল স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এরপরেও কিছু বলিনি ফোন করে, বুঝে পাইনি কি করে কী করবো! অথচ হয়ত ‘কিছু এক্সপ্রেশন’ অনেকটাই আনন্দ দিতো আপুকে। সেটুকু কেমন আদিখ্যেতা লাগে আমার কাছে, কেমন অস্বস্তিকর লাগে। আপন বোনটাই অমন করলো, রক্তসম্পর্ক যারা নন, তারা আমাকে বুঝবেন, আমার অপেক্ষা আর ভালোবাসা বুঝবেন– সে কেবলি আমার ভ্রান্তি, তাইনা?
সব কেমন অপসৃয়মান তাইনা সুপ্রভা? আমি জানি এই জায়গাতে তুমি ঠিক আমার সাথে তর্ক করবা। বলবা, তুমি আপুকে একটা ফোন করতেই পারতা, হ্যান ত্যান। অথচ ওই আমি তো এই আমি না! সেটা কৃত্রিম হতো, সেইটা আমার একান্ত প্রকাশ হইতো না! সেটাতো এই আমি নই– যে কিনা অপার ভালোবাসা দিয়ে গেঁথে যায় একেকটা মূহুর্ত তার প্রিয়জনদের জন্য। ধুরর ছাই… এসব ভাবতে আর ভাল্লাগছে না!
একদিন আমি ঠিক চলে যাবো। ঝরাপাতা হয়ে কিনা জানিনা। ঝরাপাতাগুলো সন্ধ্যার আধো-আলোতে কেমন দুর্ভাগা হয়ে পড়ে থাকে পথের কোণায়। রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যায় তারা। সকালে হয়ত ঝাড়ুদার এসে তাদের নিয়ে চলে যায়। তারপর হয়ত পুড়িয়ে শেষ করে ফেলে তাদেরকে… শেষ!! এই আমাকে দেখো, ব্লগের নাম রেখেছিলাম স্বপ্নময় জগত। অনেক স্বপ্ন টাইপের গন্ধ। অথচ আমি জানি, আমার জীবনে স্বপ্ন একেবারেই নেই! তবু প্রকাশ করতে চেয়েছি অনেক দৃপ্ত-সুন্দর…
হবেনা হয়ত। সবার জীবনে হয়ত সবকিছু সুন্দর থাকতে নেই। তবে একটা কথা কী জানো, কেবল প্রার্থনা করি আল্লাহর কাছে, তিনি তো বলেছেন–”আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না”। এই একটা কথা যে আমাকে কতটা প্রেরণা যোগায় সেটা আমার যিনি মালিক, তিনি ভালো জানেন! বুকের কষ্টগুলো তাই যখন জমাট বেঁধে যায়– তখন আর কোন আপনজন খুঁজে ফিরে ক্লান্ত হতে যাইনা, আমার আল্লাহর কাছে হাত দু’টো তুলি–স্মরণ করি তাকে। তার বিশালত্বে আর অভিভাবকত্বে আমার অশ্রুবিন্দুগুলো শক্তি হয়ে ঝরে… এই এলোমেলো শুকনো পাতা হয়ে হারিয়ে যাওয়া আমার কষ্টগুলো আবার প্রেরণাময় হয়… কেন যে সবসময়ে তাকে স্মরণ করতে পারিনা! কেন যে আমার সবসময়ে মনে থাকে না আমার যিনি রব, তার কাছেই আমি একদিন ফিরে যাবো নিশ্চিত। তিনি ছাড়া আমার আর সবসময়ের আপন কেউ কি আছে?
সুপ্রভা, অনেক মন খারাপ নিয়ে লিখতে বসেছিলাম। ক্রমাগত শব্দ দিয়ে আমার কষ্ট উদগিরণ করতে করতে এখন অনেকটাই হালকা লাগছে। আমি চেয়েও দেখলাম না উপরে কী লিখেছি, শুধু জানি– আমার এলোমেলো শব্দগুলো এই মূহুর্তটিতে আমাকে একরাশ হিমেল পরশ দিয়েছে ঠিক ফাল্গুনী হাওয়ার মতন।
আচ্ছা বলতো, আমার আজকের এই চিঠিটার নাম কী দিবো? কষ্ট ছিলো হৃদয়ে, যখন তা স্রষ্টার কাছে অশ্রুঝরার সাথে ঝরে গেলো… তখন তার নাম কী হতে পারে? ঝরাপাতার মতন ঝরা কষ্টগুলো… হাহাহা! অবাক হলাম। তিক্ত মন নিয়ে লিখতে বসা আমি এখন হাসছি! আমাদের জীবন অদ্ভূত, তাইনা? যেমন করে ভাবছি, ঠিক তেমনি অনুভব করছি! কেন তবে ওই খারাপ লাগার সময়টাতেই এমন অনুভূতিগুলো আসেনি? কেন আজ অশ্রু ঝরেই আসলো?
আজ তবে আসি, আচ্ছা? ইদানিং কিছুই ভালো লাগছিলো না। আমার জীবনে ব্যস্ততা আসা প্রয়োজন। মানিব্যাগের প্রস্থ এখন সর্বোচ্চ-সংকোচনের কাছাকাছি। জানিনা কী হবে আগামীতে। আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে চেষ্টা করে চলেছি কেননা জানি– “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, আল্লাহ তা’য়ালাই তার জন্য যথেষ্ট হবেন।”
–‘পথহারা পথিক’
——
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ গুগল





Pingback: ঝরাপাতা হয়ে ঝরে যাওয়া | indiarrs.net Classifieds | Featured blogs from INDIA.
“সবাই মনে করে কেউ তাকে বুঝেনা–এটা প্রত্যেকের ভুলধারণা। আরে ব্যাটা, তুই নিজেই নিজেকে বুঝিস?” … আমারও মনে ধরেছে কথাটা
একেবারে ঝরাপাতার মত ঝরঝরে লেখা
মনে ধরার মতই
কষ্ট করে মন্তব্য করার জন্য ধন্যবাদ
“…সেটুকু কেমন আদিখ্যেতা লাগে আমার কাছে, কেমন অস্বস্তিকর লাগে।”
লাইক।
ধন্যবাদ আপু! অনেকদিন পর আমার ব্লগে!!
অনেক অনেক অনেক ভাল লেগেছে লেখাটা! লাইক না দিয়ে পারলাম না।
শুকরিয়া
এত কষ্ট ক্যান ব্যাটা।। খুব খারাপ, খুব খারাপ।।
হুমম