চারিদিকের আর্তচিৎকারে আমাদের বধিরতা এবং ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি’


একদম ছেলেবেলা থেকেই পত্রিকা পড়তাম। মৃত্যুর খবর দেখতাম, ছবিগুলো দেখতাম– আমি সেই দৃশ্য আর ঘটনাগুলো হজম করতে পারতাম না। আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ভয় দূর করার চেষ্টা অনেকবারই করেছিলাম। ক্লাস থ্রি-ফোরের সেই অনুভূতিগুলো অনেক বাস্তব ছিলো। কিন্তু বাংলাদেশের একজন মানুষ হওয়াতেই কিনা জানিনা, মৃত্যুর সংবাদগুলো ক্রমেই ‘স্বাভাবিক হওয়া’ শুরু করলো। এখন পত্রিকা খুলে আর আগের মতন কিছুই মনে হয়না। কেবল প্রতিটি মৃত্যু,খুনের খবর জানার পর হয়ত ১০-১৫ সেকেন্ড ঝিম মেরে বসে থাকি…

অথচ আজ সকালে, ফেলানী নামের মেয়েটি, যে কিনা বিএসএফ এর গুলিতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে ঝুলে ছিলো দেশের সীমানার কাঁটাতারের বেড়ায়, যার ‘পানি পানি’ চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেনি কোন মানবাত্মা — তার এই ছবিটা দেখার পর দেখে আমার চোখগুলো অশ্রুসিক্ত হয়ে আছে এখন অবধি। হয়ত সেজন্যই কীবোর্ড নিয়ে একটু বসা। ফেলানী কাজ করতো প্রতিবেশী দেশের ইটের ভাটায়। সেদিনই তার বিয়ে হবার কথা। সকালে বাবার সাথে ফিরছিলো নিজঘরে। বাবা কাঁটাতার পেরিয়ে চলে এলেন, ফেলানীর কাপড় আঁটকে গেলে সে ভয়ে চিৎকার করে ওঠে– সাথে সাথে গর্জে ওঠে বিএসএফ-এর বন্দুক। একটা গুলি ফেলানীর পিছন থেকে ঢুকে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবু সে বেঁচে ছিলো। বি,এস,এফ চাইলেই তো ঐ ৪ ঘন্টা’র মাঝে কিশোরীটিকে আরো কয়েকবার গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করতে পারতো। তা না করে তারা ৪ ঘন্টা অপেক্ষার পর যখন মেয়েটি’র গোঙ্গানী বন্ধ ও দেহ নিথর হয়েছে বলে নিশ্চিত হয় তখন এসে লাশ নিয়ে যায়। কাঁটাতারে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঝুলে থেকে ফেলানী “পানি পানি” বলে চিৎকার করছিলো। সাড়া দেয়ার কেউ ছিলো না। তিরিশ ঘন্টা পর তার লাশ এলো যেভাবে মরা গরুকে ঝুলিয়ে আনা হয়।

অভাবে পড়ে সেই দেশের ইটের ভাটায় শ্রম দেয় এদেশের অনেকেই। তাই বলে কি পাখির মত করে গুলি করে মারা হবে তাজা প্রাণগুলোকে? পৃথিবীর বুকে এরকম শত শত সীমান্ত আছে যেখানে দু’টি দেশের লোকজন যাতায়াত করে। উপরন্তু ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বৈরী নয় মোটেই। তাহলে কীসের এত ক্ষোভ? নাকি মানুষ হিসেবে এদেশের মানুষদের স্বীকৃতি নেই ওদের কাছে? বিএসএফ-এর মতন একটা ফোর্স অবলীলায় গুলি চালিয়েই চলেছে এদেশের মানুষের প্রতি। আগে গরু-ছাগল ধরে নিয়ে যেত, গুলি করতো। এখন পাখি শিকারের চাইতে স্বাভাবিক হয়ে গেছে বাংলাদেশের মানুষ হত্যা করা। ২০১০ সালে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিহত হয়েছে ১০৫ জন।


ভারত তো বাংলাদেশে’র বন্ধু, নইলে ঐতিহাসিক ফারাক্কা, চলমান টিপাইমুখ ও তিস্তা এসব প্রকল্পে’র অধীনে চুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের সরকারগুলো বারবার প্রমান করেছে যে এমন বন্ধু ভারতের প্রতি কোন অভিযোগই নেই! যেই বাংলাদেশে বাস-ট্রেন দুর্ঘটনা বা আগুন লেগে কারখানায় শত শত লোক মারা যায় সেই দেশে প্রতি বছর ১০৫ জন গরীব,কাঙ্গাল,চোরা-চালানি যদি বন্ধুপ্রতিম ভারতের হাতে মারা পড়ে তাতে দেশটার কিছু কিছু মানুষ এত রাগ করে কেন?সেই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে’র কিসের অভিযোগ?

হায়রে আমাদের পৌরুষহীন সার্বভৌমত্ব! হায়রে আমাদের জাতিসত্ত্বা! তবু কোন প্রতিবাদ নেই জাতীয় পর্যায়ে। নেই আমাদের মাঝে! হয়ত সীমান্তের ওপারে আমাদের কিছু বন্ধু বলবে বিষয়টি তদন্ত হওয়া দরকার- আবার কেউ বলবে আমি লজ্জিত আমার দেশের সীমান্তরক্ষীরা এমনটি করেছে বলে। কিন্তু এসবের পরেও কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে ফেলানী নামে আমার অচেনা একজন বোনের প্রাণের স্পন্দন? ক’দিন পরেই হারিয়ে যাবে এই ঘটনার দাগ, এই স্মৃতি। হয়ত ফেলানীর নামটা স্মরণে আমার একটা কষ্টময় রাত ও অশ্রুভেজা সকালের কথা মনে পড়বে। আমরা আবার বন্ধুরাস্ট্রের ভালোবাসায় সিক্ত হবো– তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মুখরিত হবো, তবু কোন প্রতিবাদ করবো না।

বিজয়ের মাসে, মাত্র ১০-১২ কোটি টাকার বিনিময়ে “কিং খান” দেশে এসে নেচে-কুদে, বাংলাদেশীদের “শালা-শালা” ডেকে আনন্দ দিয়ে গেল! আমাদের প্রিয় বোনেরা শাহরুখের চুম্বনে আর স্পর্শে ভাগ্যবতী অনুভব করলো। আর কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দেখেও না দেখার ভান করলেন দেশের নীতিনির্ধারকরা। আসছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলিউডের তারকারা অর্ধশতাধিক শিল্পী নিয়ে এসে বাংলাদেশের যে সাংস্কৃতিক দুর্বলতা তা কাটিয়ে দিয়ে যাবে। ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রায় পুরো অংশতেই থাকবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হওয়া সংস্কৃতির প্রদর্শনীর পরিবর্তে বলিউডি নৃত্যযজ্ঞ– আর আমরা হবো দর্শক– তাও মাঠে না, টেলিভিশন দর্শক। আর এই সবকিছু দেখেও শান্ত ও নীরব থেকে বাংলাদেশে’র পত্রপত্রিকাগুলোও তো কত সুন্দর সম্প্রীতি’র চিত্র দেখায়! কিছু বিশেষ বিষয়ে তাদের উন্মত্ত কাভারেজ, আর কিছু বিষয় বেমালুম চেপে যাওয়া বিচিত্রই লাগে!

আমাদের দেশের বাজারে ভারতের চাল, ডাল, পেঁয়াজ, রসুনের লভ্যাংশ দিয়ে কেনা বুলেট আমাদেরই শরীরে বিদ্ধ করে, তখনো আমরা শাহরুখ, কারিনা, ক্যাটরিনাদের রূপ-অঙ্গসৌষ্ঠব দেখে চোখকে শান্তি দেবো। আমাদের মা-বোনদের গল্পে স্টারপ্লাস আর স্টার জলসার আধিপত্য থাকবে বরাবরের মতই শতভাগ। ওদের সংস্কৃতিকে আপনের চাইতে আপন করে ফেলানী দের ‘ফেলে দিয়ে’ আবার বুকে জড়িয়ে ধরবো ওদের। আমার ভাই-বোনেরা “মুন্নী বদনাম হুয়ী ডার্লিং মেরে লিয়ে” গেয়ে গুণগুণ করে ‘ফেলানী’দের নিয়ে চিন্তা করার ভ্যাজাল থেকে মুক্ত হবে। আমরা নিজেদের নপুংসক প্রমাণ করবো নিজেদের অজান্তেই, আবার নতজানু হবো।

তবে হ্যাঁ, ফেলানী বোন, তোমাকে কথা দিচ্ছি, আমার এই অশ্রুসিক্ত চোখ, ঝাঁপসা হয়ে আসা দৃষ্টি কেবল তোমার অসহায়ত্বের কথা ভেবে, তোমার মতন আমার মা-বোন-ভাইদের মৃত্যুর কথা ভেবেই বলছি– আমি কোনদিন কখনো কোন হিন্দী মুভি দেখবো না, হিন্দী গান শুনবো না, হিন্দী কিছু ভাবার প্রশ্নই আসে না! আমার একক সামর্থ্যে যতটুকু সম্ভব আমি এড়িয়ে চলবো আমার ‘বন্ধুপ্রতিম’ দেশের প্রোডাক্টকে, যাদের বন্ধুত্বের বুলেটে ঝাঁঝরা হয় তোমার দেহ, তুমি ঝুলে থাকো এক কষ্টময় অসহায়ত্বে, আমার এই বাংলার সীমানার এক কাঁটাতারের বেড়াতে। যেই সীমানাটুকু অর্জন করতে প্রাণ দিয়েছিলো আমাদের ৩০ লক্ষ ভাইবোন, তাদের চোখে নিশ্চয়ই এই আশা ছিলোনা যে একদিন তোমার মতন বোনেরা এভাবে ঝুলতে থাকবে!

আমার এই ক্ষুদ্র আত্মা তোমাকে, তোমাদেরকে কোনদিন ভুলবেনা, জেনে নিয়ো– কোনদিন না। আমাকে, আমাদেরকে ক্ষমা করিয়ো বোন, তোমার জন্য চিৎকার করার, প্রতিবাদ করার মতন কোন ভাই এই দেশে নাই। তোমার ভাইদের রক্ত আজ শীতল, চিত্তে আজ ভীরুতা। আজ হয়ত তারা ভালোবাসতেই ভুলে গেছে। আর তোমার বোনেরা তবু তোমাকে হত্যাকারী সেই দেশের ভালোবাসা কাটিয়ে উঠতে পারবে না টেলিভিশনের সামনে থেকে। পারবে না তোমার অসহায়ত্বকে অনুভব করে ঘৃণা করতে অন্তত একটিবার!! হয়ত একদিন এভাবে আমরাও চলে যাবো তোমার কাছে। তখন নাহয় একটু শোধ নিয়ে নিয়ো, আচ্ছা! আর এই ভাইটা অশ্রুভেজা চোখে তোমাকে কেবল স্মরণ করার জন্য আরো বেশি করে মার দিয়ো!

——————-

ছবি কৃতজ্ঞতাঃ শুভ্রদ্বীপ পাল, আনন্দবাজার পত্রিকা,কলকাতা।

এই প্রসঙ্গে কয়েকটি ব্লগের শীর্ষ লেখাঃ

About these ads

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in দেশভাবনা. Bookmark the permalink.

14 Responses to চারিদিকের আর্তচিৎকারে আমাদের বধিরতা এবং ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি’

  1. খুব কষ্ট লাগল ঘটনাটা পড়ে।
    কবে যে আমাদের টনক নড়বে কে জানে।
    আমি বিশ্বাস করি, ভারতের মত বন্ধু থাকলে শত্রুর দরকার নাই।

    ভাই, খবরটার কোনো ইংরেজি পত্রিকার লিংক আছে? থাকলে ফেসবুকে শেয়ার করতাম। আমার বেশ কয়েকটা ভারতীয় বন্ধু আছে। একজনের সাথে একদিন আমার এই ব্যাপারে কথাও হইসে। ও কয়, বিডিআর ই নাকি ভারতীয় মানুষ মারছে। কি কমু কন!! অগো পত্রিকায় এই সব হাবিজাবি প্রচার হয়।

  2. tusin says:

    সত্যি একটা অসাধারন লেখা পড়লাম। পড়ে চোখের পানি চলে আসল। আসলে আপনার কথা অণেক যুক্তি আছে। কিন্তু আমরা অসহায়। সরকার সব দেখে ও আলোচনার নামে কি করে ??
    নিউজ দেখল তো দেখি এই নিয়ে কত আলোচনা হয়েছে। তবুত্ত কেন এর সমাধান হচ্ছে। নাকি যারা সীমান্ত এলাকার গরীব মানুষদের কে সরকার মানুষ মনে করে না??
    লেখাটা আমি টানা দুই বার পড়লাম। এখন ফেইসবুকে শেয়ার করে দিচ্ছি………
    ধন্যবাদ আপনাকে.।

  3. ছবিটা দেখলে যে কোন মানুষের চোখে পানি চলে আসবে। আমারও এসেছে। সহ্য করবার মত না। পানি পানি বলে চিৎকার? এর থেকে নির্মম কি আর কিছু হতে পারে?

  4. Pingback: Bangladesh, India: Human Rights Hanging On The Border Fence · Global Voices

  5. Pingback: Bangladesh, India: Human Rights Hanging On The Border Fence @ Current Affairs

  6. Pingback: The 3rd world view Bangladesh, India: Human Rights Hanging On The Border Fence | The 3rd world View

  7. Pingback: Bangladesh, India: Human Rights Hanging On The Border Fence :: Elites TV

  8. Pingback: Bangladesh, India: Human Rights Hanging On The Border Fence

  9. Pingback: NL-Aid » Blog Archive » Bangladesh, India: Human Rights Hanging On The Border Fence

  10. Pingback: Bangladesh, India: Human Rights Hanging On The Border Fence | Saying from Bangladesh

  11. adharkonna says:

    koto shosta manusher jibon na??? felanir mrittu arekbaar proman kore dilo j amra koto drutto omanush hoe jachchi….afsos!!!

  12. Pingback: Bangladesh, Índia: Direitos Humanos pendurados na fronteira · Global Voices em Português

  13. ছবি দেখে চোখে জল এসে যায়, ভারতের সাধারণ বাঙালী নাগরিক হিসেবে আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদ করছি।
    বি.এস.এফ. এর এই অমানবিক আচরণ ধিক্কারের প্রার্থী।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s