চপলতা আজি যদি ঘটে তবে করিয়ো ক্ষমা


Photo Courtesy: Kei


প্রিয় সুপ্রভা,

নিশ্চয়ই বুঝে গেছো যে আজ বৃষ্টি হচ্ছে… বৃষ্টিভেজা বিকেল সন্ধ্যা গেলো…
ঢাকার তীব্র নাগরিক জীবন, জীবনধারণ যেখানে ক্লান্তিকর– সেখানে কিন্তু মাটির সোঁদা গন্ধটা আলতো হলেও আছে। আজ সন্ধ্যাবেলায় ছয়তলার উপর থেকে যখন নিচে নামলাম, গন্ধটা কেমন যেন মস্তিষ্কের শিরা উপশিরাগুলোতে পৌঁছে গেলো… আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম একটা প্রবাহ যেন আমার নাক দিয়ে ঢুকে ঠিক কপালের দুই পাশ হয়ে সামনে আর উপরিভাগে ছড়িয়ে গেলো…

ঠিক যেভাবে অনুভূতিটা ছড়িয়ে যেত আমার ক্যাডেট কলেজ মাঠের পাশে বৃষ্টিদিনে বসে থাকলে, হেঁটে গেলে… অনেক সময় গেমস আওয়ারে বৃষ্টি এলে খেলা ক্যানসেল হয়ে যেত, আর হাউসে ফিরে চটপট প্রেয়ার ড্রেসটা পরে সোজা ছুটে যেতাম খালিদ হাউস পার হয়ে মসজিদে। নামাযটা নৈঃশব্দের মাঝে আদায় করাটা যতটুকু আগ্রহের ছিলো, খালিদ হাউসের শেডের পাশটার ‘কাঁঠালী চাঁপা’ কয়েকটা মুঠোতে ভরে নিয়ে এসে টেবিলের কলমদানীতে রেখে সুঘ্রাণে ভেসে যাবার ইচ্ছেটা একদম কম ছিলো না, তা জানো?

জানো সুপ্রভা, আমার খুব ওই অনুভূতিগুলোতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে… এত্তো তীব্র করে কীভাবে আমি অনুভব করতে পারতাম তখন? কীভাবে যেন এত্তো সুন্দর করে শুদ্ধ হতে চাইতাম! অকলঙ্ক, শুভ্রতা চাইতাম খুউব! ঠিক তোমায় যেভাবে কল্পনায় এঁকেছিলাম… তোমাকে এই বৃষ্টির দিনের প্রতিটি সুন্দরতম মূহুর্তগুলো চিনিয়ে দিতে আমার বড্ড ইচ্ছে ছিলো…

আজো আমি খুব খুব ভালোবাসি আমার ওই অনুভূতিগুলোকে। আমি তো ওদের মাঝেই তোমাকে খুঁজে পেতাম। তোমার প্রতি আমার অনুভূতিগুলোর স্বরুপ বুঝতে শিখেছিলাম। একটা একটা করে আমার ভাবনাগুলোকে তোমার করে সাজিয়েছিলাম। একটা জিনিস কি কোনদিন তোমাকে বলেছি? বৃষ্টিতে আমি যতদিন ভিজেছিলাম, কোনদিন আমার বন্ধুদের মতন করে আমি দৌড় দিয়ে ঝাঁপ দিতে পারতাম না। আমি চুপ করে একখানে দাঁড়িয়ে শুধু আমার উপর পানির ঝাপটাগুলো উপভোগ করতাম। খেয়াল করেছ কি কোনদিন– যখন অঝোরধারায় বৃষ্টি হয়, চুল বেয়ে চোখের পাতায় পানিগুলো জমে কেমন চোখ ঝাপসা হয়ে যায়… ওই ঝাপসা চোখে তাকিয়ে ডান হাতের তালুটা দিয়ে ঝাপসা হয়ে যাওয়া চোখটার সামনে থেকে পানিগুলো সরিয়ে দিতে আমার অদ্ভূত ভালো লাগতো…

আজো অমন করে ভিজতে ইচ্ছে হয় জানো? কেমন করে যেন জীবনে অনেকগুলো রোগ এসে জমা হয়ে গেলো। এখন আমি ভিজলেই আমার গলাবন্ধ হয়ে আসে– শ্বাস নিতে পারিনা– কষ্টে অজান্তেই চোখে পানি জমে যায়… এক বৃষ্টিতে ভেজা নিয়ে এই আমার এতগুলো ছন্দ-কল্পনা– সব নিমিষেই কেমন যেন শূণ্য হয়ে গেছে। আজ অফিসের সিঁড়িকোঠার ছোট্ট জায়গাটায় দাঁড়িয়ে যখন বর্ষাধারার বয়ে যাওয়া দেখছিলাম– কেমন যেন অসহায় লাগছিলো…

আমি জানি তুমি হয়ত কোনদিনই আমার এই কথাগুলো শুনতে পাবে না। নাইবা শুনলে… সে আমার নিয়তি বলেই ধরে নিয়েছি অনেক আগে থেকেই… তবে সত্যি কথা কী জানো– আজ এই বৃষ্টিতেও তোমাকেই আমার খুব করে মনে পড়ছিলো। তুমি একদিন আমাকে কদম ফুল হাতে তুলে দিয়েছিলে মনে আছে? আমি চুপটি করে তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম… কেন যেন আর কিছুই বলতে পারিনি। আমি পারিনা! অথচ আমার সমস্ত শরীরে অদ্ভূত ভালোলাগার শিহরণ বয়ে গিয়েছিলো। হয়ত ভাষা খুঁজে পাইনি বলেই অমনটা হয়েছিলো।

অনেক বেশি বকছি, তাইনা? চপল বালক হয়ে গেছি! হাহাহা… কী বলসি দেখসো? আমি কি আর বালক আছি? এখন একদম যুবক হয়ে গেলাম দেখতে দেখতে! অবশ্য তখন বালকই ছিলাম… বালক থেকে কিশোর হলাম সবে… হিহিহি। চপল না হয়েই বা কী করি বলতো? এই বৃষ্টির দিন আমার অন্যরকম লাগে। সবসময় তো আর লেখার সময় করে উঠতে পারিনা! কিন্তু আমার খুব ইচ্ছে হয় আমার অনুভূতির কথা তোমাকে জানাই। আচ্ছা, তোমাকে বলেছিলাম না, ক্লাস নাইন-টেনে আমি কীভাবে রবিঠাকুরের কবিতায় ডুবে ছিলাম? ‘সঞ্চয়িতা’ মাথার পাশে রেখে ঘুমিয়েছি অজস্রদিন… তখনই একটা কবিতা পড়েছিলাম ‘অবিনয়’ নামের… আমার আজো মনে আছে। তোমাকে আজকের দিনে উৎসর্গ করেই দিলাম–

হে নিরুপমা ,
চপলতা আজি যদি ঘটে তবে
করিয়ো ক্ষমা ।
তোমার দুখানি কালো আঁখি -’ পরে
শ্যাম আষাঢ়ের ছায়াখানি পড়ে ,
ঘন কালো তব কুঞ্চিত কেশে
যূথীর মালা ।
তোমারি ললাটে নববরষার
বরণডালা ।

জানো, আমি না কখনো যূথির মালা দেখিনি! কিন্তু তোমার জন্য এটা আমাকে যোগাড় করতে হবে ঠিক ঠিক– যদি কোনদিন তুমি আসো… সেদিন বর্ষার ক্ষুদ্র আড়ম্বর হবে এটা, বুঝছো?
অবশ্য পথপানে চেয়েই চলে গেলো আজ এক দশক… হয়ত জীবনটাই এমনি করে চলে যাবে… তুমি আর আসবে না…
আমার স্বপ্নগুলো তো কখনই পূরণ হয়না!!

তোমার প্রতীক্ষায়,
পথহারা পথিক।

  • Photo Courtesy: Flickr photo-stream of Kei
  • About mahmud faisal

    Yet another ephemeral human being...
    This entry was posted in চিঠি, শুধু তোমার জন্য. Bookmark the permalink.

    20 Responses to চপলতা আজি যদি ঘটে তবে করিয়ো ক্ষমা

    1. rain7spot says:

      সুপ্রভা তুমি অনেক ভাগ্যবান। তোমাকে নিয়ে আজো অনেকে বৃষ্টির দিনে সুন্দর সুন্দর অনুভূতি নিয়ে ব্লগিং করে। সুপ্রভা তুমি আছো কি নেই তা জানিনা, তবে তোমার জন্য হলেও এত্ত এত্ত সুন্দর লেখাগুলো এখনও আমরা ব্লগে খুজে পাই। তাই সুপ্রভা তোমার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা।

    2. jajaborrr says:

      বাপরে! কঠঠঠিন বৃষ্টি-মাটি-বালিকা প্রেমে গড়াগড়ি অবস্থা! এহহেম!

    3. tusin says:

      আপনার অনুভূতি গুলো দেখে মনে হচ্ছে এই পৃথীবিতে সত্যি ভালবাসা বলে কিছু আছে।
      আমার খুব জানতে ইচ্ছা করছে কোথায় আছে এখন সে।?

    4. সু-প্রভা। নামটা যেমন সুন্দর । তাকে নিয়ে লেখা আরো সুন্দর ।

      বাপরে!! কঠিন লেখা!

    5. সত্যিই সুন্দর লেখা। আমি পড়ে মুগ্ধ। আমার মনে হয় একজন লেখকের স্বার্থকতা সেখানেই, যদি পাঠক তার লেখা পড়ে হারিয়ে যায় কল্পনার জগতে, লেখকের অনুভুতির সাথে নিজের অনুভুতি একাকার করে ফেলে।
      “হে সুপ্রভা ,
      চপলতা আজি যদি ঘটে তবে
      করিয়ো ক্ষমা ।”


      • আমার মনে হয় একজন লেখকের স্বার্থকতা সেখানেই, যদি পাঠক তার লেখা পড়ে হারিয়ে যায় কল্পনার জগতে, লেখকের অনুভুতির সাথে নিজের অনুভুতি একাকার করে ফেলে।

        বাহ ভারী সুন্দর করে বললি তো! :)

    6. banna says:

      অনেক বেশী গভীর বেদনা মাখা চপলতার সংমিশ্রনে জীবন আজ আবার কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তার ঠিক নেই। হয়তো আরো দশক পেরিয়ে যাবে তোমার অপেক্ষায়…

    7. বাঁধন says:

      লেখাটা কতো সুন্দর জানিনা।কিন্তু চিন্তাগুলা খুব পবিত্র।মনটা কেমন যেন সত্যিই শান্ত হয়ে গেলো।

    8. মন ছুঁয়ে গেল ভাই। অসাধারণ সুন্দর লিখতে জানেন আপনি। সুপ্রভা আসলেই তুমি অনেক ভাগ্যবতী। শুভ কামনা কবি :)

    9. shimu says:

      সুপ্রভা , সাহিত্যের এক জটিল উৎস ।

    Leave a Reply

    Fill in your details below or click an icon to log in:

    WordPress.com Logo

    You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

    Twitter picture

    You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

    Facebook photo

    You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

    Connecting to %s