বাসন্তী হাওয়ায় একটু উদাস


কী
মনে হলো যেন হঠাৎ, আর অমনি ফট করে গুরুত্বপূর্ণ পড়া ছেড়ে উঠে আবেগকে প্রশ্রয় দিতে চলে এলাম… কাল দিন শেষে পরশু সকালে “Pattern recognition & machine intelligence ” পরীক্ষা। কিন্তু মনে আমার অন্যরকম স্পন্দন। লিখতে ইচ্ছে করছে! তাই এই খটমটে সাবজেক্টের পড়া আপাতত ইস্তফা দিয়ে বসে গেলাম এলোমেলো বকতে!

সন্ধ্যায় গোসল করলাম আজ… দারুণ ফুরফুরে লাগছিল যখন চা খেতে মোমিন ভাইয়ের চায়ের দোকানে গেলাম… হলে ফেরার পথে মনে করে আরেকটু হেঁটে গিয়ে “লিনিয়ার ক্লাসিফাইয়ার”-এর ফটোকপিটা নিয়ে এলাম… পথে বন্ধুদের সাথে দেখা… দাঁড়িয়ে থেকে একটু ছোট ছোট গল্প… কতজনের কতরকম জীবনবোধ! কত ভিন্ন আমাদের চেতনা! তবু আমরা বন্ধু, আর তাইতো কত ভিন্ন মাত্রার শেয়ারিং, অনুভূতির ভাগাভাগি… কত আপন… কী আন্তরিকতা!

হলে ফেরার পথটা দৈর্ঘ্যে ছোট্ট… সেটাকে একটু বাড়িয়ে নিতে একটু এদিক ওদিক করে ঘুরলাম– মূল উদ্দেশ্য ছিলো বাসন্তী মৃদু শীতল হাওয়াটাকে পূর্ণমাত্রায় উপভোগ করা… আকাশের দিকে তাকালাম– সমস্ত তারাদের যেন দেখতে পেলাম… এরকম আবহাওয়া আমার ভীষণ ভালো লাগে… ঠান্ডা ঠান্ডা একটা উপভোগ্য আরামদায়ক বাতাস… উফফ! কী অদ্ভূত সুন্দর! এই ভালোলাগাগুলোকে আমার না কেন যেন একটা বাক্সে করে রেখে দিতে ইচ্ছে করে… যখন বড্ড মন খারাপ হবে, তখন বাক্স খুলে এই অনুভূতিগুলোর স্বাদ নিতেই মন ভালো হয়ে যাবে!


এই পথে হেঁটে গেছি অজস্রবার, মুগ্ধ হয়ে শুনেছি পাখিদের ডাক, বৃষ্টিতে ভিজেছি অনেকবার…
বন্ধুরা হৈ-হুল্লোড়ে মাতিয়েছি চারপাশ– স্মৃতিমাখা এই পথ ধরেই…


একলা ফেরার পথে বন্ধুদের কথা ভাবছিলাম আনমনে… কেউ কেউ কত ক্ষুদ্র জিনিস নিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকে… আবার কেউ কখনো বলতেই পারেনা তার বিষণ্ণতার কারণ কী! তবু হয়ত বিষণ্ণ, তবু হয়ত মন খারাপ!! আমরা কত সহজেই মন খারাপ করি! আবার কতনা সহজেই খুশি হয়ে যাই! ভালো থাকার সময়েও আফসোস করি কিছুদিন পর এই ভালোলাগাগুলো আর জীবনে থাকবেনা ভেবে! নিজেকে সুখী বলে ভাবতে কত কার্পণ্য!! ইশশ… মানব মন আসলেই খুব বিচিত্র!!


এরকম মনে হলে অনেককেই দেখেছি খেলতে বসে পড়ে গেম, নয়ত একটু হাঁটতে বের হয় কাউকে সাথে করে… এই হল লাইফটাকে বড্ড মিস করবো! আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অফুরন্ত নিয়ামত পেয়েছি এই জীবনের বদৌলতে! একটু হাঁটতে চাইলেই কাউকে না কাউকে পেয়ে যাই সাথে। কখনো সাধ, সৃজন, অর্ক, শোভন… যেন একটু রাত হলেই আমাদের হাঁটার ইচ্ছেটা প্রগাঢ় হয়ে ওঠে! চা খাবার নাম করে বেরিয়ে পড়ি দল বেঁধে… সুমসাম নীরব ভার্সিটির ভেতরের পথ ধরে যখন মেইন গেটের বাইরের দোকানগুলোর উদ্দেশ্যে হাঁটতে বের হই, তখন কতবার বামে বিশাল খেলার মাঠ আর ডানে প্রকান্ড পুকুরের কাছটাতে গিয়ে আমাদের গান শুরু হয়েছে! একদল ছেলেপিলে মিলে একসুরে গান ধরা… একদম নিষ্কলুষ, নির্ভেজাল এই আনন্দখানি শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে মিশে যায়… অদ্ভূত ভালোলাগার শিহরণ বইয়ে দিয়ে যায়…

শেষ সময় বলেই কি আমার এই ভালোবাসাগুলো গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে? আমি ঢাকা শহরের যান্ত্রিকতাকে বড্ড ভয় পাই! ছেলেবেলা থেকে কোন এক বিচিত্র কারণে তীব্র নাগরিক পরিবেশে বড় হয়েও আমার গাছগাছালির প্রতি ভীষণ মায়া ছিলো। হয়ত সেজন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাকে মোক্তারপুর গ্রামে, প্রমত্তা পদ্মার তীরের ওই রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে নিয়ে গিয়েছিলেন… তারপর ভৈরব নদীর তীরে তেলিগাতির এই কুয়েটে নিয়ে এসেছেন… আমি পেয়েছি প্রকৃতির অপার সান্নিধ্য… যখনই আমার মন খারাপ হয়েছে– ছুটে চলে গেছি বড়মাঠে… একদিন রাতে মাঠে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম একা ঘাসের উপর। উঠে দেখি মাঝরাত… আমি টেরই পাইনি কখন সময় বয়ে গেছে! যখন সেখানে গিয়েছিলাম তখন কেবল সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। আর আমি তখন আকাশের তারাদের দিকে চেয়ে আমার চারপাশের শূণ্যতা আর প্রকৃতির মাঝে থাকার বিশালতাকে অনুভব করছিলাম… প্রশান্তি আমায় ঘুম এনে দিয়েছিলো… এমন আরও কত স্মৃতি!!

নাগরিক জীবনের বিষণ্ণতাকে হয়ত আগামীতে খন্ডাতে পারবো না… চাকরি জীবনে পদার্পণ করবো্‌, সংসার জীবনের চরম বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে হবে, দ্বায়িত্ব নিতে হবে অনেক কঠিন সময়ের… হারিয়ে যাবে আমার এই অনুভূতিগুলো… তাইতো পরীক্ষা আগামীকাল শুক্রবার হলেও আমি এই সুন্দর অনুভূতিগুলোকে জমা করতে বসে পড়েছি কীবোর্ড সাথে করে!

হৃদয়জোড়া শুধুই ভালোলাগা… শুধুই সুন্দর অনুভূতি… বন্ধুদের ভালোবাসা… প্রকৃতির ভালোবাসা… এই সুন্দর পরিবেশ… প্রশান্তি! আলহামদুলিল্লাহ! বেঁচে থাকলে হয়ত বহুদিন রব এই পৃথিবীতে… এরকম সুন্দর সময় জীবনে আর আসবে কিনা জানিনা… এই অবারিত প্রান্তরকে আপন করে পাওয়া… চারিদিকে অনেকজন ছোটভাই-বন্ধু-শিক্ষকের স্মিত হেসে শুভকামনা পাওয়া… অনেক ভাগ্যবান বলে মনে হয় নিজেকে!!

হে সর্বশক্তিমান! অনেক দয়া তোমার… আমার এই অনুভূতিগুলো বেঁচে থাকুক চিরন্তন হয়ে! এই সুখস্মৃতিগুলো রয়ে যাক হৃদয় গহীনে… শুধুই সুন্দর হয়ে… শুধুই তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য উপকরণ হয়ে…


ছবি কৃতজ্ঞতাঃ জুবায়ের বিন হায়দার নাভিল,বন্ধুবরেষু, যার তোলা ছবিগুলো যখন বসে দেখি, তখন অবাক দৃষ্টিতে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকি…

About these ads

About mahmud faisal

Yet another ephemeral human being...
This entry was posted in এলোমেলো দিনলিপি, স্মৃতিকথা. Bookmark the permalink.

22 Responses to বাসন্তী হাওয়ায় একটু উদাস

  1. তুলি says:

    ভাইয়া, আপনি আপনার অনুভূতিগুলো খুব সুন্দর করে শব্দের খাঁচায় বন্দী করতে পারেন। পড়তে গিয়ে নিজের মাঝেও ওই অনুভূতিগুলো চলে আসে। অসাধারণ লাগলো।

    • ইয়ে মানে…… :D এরকম করে শুনলে বড়ই ভালো লাগে! মানুষকে সুন্দর কিছু অনুভূতি স্মরণ করিয়ে দিতে পারা অনেক ভাগ্যের ব্যাপার! অনুভূতিরগুলোর এই ভালোলাগা সঙ্গী হয়ে থাকুক সবসময়…

  2. আমাকে সারাটা জীবন ঢাকার বাইরে যেতে হলো না :~

  3. potasiyam says:

    ছুটিতে ঢাকা গেলে কিছুদিনের মধ্যেই কেমন ছটফট লাগে। পাস করে চলে গেলে কুয়েট জীবনটা সত্যিই খুব মিস করব।

    ছবিটা যে নাভিল ভাইয়ের তোলা জানা ছিলনা। বের করলেন কিভাবে?

  4. শাহরিনা রহমান says:

    আমি বড় হতে চাই স্রেফ একটা কারণে, পড়া শেষ হলে ঢাকা ছে-ড়ে পালাবো! :D

    • ঢাকায় সমস্ত নাগরিক সুবিধা দিয়ে ভরে রেখেছে… এটাই সমস্যা যে ঢাকা ছেড়ে বাইরে থাকলে নানা কারণে আবার ঢাকাতে ফিরে যেতে হয়… নতুবা ঢাকা তার বসবাসের অযোগ্যতা বহু আগেই প্রমাণ করেছে… জ্যাম, শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট, নোংরা পানি, জলাবদ্ধতা… উহ… পচা! :evil:

  5. ইশরা says:

    তুমি এত সুন্দর করে তোমার অনুভূতি কী করে প্রকাশ করো!!! অদ্ভূত!!!!!!

  6. akashlina says:

    এরকম প্রকৃতি পেলে আমার আর কিছু চাইনা!!:)
    অসাধারণ লাগল লেখাটা!

  7. iamsrijon says:

    আমি যে কথাটা এতোদিন বলেছি, আজ তুলি ও সেটা বুঝতে পেরেছে।
    চমৎকার লিখেছিস্‌, চালিয়ে যা। আপাতত পরীক্ষাটা শেষ কর।

  8. মুক্ত বিহঙ্গ says:

    বসন্তের লেখায় বর্ষার ছবি কেন?বাসন্তী হাওয়ায় একটু নয় পুরাপুরি উদাস তুই।

  9. fadedreamz says:

    জেনারেল, তুই চিন্তা করেছিস কিনা জানিনা, কিন্তু একটা কথা আমার মনে মাঝে মাঝে আসে– আমরা কতই তো হেলায় বলি… “এইটা কোন জায়গা হইলো নাকি”। কিন্তু আমার মনে হয় মানুষের আনন্দ, দুঃখ, ভালোবাসা… সব অনুভূতিগুলোই মানুষের মাঝেই জড়িয়ে থাকে। জায়গার থেকে জায়গার মানুষগুলো তখন জরুরী।
    I WILL BE MISSING YOU ALL.

  10. শাহরিনা রহমান says:

    হেডারের ছবিটা গ্রেট হয়েছে তো!!

  11. jajaborrr says:

    chobi ta chorom!!! rasta take to dekhei preme pore gechi!!

    • জ্বি আপু। এই রাস্তা আমার ভার্সিটির কয়েকটা প্রেমের একটা। এই রাস্তার ডানে যেই মাঠটা দেখা যাচ্ছে, তার বিপরীতে হাতে বামপাশে একটা বিশাল পুকুর আছে… ওখানে যে কত আড্ডা দিয়েছি! প্রতিদিন দলবেঁধে ঝাঁপাঝাপি করে গোসল করা হয়…
      অদ্ভূত! ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাব কথাটা ভাবলেই ইদানিং কেমন যেন মন খারাপ হয়ে যায়… :(

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s