প্রেম প্রবঞ্চিতকে কী দেয়?

2009 জুলাই 4

বয়ঃসন্ধিতে একটা সময় ডুবে ছিলাম সাহিত্যের মাঝে। কল্পনা আর মুগ্ধতার মাঝে কেটেছে আমার অনেকদিন। ‘যাযাবর’-এর ‘দৃষ্টিপাত’ আমার তেমনি এক অসাধারণ স্মৃতি। সবার সাথে তাই ভাগাভাগি করতে তুলে দিলাম কিছু দারুণ অংশ!


প্রে
ম আপন গভীরতায় নিজের মধ্যে একটি মোহাবেশ রচনা করে। সেই মোহের দ্বারা যাকে ভালোবাসি আমরা তাকে নিজের মনে মনে মনোমত গঠন করি। যে সৌন্দর্য তার নেই, সে সৌন্দর্য তাতে আরোপ করি। যে গুণ তার নেই, সে গুণ তার কল্পনা করি। সে তো বিধাতার সৃষ্ট কোনো ব্যক্তি নয়, সে আমাদের নিজ মানসোদ্ভূত এক নতুন সৃষ্টি। তাই কুরূপা নারীর জন্য রূপবান, বিত্তবান তরুণেরা যখন সর্বস্ব ত্যাগ করে, অপর লোকেরা অবাক হয়ে ভাবে, “কী আছে ঐ মেয়েতে, কী দেখে ভুললো?” যা আছে তা তো ঐ মেয়েতে নয়– যে ভুলেছে তার বিমুগ্ধ মনের সৃজনশীল কল্পনায়। আছে তার প্রণয়াঞ্জনলিপ্ত নয়নের দৃষ্টিতে। সে যে আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তাহারে করেছে রচনা।

জগতে মূর্খরাই তো জীবনকে করেছে বিচিত্র; সুখে দুখে অনন্ত মিশ্রিত। যুগে যুগে এই নির্বোধ হতভাগ্যের দল ভুল করেছে, ভালোবেসেছে, তারপর সারা জীবনভোর কেঁদেছে। হৃদয়নিংড়ানো অশ্রুধারায় সংসারকে করেছে রসঘন, পৃথিবীকে করেছে কমনীয়। এদের ভুল, ত্রুটি, বুদ্ধিহীনতা নিয়ে কবি রচনা করেছেন কাব্য, সাধক বেঁধেছেন গানচিত্র, ভাষ্কর পাষাণ-খণ্ডে উৎকীর্ণ করেছেন অপূর্ব সুষমা।

জগতে বুদ্ধিমানেরা করবে চাকরি, বিবাহ, ব্যাংকে জমাবে টাকা, স্যাকরার দোকানে গড়াবে গহনা; স্ত্রী, পুত্র, স্বামী, কন্যা নিয়ে নির্বিঘ্নে জীবন-যাপন করবে সচ্ছন্দ সচ্ছলতায়। তবু মেধাহীনের দল একথা কোনদিনই মানবে না যে, সংসারে যে বঞ্চনা করল, হৃদয় নিয়ে করল ব্যঙ্গ, দুধ বলে দিল পিটুলী– তারই হলো জিত, আর ঠকল সে, যে উপহাসের পরিবর্তে দিল প্রেম।

অতি দুর্বল সান্ত্বনা। বুদ্ধি দিয়ে, রবি ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি করে বলা সহজ–

জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা
ধূলায় তাদের যত হোক অবহেলা।

কিন্তু জীবন তো মানুষের সম্পর্ক বিবর্জিত একটা নিছক তর্ক মাত্র নয়। শুধু কথা গেঁথে গেঁথে ছন্দ রচনা করা যায়, জীবন ধারণ করা যায় না।

যে নারী, প্রেম তার পক্ষে একটা সাধারণ ঘটনা মাত্র। আবিষ্কার নয়, যেমন পুরুষের কাছে। মেয়েরা স্বভাবত সাবধানী, তাই প্রেমে পড়ে তারা ঘর বাঁধে। ছেলেরা স্বভাবতই বেপরোয়া, তাই প্রেমে পড়ে তারা ঘর ভাঙ্গে। প্রেম মেয়েদের কাছে একটা প্রয়োজন, সেটা আটপৌরে শাড়ির মতই নিতান্ত সাধারণ। তাতে না আছে উল্লাস, না আছে বিষ্ময়, না আছে উচ্ছ্বলতা। ছেলেদের পক্ষে প্রেম জীবনের দুর্লভ বিলাস, গরীবের ঘরে ঘরে বেনারসী শাড়ির মতো ঐশ্বর্যময়, যে পায় সে অনেক দাম দিয়েই পায়। তাই প্রেমে পড়ে একমাত্র পুরুষেরাই করতে পারে দুরূহ ত্যাগ এবং দুঃসাধ্যসাধন।

জগতে যুগে যুগে কিং এডওয়ার্ডেরাই করেছে মিসেস সিম্পসনের জন্য রাজ্য বর্জন, প্রিন্সেস এলিজাবেথরা করেনি কোনো জন, স্মিথ বা ম্যাকেঞ্জির জন্য সামান্য ত্যাগ। বিবাহিতা নারীকে ভালোবেসে সর্বদেশে সর্বকালে আজীবন নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছে একাধিক পুরুষ; পরের স্বামীর প্রেমে পড়ে জীবনে কোনদিন কোনো নারী রয়নি চিরকুমারী।

এমন প্রেমিকের জন্য কোন দিন সন্ধ্যাবেলায় তার কুশল কামনা করে তুলসীমঞ্চে কেউ জ্বালাবে না দীপ, কোন নারী সীমন্তে ধরবে না তার কল্যাণ কামনায় সিদুরচিহ্ন, প্রবাসে অদর্শনবেদনায় কোন চিত্ত হবে না উদাস উতল। রোগশয্যায় ললাটে ঘটবে না কারও উদ্বেগকাতর হস্তের সুখস্পর্শ, কোনো কপোল থেকে গড়িয়ে পড়বে না নয়নের উদ্বেল অশ্রুবিন্দু। সংসার থেকে যেদিন হবে অপসৃত, কোন পীড়িত হৃদয়ে বাজবে না এতটুকু ব্যথা, কোনো মনে রইবে না ক্ষীণতম স্মৃতি।

প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা। কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কী? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয়না অথচ দহন করে।

সেই দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দাহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন বহু কাণ্ডজ্ঞানহীন হতভাগ্য পুরুষ।।

উপন্যাসঃ দৃষ্টিপাত
রচয়িতাঃ যাযাবর (বিনয় মুখোপাধ্যায়)

10 Responses leave one →
  1. 2009 জুলাই 4
    শঙ্খচিল permalink

    আমি পড়েছি!!!
    ঃ))

    • 2009 জুলাই 4
      মাহমুদ permalink

      দোস্ত! আমিতো জানি তুই পড়েছিস…
      কিন্তু নতুন করে মনে করিয়ে দেবার জন্য কি আমি ধন্যবাদ পেতে পারিনা??
      :-)

  2. 2009 জুলাই 4
    ব্রহ্মদৈত্য permalink

    জীবনে অনেক কিছুই পড়া বাকি পড়ে আছে। বিনয় মুখোপাধ্যায়ের কথা বহু আগেই শুনেছিলাম, কিন্তু কখনো হাতের কাছে পাইনি বলে পড়াও হয়ে উঠেনি। ধন্যবাদ ভাইয়া।

    • 2009 জুলাই 5
      মাহমুদ permalink

      ব্রহ্মদৈত্য! এই নামের অর্থ কী রে?
      ভাই, বিনয় মুখোপাধ্যায় লোকটি কোন একটি কারণে বোধকরি কতিপয় নারী চরিত্রের উপর ক্ষেপে গিয়েছিলেন– আমি তার কয়েকটি লেখায় এর ছাপ পেয়েছিলাম।
      তবে উনার প্রকাশভঙ্গি আর শব্দচয়ণ অত্যন্ত শক্তিশালী। পড়ে আনন্দ পাবি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি!

      • 2009 জুলাই 20
        ব্রহ্মদৈত্য permalink

        ব্রাহ্মণের আত্মা, সাদা ধুতি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। এরা সাধারণত পবিত্র ভূত হিসেবে বিবেচিত। বলা হয়ে থাকে, কোনো ব্রাহ্মণ অপঘাতে মারা গেলে সে ব্রহ্মদৈত্য হয়। এছাড়া পৈতাবিহীন অবস্থায় কোনো ব্রাহ্মণ মারা গেলেও ব্রহ্মদৈত্য হতে পারে। এরা কারো প্রতি খুশি হয়ে আশীর্বাদ করলে তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়, কিন্তু কারো প্রতি নাখোশ হলে তার সমূহ বিপদ। দেবদারু গাছ কিংবা বাড়ির খোলা চত্বরে বাস করে।

        • 2009 জুলাই 20
          Mahmud permalink

          এতকিছু থাকতে এই খটমটে নামটা নিলি কেন? সুন্দর কিছু নেয়া যায় না???
          যা হোক, “ব্রহ্মদৈত্যের ইতিকথা” জানানোর জন্য ধন্যবাদ :P

  3. 2009 জুলাই 5
    মাসরুফ হোসেন permalink

    এর চাইতে সত্য কথা এ যুগের প্রেম ভালবাসার ক্ষেত্রে বোধ হয় আর দ্বিতীয়টি নেই।

    • 2009 জুলাই 5
      মাহমুদ permalink

      ভাইয়া, আপনি পড়তে এলেন? খুশি হলাম!
      আসলেই আমারও মনে হয়েছে এ যুগের প্রেমের ক্ষেত্রে যেন এই কথাগুলো খুব বেশিই মিলে যায়! তবে লেখক নারীদের প্রতি বোধহয় একটু বেশিই তী বিদ্রুপ করলেন!

  4. 2009 জুলাই 6

    onek valo laglo ai lekhata pore…tnx 4 uploading..

  5. 2009 জুলাই 6
    মাহমুদ permalink

    Thanks vaia…. It’s my pleasure… :-)

Leave a Reply

Note: You can use basic XHTML in your comments. Your email address will never be published.

Subscribe to this comment feed via RSS