রচনাকালঃ ০৭ জুন, ২০০৯
আজ সারাদিন গুমোট মেঘলা। ঝির-ঝির বৃষ্টি… কখনো গুড় গুড় করে মেঘের ডেকে যাওয়া। আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা। ভয়ংকর শব্দে কানে তালা লাগার মতো কিছু মেঘের গর্জন… আর এই মূহুর্তে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। তীব্র বৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে মুখ ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আমার বিছানাটা জানালার পাশে। সেই জানালা দিয়ে ভেসে আসছে মাটির সোঁদা গন্ধ। বৃষ্টি শুরু হলে এইরকম গন্ধ পাওয়া যায়– মনটা কেন যেন আনচান করে ওঠে…
একটা গল্পের বই পড়ছিলাম। ট্র্যাজেডি– শেষে মূল চরিত্র মারা গেলো। একটা পোস্ট পড়লাম ব্লগে। আরো খারাপ হয়ে গেলো মন। এই খারাপের অনুভূতিতে কেমন যেন কষ্ট মেশানো… এইটার কোন উপশম আমার জানা নেই। বরং নিজেকে খুব একা বলে মনে হচ্ছে। আসলে মনে হওয়ার কিছু নেই; আমি প্রকৃতই একা।এইরকম বর্ষণঘণ দিনে সেই একাকীত্বকে প্রকট করে খুঁজে পাই। এই খারাপ লাগাটাকে কমাতেও মন চাইছে না… মাঝে মাঝেই এইরকম হয়…

এইরকম ব্যাপারটাকে আমি নাম দিয়েছি “দুঃখ-বিলাস”। যখন মন খারাপ হয়, সেইটা আরো বাড়িয়ে দিতে মনে চায় কখনও কখনও… কেমন যেন নেশার মত লাগে !! থাক না, আর ভালো হওয়ার কী?
নিঃসীম পৃথিবীতে কথা বলার মানুষ পাই না বলেই হয়ত কলম ধরলে কলম আমার চিন্তার আগেই এগিয়ে চলে… মনের জানালাগুলো খুলে যায়, আর আমি নিজের ভেতরের বদ্ধ হয়ে থাকা চিন্তাদের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি দেই। এতক্ষণ, এতদিন যেই অনুভূতিরা গুমরে মরছিল, তাদের আর্তনাদ সইতে না পারলে লিখতে বসে পড়ি। হতে পারি আমি একজন মানুষ হিসেবে খুব সামান্য, কিন্তু একটু প্রশান্তি কে না চায়!
ব্লগ না থাকলে হয়ত আমি আমার নীল-সাদা রংয়ের ডায়েরিটা নিয়ে বসে পড়তাম। উন্মোচিত করতাম মনের ভেতর জমে থাকা কথাগুলোকে…
২৩ টি বর্ষা অতিক্রান্ত হয়েছে এই জীবনে। আর একটি মাস পরে পা রাখব চৌব্বিশে। ক্ষুদ্র এই সময়ের ব্যাপ্তিতে যাদের একটু আপন করে পেয়েছিলাম, তারাই চলে গেছে দূরে। যাকে ভালোবেসে কাছে টেনেছি, সে-ই আমায় ফেলে গেছে দুঃসহ বেদনা দিয়ে। ভুল বুঝেছে, দিয়েছে মিথ্যে অপবাদ। বারংবার নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি– আমাকে কেন কেউ ভালবাসে না? নাকি বাসে, আমিই কি টের পাইনা??
কৈশোরে কিছু বন্ধুদের পেয়েছিলাম আপন করে– তারা আজ জীবনকে সফল করার তাগিদে আমার থেকে দূরে…আমি আবার সে-ই একাকীত্বে। সেই আমি, সেই বৃষ্টিস্নাত দিন। শুধু কিছু স্মৃতি আমার সংগী।আমি ওই স্মৃতিদেরই বুকে জড়িয়ে ধরে আছি। নিজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বুঝতে চাই কবে আমার মুক্তি মিলবে এই ব্যস্ত জীবনের শেকল থেকে!
এইরকম দিনে বড় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে মনটা। কতজনকে যে মনে পড়ে! কত কিছু যে মনে পড়ে! কেমন যেন একটা শূণ্যতা ভর করে বুকের মাঝে… এই রকমটা মনে হয় কম-বেশি সবারই হয়…
কৈশোরে কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর উপন্যাস “বাঁধন-হারা” পড়েছিলাম। তার ভেতর কবিতার কয়েকটা পংক্তি ছিল যা আমার হৃদয়ে গেঁথে আছেঃ
ঝরঝর ঝরে জল বিজুলী হানে,
পবন মাতিছে কোন পাগল গানে,
আমার পরাণপুটে
কোনখানে ব্যথা ফুটে
কার কথা বেজে ওঠে হৃদয়-কোণে…
হেরিয়া শ্যামল ঘন নীল গগনে
সজল কাজল আঁখি পড়িল মনে…
পরিষ্কার মনে আছে– ছেলেবেলায় এইরকম আবহাওয়া পেলে বর্তে যেতাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কত-শত ভাবতাম! এলোমেলো, আবোল-তাবোল… খুব ভালো লাগত। স্বপ্ন দেখতাম– নিষ্কলুষ, অকলংক পবিত্র সেই সব কল্পনা! তবু কত স্বপ্ন বাস্তব হলো! কত নতুন দুঃস্বপ্ন জীবনকে এলোমেলো করে দিলো!!
আমি চেয়ে চেয়ে দেখি! দেখি সবাই কিসের পেছনে যেন ছুটছে… ক্যারিয়ার, চাকুরি, উন্নতি… আরো কত রকমের স-ব শব্দ ভেসে আসে প্রতিনিয়ত কানের পাশে! আমি ওদের মত পারিনা। এতটা চিন্তিত হতে আমার ইচ্ছে করেনা। আমিতো আমার কাজ করছিই… তাহলে কেন প্রতি মূহুর্তে এত সচেতন হতে হবে জীবিকার চিন্তায়?
আমি হয়ত বাস্তববাদী নই। আর তাই হয়ত আমি জীবন-যুদ্ধ থেকে ছিটকে পড়তে পারি… আর তাই হয়ত আমার দিকে কেউ চেয়ে দেখে না… আমি কারও উপকার করতে পারব, এইটা হয়ত কেউ বিশ্বাস করে না… — এইরকম কত-শত চিন্তাই তো মাথায় আসে!!
আমি শুধু ভেবেই চলি। ভেবে চলি আমায় একদিন চলে যেতে হবে এই প্রকৃতি ছেড়ে, যেতে হবে এই পৃথিবী ছেড়ে… তখন আমি আর এইভাবে বৃষ্টির পানিতে মুখ ভেজাতে পারব না… আমি আর মাটির সোঁদা গন্ধ নিতে পারব না বুক ভরে… আমি তখন আর পারব না বর্ষায় নগ্ন কদমের দুলে যাওয়া দেখতে… পারব না বৃষ্টিতে মাঠে গিয়ে শুয়ে গিয়ে প্রকৃতির সাথে মিশে যাবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে…
চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে… নাআআআ। তখন আমি কী করে থাকব!
নাহ, এইতো বেশ আছি! কত সুন্দর এই পৃথিবী ! কত না সুখী এই আমি! কত না সংগী এই আমারই– এই আকাশ, এই বাতাস, এই বৃষ্টি, এই স্নিগ্ধতা…
হঠাৎ মুখে গানের ওই চরণগুলো জায়গা করে নেয়–
যদি এমনি করেই যায় চলে দিন,
যাক না ……





Excellent pieces of work, good literary sense.
Thanks brother for the comment….
দারুন ! দারুন ! দারুন !
একাকীত্বের চমৎকার রূপরেখা একেছেন। প্রতিটা অনুভূতি যেন নিজের বলেই মনে হচ্ছিল। ভাইয়া, বিষন্নতা রোগটা বড্ড ছোয়াচে, নিদারুন সংক্রামক। ছুয়ে গেলো বোধহয়। তবে আপনার এই বিষণ্ণটা যদি মাঝে মাঝে এভাবে আমাদের কিছু ভালো ব্লগ উপহার দেয়, সেক্ষেত্রে কিন্তু বিষন্নতাই আমাদের কাম্য হয়ে দাড়াতে পারে
কথাটা দারুণ সত্য বলেছিস ভাইরে! এইটা প্রায়ই টের পাই।
আসলে বৃষ্টির দিন আমি কেমন যেন অন্যরকম হয়ে যাই–অনেক বেশি উদাস, বিষণ্ণ। প্রিয় মানুষকে কাছে না পাওয়ার ব্যাকুল অনুভূতি মনে হয়… নাহ। বড় অদ্ভূত এ প্রকৃতি!
দারুন হইছে|খুব মজা পাইলাম…
ধন্যবাদ মামুজান
চমতকার, মনে হচ্ছিলো এতোক্ষন উদাসী হাওয়ার চাদর গায়ে বসে ছিলাম।
কলম যেন এগিয়েই চলে এই শুভ কামনা।
ধন্যবাদ!
অসাধারণ একটা মন্তব্য করলেন
নীল নক্ষত্রের মন্তব্যটা চমৎকার- ‘উদাসী হাওয়ার চাদর গায়ে বসে থাকা’!
আচ্ছা, এই ছবিটা কি তোমার জানালা থেকে তোলা নাকি?
উহু… এইটা আমার জানালা না
“পরিষ্কার মনে আছে– ছেলেবেলায় এইরকম আবহাওয়া পেলে বর্তে যেতাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কত-শত ভাবতাম! এলোমেলো, আবোল-তাবোল… খুব ভালো লাগত। স্বপ্ন দেখতাম– নিষ্কলুষ, অকলংক পবিত্র সেই সব কল্পনা! তবু কত স্বপ্ন বাস্তব হলো! কত নতুন দুঃস্বপ্ন জীবনকে এলোমেলো করে দিলো!!
আমি চেয়ে চেয়ে দেখি! দেখি সবাই কিসের পেছনে যেন ছুটছে… ক্যারিয়ার, চাকুরি, উন্নতি… আরো কত রকমের স-ব শব্দ ভেসে আসে প্রতিনিয়ত কানের পাশে! আমি ওদের মত পারিনা। এতটা চিন্তিত হতে আমার ইচ্ছে করেনা। আমিতো আমার কাজ করছিই… তাহলে কেন প্রতি মূহুর্তে এত সচেতন হতে হবে জীবিকার চিন্তায়?”
-বর্তমানে আমি ভাবি এসব। বয়সের টান আর কি! সব্বারই তাহলে এমনি ভাবনা হয়। পার্থক্য এতটুকু, কেউ কেউ ভাবে, আর কেউ কেউ ভাবে না।
এই কমেন্টটা কীভাবে যেন আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিলো!!
সব্বার হয়ত এমন হয়না, বুঝলি? সবাই ভাবুকদের দলে না… জগতের মানুষগুলো কেউ কর্মী, কেউ জ্ঞানী, কেউ ধ্যানী… তাই সবার হয়ত একই রকম ভাবনা হয়না, ভাবনার মিল থাকলেও তাদের গভীরতা আর অনুভূতির প্রকটতা একই না…
এরকম ভাবনা আবার বয়সের টান নাকি রে?
হতেও পারে! এলেন বলেছে যখন!
Bastobota niye lekha…
Kintu bastobotar urdhe shokol chinta…
Brishty k achchonno kore jar eto kotha mala….
Brishty ki take vejabe ujar kore apon shotta….???
প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে? আমি জানিনা…
নিখুঁত লেখা! লিখলেন কিভাবে?
জানিনা তো ভাই!!
বর্ষা! বর্ষা! বর্ষা!
বর্ষা যে কত কিছু টেনে বের করে।
লেখাটা অবশ্যই সুন্দর…….
ধন্যবাদ